শক্তিপ্রদায়িনীর আগমন

প্রতি বছর শরৎকালে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় দেবী দুর্গার পূজা করে থাকে। প্রতি বছর আশি্বন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়। দশমী তিথিতে পূজা সমাপ্ত হয়। দেবী দুর্গার মৃণ্বয়ী প্রতিমা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। অবশ্য ষষ্ঠী তিথিতে হয় দেবী দুর্গার বোধন বা জাগরণ।

দেবী দুর্গা শক্তিপ্রদায়িনী দেবী। তার কাছে ভক্তরা কেবল শক্তি নয়, রূপ, ধন, যশ এবং শত্রুর বিনাশের জন্য প্রার্থনা করে; রূপং দেহি, ধনং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষোজহি।

এ তো গেল দেবীর প্রতি ভক্তির কথা। সেই সঙ্গে দেবীর কাছে পার্থিব কিছু চাওয়ার প্রসঙ্গ। কিন্তু আবেগপ্রবণ বাঙালি হিন্দুর কাছে দেবী দুর্গা যেন ঘরের মেয়ে। বাড়ির নাইওরি মেয়ের মতোই তিনি বাপের বাড়ি আসেন। তিন দিন থাকেন। চার দিনের দিন নিজে কেঁদে এবং সবাইকে কাঁদিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যান।

হিমালয়রাজ দেবী দুর্গার পিতা। মায়ের নাম মেনকা। স্বামী শিব বা মহাদেব। স্বামীটি সংসারী নন। উদাসীন প্রকৃতির। তাই দুর্গার মায়ের চিন্তা। স্বামীর ঘরে গিয়ে দুর্গা না যেন কত কষ্ট পাবে। আহা! রাজার মেয়ে হয়ে নিজের ইচ্ছায় দুর্গা শিবকে বিয়ে করেছে। নিজের ইচ্ছায় বরণ করে নিয়েছে সাংসারিক দুঃখ-কষ্ট। তবে নানা কষ্ট সত্ত্বেও দুর্গা শিবকে ভালোবাসে। শিবও দুর্গা-অন্ত প্রাণ। তাই দুর্গ যখন বাপের বাড়ি আসে, তখন সেও পেছন পেছন চলে আসে। আশি^ন মাসের শুক্লপক্ষের এক রাতে মা মেনকা স্বপ্ন দেখেন গৌরী এসেছে। গৌরী দুর্গার অপর নাম। গৌরবর্ণ বলেই দুর্গার এই নাম। আর পর্বতরাজ কন্যা বলে তার আরেক নাম পার্বতী। আদর করে তাকে উমা বলেও ডাকা হয়। রাতে স্বপ্ন দেখে পরদিন মা মেনকা তার স্বামী পর্বতরাজ হিমালয়কে বলেন: ‘গিরি! গৌরী আমার এসেছিল

স্বপ্নে দেখা দিয়ে চৈতন্য করিয়ে,

চৈতন্যরূপিনী কোথায় লুকাল।’

স্বামীগৃহে উমার কত কষ্ট! তাই মেনকা বলতে থাকেন :

‘এবার আমার উমা এলে

আর তাকে পাঠাব না।

বলে বলবে লোকে মন্দ

কারও কথা শুনব না।’

মা মেনকা এভাবে আলুলায়িত কুন্তলে সবিলাপ রোদন করছেন। এমন সময়ে কন্যা উমা বাপের বাড়ি এলেন। পুরনারীরা মা মেনকার কাছে খবর পৌঁছাল :

‘গা তোল গা তোল

বাঁধ মা কুন্তল,

এল বুঝি তোর ঈশানী

ওমা পাষাণী।’

দেবী দুর্গার এ আগমনী সম্পর্কে পল্লী কবিরা গান রচনা করতেন, সুরকার সুর করতেন এবং শিল্পী গাইতেন। অনেক সময় একই ব্যক্তি গান রচনা করতেন, সুর করতেন এবং গাইতেন। পল্লী বাংলা মুখরিত হতো আগমনী গানের সুর-ঝংকারে।

