মানব পাচারের অভয়াশ্রম

উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত অনেক দেশ থেকে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাদের অনেকের বৈধ ভিসা থাকলেও একটি বড় অংশের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ নামক মরীচিকায় বিভোর হয়ে কোনো কিছু চিন্তা না করেই ছুটে যান অজানার উদ্দেশে। বিশেষত, অবৈধ পথে যারা ইউরোপে যেতে চান তাদের অনেকে একসময় লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি অথবা গ্রিস অথবা আজারবাইজান থেকে তুরস্ক হয়ে গ্রিস ও গ্রিস থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে ইতালি কিংবা স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। সম্প্রতি, ইতালি ও গ্রিসের কোস্টগার্ডের তৎপরতার কারণে ও একই সঙ্গে পালেরমো প্রটোকলের কারণে এখন সহজে কেউ সাগরপথে এ রুট দিয়ে ইতালিতে কিংবা গ্রিসে ঢুকতে পারেন না। যদিও এ রুট দিয়ে এখনো অনেকে ইউরোপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেন। দেশে ধনীর দুলাল হয়ে বাবার মাথা ভেঙে খেলেও মধ্যপ্রাচ্যে অনেকেই গৃহকর্মী বা মেষপালক। ওদের বেতন যৎসামান্য। বাসস্থানের অবস্থা খুব করুণ। কেউ কেউ পানির অভাবে বহুদিন গোসল করার সুযোগও পান না। হাঙ্গেরি, লিথুয়ানিয়া, গ্রিসের কৃষি ফার্মের ব্যারাকের একই অবস্থা। তবু কেন ইউরোপে যাওয়ার মোহ? এর চেয়ে দেশে বাবার জমি বা অন্যের পতিত জমি লিজ নিয়ে কৃষিশ্রমিক হওয়া অনেক ভালো। অনেক শান্তি আছে তাতে। অবৈধ পথে পালাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে লাশ হতে হয় অনেককে। কোনোক্রমেই থামছে না অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা। আগে টেকনাফ দিয়ে থাই-জাভা-সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো ছিল লক্ষ্য। এখন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সমুদ্রপথ রুদ্ধ করে রাখায় আদম দালালরা নতুন গন্তব্য চিহ্নিত করে কমবয়সীদের অবৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর টার্গেট করেছে।

আলবেনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, গ্রিস, কসোভো, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির সামান্য অংশ নিয়ে বলকান অঞ্চল। গ্রিস থেকে মেসিডোনিয়া হয়ে কিংবা গ্রিস থেকে আলবেনিয়া ও কসোভো, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা হয়ে প্রথমে সবাই সার্বিয়ায় পা রাখার চেষ্টা করেন। সার্বিয়া থেকে দুই ভাবে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করা যায়। হাঙ্গেরির সঙ্গে সার্বিয়ার সীমান্ত রয়েছে এবং সার্বিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া যাওয়া যায়। এ ছাড়া বসনিয়া-হার্জেগোভিনা কিংবা মন্টিনিগ্রো থেকে ক্রোয়েশিয়া ও ক্রোয়েশিয়া থেকে স্লোভেনিয়া হয়ে অনেকে সেনজেন রাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেনজেন রাষ্ট্রে কোনোভাবে ঢুকতে পারলে সহজে এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত অন্য রাষ্ট্রে যাওয়া সহজ হয়। বিশেষ করে, সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় ও একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া ধরা পড়ার সম্ভাবনা না থাকায় সড়ক ও রেলপথে সহজে সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে চলাচল করা যায়। অনেকে আবার তুরস্ক থেকে গ্রিসে না গিয়ে বুলগেরিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেন। তারপর, সেখান থেকে রোমানিয়া অথবা ইউক্রেন হয়ে হাঙ্গেরি কিংবা বুলগেরিয়া থেকে সার্বিয়া হয়ে হাঙ্গেরি অথবা ক্রোয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।

আমাদের দেশের মানুষের মাপকাঠিতে ইউরোপ যেমন বলকান অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে সে জিনিসটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমত, ইউরোপের অন্যান্য অংশের তুলনায় বলকান দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও আইনের অনুশাসনের অভাবে এ অঞ্চলে অপরাধপ্রবণতার মাত্রা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে, সার্বিয়ার অবস্থান এই সূচকে সবার নিচে। বলকান দেশগুলোকে ঘিরে বর্তমানে ইউরোপে মানব পাচারের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এমনকি হেঁটে, ঘন বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে কিংবা পাহাড় বেয়ে এমনকি, খরস্রোতা নদীতে সাঁতার কেটে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের সীমানা ডিঙিয়ে অনেকে স্বপ্নের ইউরোপে পা রাখতে চান।

