প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা গতকাল শেষ হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছিল, ভক্তের জন্য অভয় বার্তা নিয়ে এসেছিলেন দুর্গতিনাশিনী। মহাশক্তির সেই দেবী দুর্গা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ‘কৈলাসে দেবালয়ে’ ফিরলেন।
গত সোমবার ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় ‘আনন্দময়ীর’ নিদ্রাভঙ্গের বন্দনায় উৎসবের সূচনা হয়েছিল। গতকাল শুক্রবার দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনে সাঙ্গ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় পার্বণ শারদীয় দুর্গোৎসবের। সকাল ৭টা থেকে ৯টা ১১ মিনিট পর্যন্ত বিজয়া দশমীতে ‘বিহিত পূজা’ ও পরে ‘দর্পণ বিসর্জন’-এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটেছে।
দশভুজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে ‘কাত্যায়নী মুনির কন্যারূপে’ মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে। আশ্বিন শুক্লপক্ষের এই ১৫টি দিন দেবীপক্ষ, মর্ত্যলোকে উৎসব। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী ফিরে যান কৈলাসে স্বামীর ঘরে। এক বছর পর নতুন শরতে আবার তিনি আসবেন ‘পিতৃগৃহ’ এই ধরণিতে। হিন্দু পঞ্জিকা মতে, দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে এসেছেন, গেলেন দোলায় (পালকি) চড়ে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধর্মদাস চট্টোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহিষাসুর বধ করার মধ্য দিয়ে শুক্রবার বিজয়ী হয়েছেন দুর্গা মা। সে কারণেই বিজয়া দশমী আমাদের আনন্দের দিন, আমরা উৎসব করি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সবাইকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাই।’
মহানবমী পেরিয়ে শুক্রবার সকালে বিজয়া দশমীর ‘বিহিত পূজায়’ ষোড়শউপচার পূজার পাশাপাশি দেবী প্রতিমার হাতে জরা, পান, শাপলা ডালা দিয়ে আরাধনা করা হয়। শ্বশুরালয়ে ফেরার আগে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে সিঁদুর, পান আর দুর্বা দিয়ে বরণ কর নেন নারী পুণ্যার্থীরা; এর মধ্য দিয়ে জরা কাটিয়ে পৃথিবী যেন শস্য শ্যামল হয়ে ওঠে, সেই প্রার্থনা করা হয়। তবে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে এবার কোনো সিঁদুর খেলার আয়োজন রাখা হয়নি, অনুষ্ঠিত হয়নি শোভাযাত্রা।
বিকেল ৪টায় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের বীণাস্মৃতি স্নানঘাটে শাহজাহানপুর বাংলাদেশ রেলওয়ে পূজা কমিটির প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে যার যার মতো করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিকেল ৩টা থেকে রাজধানীর ওয়াইজঘাট, তুরাগ, ডেমরা, পোস্তগোলা ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন হয়। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে শঙ্খ আর উলুধ্বনি, খোল-করতাল-ঢাক-ঢোলের সনাতনী বাদ্যে দেবী বন্দনার গানে গানে বিসর্জনের জন্য ঘাটে আসেন ভক্তরা। ঘাটে আসার পর ভক্তরা শেষবারের মতো ধূপধুনো নিয়ে আরতিতে মেতে ওঠেন। শেষে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে নৌকায় তুলে বিসর্জন দেওয়া হয়।
এবারের পূজায় অষ্টমীর দিন বুধবার সাম্প্রদায়িক উসকানি আর কয়েকটি জেলায় মণ্ডপেন্ডমন্দিরে হামলা-ভাংচুরের ঘটনার প্রেক্ষিতে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পুলিশের পাশাপাশি নৌ-পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদ থেকে জানানো হয়, এবার সারা দেশে ৩২ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী মন্ডপে দুর্গাপূজা হয়। ঢাকায় পূজা হয় ২৩৮টি মন্ডপে।