মেয়ে বাপের বাড়ি এলো। হেসে-কেঁদে আকুল করে তুলল সবাইকে। পত্নী-অন্ত প্রাণ শিবও পেছন পেছন চলে এলেন। মেয়ে এলো। মা আনন্দে বিহ্বল। এ বিহ্বলতা কেবল উমার নয়। সব হিন্দু বাঙালি গৃহিণীর বিহ্বলতা।

তবে উমা বেশি দিন থাকতে পারবে না। কেবল শিব যে তাকে তিন দিন পর চার দিনের দিন নিয়ে যাবেন, তার জন্য নয়। দুর্গাও যে শিবকে ভালোবাসে। তাই চার দিনের দিন নিজে কেঁদে এবং সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি স্বামীর বাড়ি চলে যান। মা দুর্গা বা উমাকে বাঙালি হিন্দু গৃহিণীরাও নিজেদের কন্যাসম জ্ঞান করেন। তাই মেয়ে উমা আসেন আসেন তাদের মেয়েরাও শ্বশুরবাড়ি থেকে। মেয়েকে কাছে পেয়ে মায়ের বা মায়েদের সে-কি আনন্দ, আড়ম্বর। মেয়ে বাপের বাড়ি এলে মা তাকে কত আদরে এটা-সেটা খাইয়ে আনন্দ পান। তেমনি দুর্গাপূজা উপলক্ষেও নানা প্রকার উপাদেয় সামগ্রী ভোগ দেওয়া হয়। চার দিনের দিন মেয়ে চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি। তাই তিন দিন কাটে উৎসব-আনন্দে।

দুর্গা চলে যাবে। মা তাকে কচুশাক রান্না করে খাওয়ান। দুর্গার একটি প্রিয় খাবার। শিব এতই গরিব যে ঠিকমতো খাবারও জোটে না পছন্দের খাবার তো দূরের কথা।

আমরা ‘আগমনী’ প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

হিমালয়রাজ স্ত্রীর অনুরোধে এবং নিজের আগ্রহেও চললেন দুর্গাকে আনতে। শিবের আবাসস্থল কৈলাসপর্বত। সেই পর্বতস্থ কৈলাসপুরে উপনীত হলেন হিমালয়রাজ।

গৌরীকে বললেন :

‘চল মা চল গৌরী, গিরিপুরী শূন্যাগার

মা হলে জানিতে উমা, মমতা পিতা-মাতার’ ॥

দীর্ঘদিন পর বাবাকে কাছে পেয়ে উমা আনন্দিত। শিবের কাছে পিত্রালয় যাওয়ার অনুমতি চাইলেন :

‘হর, কর অনুমতি, যাই হিমালয়ে,

জনক-জননী বিনে বিদীর্ণ হৃদয়।

এ জ্বালা কি জানে অন্যে

আমি মার একা কন্যে

গিয়ে তিন দিন রব পিত্রালয়ে।’

শিবও ছাড়ার পাত্র নন। তিনি বলেন,

‘জনক ভবনে যাবে, ভাবনা কি তার

আমি তব সঙ্গে যাব, কেন ভাব আর।

আহা আহা মরি মরি

বদন বিরস করি

প্রাণাধিকা প্রাণেশ্বরী, কেঁদো নাকো আর’ ॥

গিরিরাজ উমাকে নিয়ে ফিরেছেন। এ শুভসংবাদ গেল মা মেনকার কাছে। তিনি প্রায় দৌড়ে গেলেন উমাকে বরণ করতে :

‘কৈ হে গিরি, কৈ সে আমার প্রাণের উমা নন্দিনী।’

মেয়েকে কাছে পেয়ে মহা-আনন্দিত মা মেনকা, তিনি স্বামী গিরিরাজকে বললেন :

‘গিরি, আমার গৌরী এসেছে,

রূপে ভুবন আলো হয়েছে।

মায়ের রূপের ছটা, সৌদামিনী

দিন-যামিনী সমান করেছে।’

এভাবেই মা মেনকার মতো দেবী দুর্গার আগমনে উল্লসিত ভক্তবৃন্দ। সে আনন্দ প্রকাশিত আগমনী গানে যা বাংলা সাহিত্যেরও এক অমূল্য সম্পদ।

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক