সারা দেশে ১৪ মামলায় চার সহস্রাধিক আসামি

কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মোট ১৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চার হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর পল্টনের একটি মামলাতেই ছয়জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও আড়াই হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর চকবাজার ও রমনা থানায় আরও দুটি মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পল্টন থানার মামলায় ইতিমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রিমান্ডে নেওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্য এবং সাইবার ক্রাইম বিভাগের সহায়তায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের শনাক্তের কাজ চলছে। আর ইতিমধ্যে যারা শনাক্ত হয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পল্টন থানার মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আবদুল আহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট ও দাঙ্গা তৈরির অপচেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয়। এই মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুক্রবার বিক্ষোভের নামে রাস্তায় নেমে আমাদের পাঁচ পুলিশ সদস্যকে আহত করেছে হামলাকারীরা। সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দাঙ্গা তৈরি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা।’

অন্যদিকে চকবাজার থানায় করা মামলার বিষয়ে থানাটির এসআই নূরুদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা ও অবৈধ জনসমাবেশের অভিযোগে শুক্রবার রাতেই মামলা করা হয়েছে। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।’

ঢাকার সহিংসতার বিষয়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ফটক বন্ধ করাকে কেন্দ্র করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রথমে উত্তেজনা শুরু হয়। পরবর্তীকালে দুপুর দেড়টার দিকে মসজিদের উত্তর পাশের একটি ফটক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় পুলিশ।  ওই সময় একজন নিরাপত্তারক্ষী ফটকটি বন্ধ করে দিলে নামাজ পড়তে আসা একদল মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ওই নিরাপত্তারক্ষীকে ধাওয়া করে উত্তেজিত লোকজন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের ফটকের দিকে ছুটলে ওই নিরাপত্তারক্ষীকে রক্ষা করেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। পরে বন্ধ করে দেওয়া ফটকের তালা ইট দিয়ে ভেঙে ফেলে বিক্ষোভকারীরা। নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই একটি দল মিছিল নিয়ে পল্টন মোড় হয়ে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা নানা সেøাগান দিতে থাকে। নাইটিঙ্গেল মোড়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। এর পরপরই বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। জবাবে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে ছোড়া হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশাল, মৌলভীবাজার ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন থানায় দেড় হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করে ১১টি মামলা করা হয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপে ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। এতে ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ মামলায় ৮৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল সকালে কোতোয়ালি থানার এসআই আকাশ মাহমুদ ফরিদ বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার আসামিদের মধ্যে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিরা হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে দাবি পুলিশের। তাদের সিসি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি নেজাম উদ্দিন। তিনি জানান, ঘটনার পরপর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যে সিসি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে ৮৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা সরাসরি হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল।

কুমিল্লায় ৫ মামলায় ৪০ জন গ্রেপ্তার :  কুমিল্লায় সহিংসতার ঘটনায় পাঁচ মামলায় ৪০ আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কমল কৃষ্ণ ধর। তিনি বলেন, ‘পবিত্র কোরআন অবমাননা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মোট চারটি মামলা করেছে। এ ছাড়া একটি মামলা করেছে র‌্যাব বাদী হয়ে। এ পাঁচটি মামলার মধ্যে একটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, দুটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও দুটি বিশেষ ক্ষমতা আইনে।’

কুমিল্লার পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ফয়েজ আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার দিন ফয়েজ তার মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও ধারণ করে ফেইসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরপরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুটি মামলার একটিতে ১৭ জন ও অপর আরেকটি মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ‘হামলা ও উসকানির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিট একযোগে কাজ করছে। আশা করছি, শিগগিরই নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।’

বরিশালের গৌরনদীতে দুই মামলা : বরিশালে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননা করে ফেইসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে স্থানীয় কিছু উত্তেজিত মানুষ মহানন্দ বৈদ্য নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। পাশাপাশি বিক্ষুব্ধরা তিনটি মন্দিরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার রাতে গৌরনদীর বার্থী ইউনিয়নের ধুরিয়াইল কাজিরপাড় গ্রামে। আটক মহানন্দ বৈদ্য ওই গ্রামের মৃত্যুঞ্জয় বৈদ্যর ছেলে। খবর পেয়ে রাতেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসব ঘটনায় গতকাল গৌরনদী মডেল থানায় দুটি মামলা হয়েছে।

সিরাজদীখানে মামলা : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে গত শুক্রবার গভীর রাতে একটি কালীমন্দিরের মূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা হয়েছে। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে।

কমলগঞ্জে ২ মামলা : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সাতটি পূজাম-পে হামলার ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় দুটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলায় এজাহারভুক্তসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মুন্সিবাজার এলাকা থেকে গত শুক্রবার রাতে মামলার আসামি উপজেলা তালামীযে আলইসলাহ নেতা মাওলানা আবদুল করিমকে পুলিশ আটক করেছে। গতকাল তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।