এক-একটা দিন যেন তাদের জীবনের এক-একটি দুঃস্বপ্নের নাম। অর্ধাহারে-অনাহারে, কখনো গাছের পাতা খেয়েও অনেকে একেকটি দিন অতিবাহিত করেন। ভাগ্য খারাপ হলে এক গ্লাস পানিও জোটে না। পথে বিভিন্ন কারণে অনেক প্রাণ ঝরে যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রিয় মানুষটির লাশও পৌঁছায় না অনেক সময়। পাওনা টাকা পরিশোধ করতে না পারলে অনেক সময় দালালদের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ সার্বিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়া, কসোভো, মেসিডোনিয়ায় সেনজেন দেশগুলোর তুলনায় অনেক সহজে ভিসা পাওয়া যায়। বর্তমানে এ সুযোগটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন অনেকে। ঐতিহাসিকভাবে স্লোভেনিয়া, ইতালি ও ক্রোয়েশিয়া একে-অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানা হলেও প্রকৃতপক্ষে ইতালির ত্রিয়েস্তে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় শহর। সেখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক স্লোভেনিয়ানদের বসবাস ছিল। এ ছাড়া স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার আড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলবর্তী এলাকা যেমন কপার, ইজোলা, পোর্তোরস কিংবা ক্রোয়েশিয়ার পুলা অথবা পরেচে প্রচুরসংখ্যক ইতালিয়ান বাস করেন। এসব জায়গায় যারা স্থায়ী হন তাদের সেøাভেনিয়ান অথবা ক্রোয়েশিয়ান ও ইতালিয়ান দুই ভাষাতেই দক্ষ হতে হয়। স্লোভেনিয়া থেকে এ রুটে সহজে ইতালি যাওয়া যায়। কম টাকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন যারা দেখান সেই দালালচক্র ঢাকা, সিলেটসহ সারা দেশেই সক্রিয়। ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে এরা ফ্রি ভিসায় তরুণদের প্রথমে ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, দুবাই নিয়ে যায়। সেখান থেকে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরে মরণযাত্রার যাত্রী করে উচ্চাভিলাষী তরুণদের।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ফলে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙা করতে ইতালি সম্প্রতি কৃষিসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করা ১২ লাখ অবৈধ অভিবাসীর বৈধ করার ঘোষণা দিয়েছে। স্পেন ও ফ্রান্সের পার্লামেন্টে দেশটিতে বসবাস করা অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার ব্যাপারে আলোচনা চলছে। এই ইস্যুকে পুঁজি করে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের বিভিন্ন রুটে মানব পাচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন। আইওএমের ২০১৭ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করছে যেসব দেশের নাগরিক, তার শীর্ষ পাঁচে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের জুনে প্রকাশিত ইউরোপীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী, অবৈধভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবেশ করা নাগরিকের সংখ্যা বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০টি দেশের মধ্যে ১৬তম। ২০০৮ সাল থেকে সেখানে অবৈধভাবে গেছেন ১ লাখ ৪ হাজার ৫৭৫ বাংলাদেশি। ২০০৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ৯৩ হাজার ৪৩৫ জন বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছেন। ২০১৬ সালে অনুপ্রবেশ করেছেন ১০ হাজার ৩৭৫ জন। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংখ্যাটি সোয়া থেকে দেড় লাখে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপ থেকে তাদের তাড়াতে ১২ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে ইইউ। ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্য বলছে, গত এক দশকে ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে ভূমধ্যসাগরে ডুবে। কিন্তু ১৯ লাখ মানুষ ইউরোপ প্রবেশ করতে পেরেছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ ৮ হাজার কর্মী বিদেশ যান। পরের বছর যান ৭ লাখ ৩৪ হাজার। চলতি বছরেরও জনশক্তি রপ্তানি নিম্নমুখী। সৌদি আরব, ওমান ও কাতার ছাড়া আর কোনো দেশে বড় সংখ্যায় বাংলাদেশি কর্মীরা যেতে পারছেন না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ প্রায় আট মাস। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার বন্ধ প্রায় অর্ধযুগ।বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বরাবরই ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার নেই। তার পরও ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইতালিতে সংখ্যায় কম হলেও বাংলাদেশি শ্রমিকরা যেতে পারতেন। ২০০৭ সালে দেশটিতে ১০ হাজার ৯৫০ কর্মী যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু গত দুই বছরে একজন কর্মীও যেতে পারেননি। যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশিদের জন্য শিক্ষা ভিসার সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। এ কারণে অবৈধ অভিবাসন বেড়েছে বলে মনে করছেন জনশক্তি সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে এশিয়া কিংবা এ অঞ্চলের স্থানীয় অনেকে এই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। এটি একটি সুবিশাল নেটওয়ার্ক, যার জাল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার ব্যবসা হয় এ রুটে। দুর্বল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, আইনের শাসনের অভাব ও স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতির কারণে সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া, কসোভো, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা মানব পাচারের এক অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে উঠেছে।

লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট

ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স