বিনা জামানতে অনলাইনে অ্যাপসের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার টোপ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক সমিতিভিত্তিক চারটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও, দুটি থার্ড পার্টি ও একটি ল-ফার্ম। সুদের কারবারি চক্রগুলো বিপুল টাকা দেশের দুটি বেসরকারি ব্যাংকে এককালীন স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে জমা দিয়েছে। পরে স্থানীয় এনজিওর সঙ্গে চক্রগুলোর করা চুক্তিপত্রবলে এফডিআরের ওপর ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে সুদের কারবারে খাটিয়েছে। এই এনজিওগুলো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণের টাকা ফের উচ্চ সুদে বিতরণ করেছে গ্রাহকদের মধ্যে। এই অবৈধ ব্যাংকিংয়ের কারণে কোনো আইনি জটিলতায় পড়লে ল-ফার্ম তাদের সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়া ঋণের টাকা পরিশোধ না করলে থার্ড পার্টিকে গ্রাহকের স্পর্শকাতর তথ্য দিয়ে দেয় এসব অ্যাপস কর্তৃপক্ষ। থার্ড পার্টি দিয়ে গ্রাহককে জিম্মি করে ঋণের টাকা সুদসহ তুলে নেয়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অ্যাপসের মাধ্যমে উচ্চহারে অবৈধ সুদের কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ৬ ও ৭ অক্টোবর দুই চীনা নাগরিকসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই চীনা নাগরিকসহ ৭ জনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গ্রেপ্তার ৫ জনকে এক দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক চারটি এনজিও। এনজিগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ তারা। অ্যাপসের কারবারিরা ব্যাংকে রাখা এফডিআরের ওপর ঋণ করে এসব এনজিওকে দেয়। অ্যাপসের গ্রাহককে মূলত এ এনজিওগুলো ঋণ দিয়ে থাকে। ঋণ পরিশোধের সময় (সাত দিন) অতিবাহিত হলে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে সুদের পরিমাণ। আর ৩০ দিন অতিবাহিত হলে গ্রাহকের বিস্তারিত তথ্য এবং মোবাইল ফোনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অ্যাপস কর্তৃপক্ষ দিয়ে দেয় দুটি থার্ড পার্টির কাছে। থার্ড পার্টি গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এগুলো প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ঋণের টাকা সদুসহ তুলে দিত। আর এই সার্বিক অবৈধ লেনদেনের বিষয়টি বাংলাদেশের কিছু ল-ফার্ম কৌশলে বৈধ করে দিত।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সবাই অপরাধী নয় বলেও উল্লেখ করেছেন গোয়েন্দা বিভাগের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সেখানে অনেকেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চাকরি পেয়েছে বলেও জানায় তারা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে তারা বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে যোগদান করে। যাদের সর্বোচ্চ বেতন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। আর সর্বনিম্ন ২৯ থেকে ৩৬ হাজার টাকা।
জানা গেছে, এসব অ্যাপসে উচ্চহারে সুদ নির্ধারণ করে স্বল্প সময়ের জন্য অর্থাৎ তিন থেকে সাত দিনের জন্য ঋণ দেওয়া হয়। ৩ হাজার টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রক্রিয়াকরণ ফি বাবদ ৮১০ টাকা কেটে রেখে গ্রাহককে ২ হাজার ১৯০ টাকা দেওয়া হয় সাত দিনের জন্য। সাত দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয় ৩ হাজার ১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ দিতে হয়। ঋণের পরিমাণ যত বেশি হবে টাকা কেটে রাখার প্রবণতাও তত বেশি। এসব ঋণের টাকা গ্রাহককে পরিশোধ করতে হচ্ছে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
গ্রাহকরা ওইসব অ্যাপস ইনস্টল করতে গিয়ে অ্যাপস কর্র্তৃপক্ষকে নিজেদের অজান্তে ফোনের ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, তৈরি করা ও পরিবর্তনের অনুমতি, দূর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও ধারণের অনুমতি, গ্রাহকের মোবাইলের কন্টাক্টস পড়া এবং পরিবর্তনের অনুমতি দিচ্ছে। এছাড়া গ্রাহকের মোবাইলের এক্সাক্ট লাইভ লোকেশন নির্ণয়ের অনুমতি ও ফোনের স্ট্যাটাস এবং তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দিচ্ছে।’
এছাড়া চক্রগুলো কৌশলে গ্রাহকের ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ পড়া, পরিবর্তন করা ও মেসেজ পাঠানোর অনুমতি নিচ্ছে জানিয়ে এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল স্টোরেজে সংরক্ষিত তথ্য পড়া, পরিবর্তন করা এবং মুছে ফেলার অনুমতি পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নেটওয়ার্ক কানেকশন দেখা, ওয়াইফাই কানেকশন দেখা, ইন্টারনেট থেকে ডেটা সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ে অনুমতি প্রদান করতে হয়, যা গ্রাহকের পারসোনাল ডেটা সিকিউরিটির জন্য চরম হুমকি।’
জানতে চাইলে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের টিম ইনচার্জ অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আশরাফ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারদের রিমান্ড শেষ হয়েছে। তারা কিছু এনজিও, ল-ফার্ম ও থার্ড পার্টির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অ্যাপস কর্তৃপক্ষের বিপুল টাকা দুটি ব্যাংকে এফডিআর করা আছে। সেটার ওপর ঋণ নিয়েই তারা কারবার চালাত।’