মরক্কোর মার্সিডিজ গ্র্যান্ড ট্যাক্সি

উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর রাস্তায় রঙিন সব ডিজেল মার্সিডিজ দেখলে যে কারও কিউবার কথা মনে হতে পারে। কিউবাতেও চলে অনেক পুরনো মার্সিডিজ। মরক্কোর গ্র্যান্ড ট্যাক্সিতে গাদাগাদি করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করেন সেখানকার লোকেরা। লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

সুইরায় সূর্যোদয়

সমুদ্রবন্দরঘেঁষা মরক্কোর ভোর। ভোরের নীল আলো ছাপিয়ে উঠে আসছে সূর্যের নরম আলো। সকালের বাতাসে নোনা গন্ধ ভাসছে। ট্যাক্সিচালক হাসান মেসফার আজ দেরি করে কাজে বের হবেন বলে মনস্থির করেছেন। প্রতিদিন অবশ্য ভোরে বের হওয়া অভ্যাস তার। চাকায় ধুলোর মেঘ উড়িয়ে তিনি ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সুইরা শহরে ট্যাক্সি রাখার নির্দিষ্ট স্থানের নাম ‘প্লেস ডে গ্র্যান্ডস ট্যাক্সি’। প্রতিদিন সকালবেলা ট্যাক্সি নিয়ে সেখানে হাজিরা দিতে হয়। ট্যাক্সি চালানোর সুবাদে হাসানকে চেনে না শহরে এমন মানুষ হাতেগোনা। তবে ট্যাক্সিচালক হিসেবে হাসানের জনপ্রিয়তার কারণ তিনি নন, তার পুরনো মডেলের ট্যাক্সি। হাসান যে গাড়ি চালান সেটি ১৯৭৪ সালের মার্সিডিজ স্ট্রোক ৮। এরকম অসংখ্য পুরনো মডেলের গাড়ি মরক্কোর চেহারায় এনে দিয়েছে কিউবার ছাপ। কারণ কিউবার রাস্তায় কারও চোখ গেলেই দেখা যাবে পুরনো মডেলের অসংখ্য গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সবাই। সেসব বলতে বলতে হাসান শাঁই করে বেরিয়ে গেলেন। ট্যাক্সিচালকের মুখে ট্যাক্সির গল্প শুনতে শুনতে এগোচ্ছি। ট্যাক্সির স্বর্ণযুগের গল্প করতে করতে হাসান উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। মাত্রাছাড়া সেই উচ্ছ্বাস টের পাওয়া গেল কিছুক্ষণ পর। রাস্তায় প্রথমে একজন কমলা বিক্রেতার ভ্যান এবং পরে চর্মসার এক নেড়ি কুকুরের ওপরে আরেকটু হলেই ট্যাক্সি উঠিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। সতর্ক করতে যাওয়ার আগেই দেখা গেল ট্যাক্সি পার্ক করার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেছেন। 

ফিরে আসি ট্যাক্সির গল্পে। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের গাড়ি বহু আগেই ক্লাসিক সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আফ্রিকা তো আর যুক্তরাজ্য নয়। তাই এ মহাদেশের গল্প একটু ভিন্নরকম হবেএটাই স্বাভাবিক। আফ্রিকায় এ ধরনের গাড়ি প্রয়োজনের তাগিদে এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও আফ্রিকার স্থানীয় লোকজন জানেন এ ধরনের ট্যাক্সি তারা খুব বেশিদিন ব্যবহার করতে পারবেন না। তা সত্ত্বেও সুইরায় এ ধরনের প্রাচীনতম ট্যাক্সির একটি সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে।

মার্সিডিজ যুগ

উত্তর আফ্রিকার জন্য সত্তর ও আশির দশককে বলা হয় ডিজেল মার্সিডিজের স্বর্ণযুগ। ইউরোপের বাজারে মার্সিডিজের কোনো মডেল পুরনো বলে বিবেচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গাড়ির ঠাঁই হয় আফ্রিকায়। ফলে মার্সিডিজের বেশ কিছু মডেল যেমন ডব্লিউ ১২৩ ২৪০ ডি মডেলে ছেয়ে যায় আফ্রিকার রাস্তা। এখানে এসে সেসব ব্যবহৃত মার্সিডিজ হয়ে উঠল জীবনযাপনের অংশ। স্থানীয় মানুষদের দূরপাল্লার ভ্রমণে খুবই প্রয়োজনীয় এসব ট্যাক্সি, আর পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য ছবি তোলার ভালো অনুষঙ্গ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবই তো একসময় কার্যকারিতা হারায়। তাই পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত মার্সিডিজগুলোকে এবার বিদায় দিতে চাইছে শহর কর্র্তৃপক্ষ।

২০১৪ সালে মরক্কোর পরিবহন মন্ত্রণালয় গ্র্যান্ড ট্যাক্সিচালকদের জন্য একটি প্রণোদনা প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় ট্যাক্সিচালকদের পুরনো যানবাহন বাতিল করার জন্য স্থানীয় মুদ্রায় ৮০ হাজার দিরহাম (৬ হাজার ৫০০ ইউরো বা ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৪০০ টাকা) প্রদান করে। শহরটিতে এ রকম প্রাচীন ট্যাক্সির সংখ্যা মোট ৪৫ হাজার। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়ার তথ্য অনুসারে, এখনো পর্যন্ত ৫৬ শতাংশেরও বেশি ট্যাক্সি এ কর্মসূচির আওতায় এসেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে ২০২২ সালের মধ্যে এ কর্মসূচি ১০০% গিয়ে দাঁড়াবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।

ট্যাক্সিচালক হাসান ট্যাক্সি পার্ক করে কফি নিয়ে বসেছেন। কফির সুগন্ধে আশপাশ মাতোয়ারা হয়ে উঠতেই তিনি বললেন, ‘এটি একটি যুগের পরিসমাপ্তি।’ প্রতিটি শহরে ট্যাক্সি পার্ক করার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আগে পার্ক করা হলে আগে বেরিয়ে যেতে হবে। ট্যাক্সিতে চড়তে আগ্রহী যে কেউ ট্যাক্সিতে উঠে বসলেই তাকে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। তবে কোনো রকম পারিপার্শ্বিক চাপ ছাড়াই যাত্রী নেবেন কি নেবেন না তা নির্ধারণ করতে পারেন ট্যাক্সিচালক। কোন কোন চালক কোন কোন রাস্তায় গাড়ি চালাবেন তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। ‘সরকার আমাদের সবার জন্য একই নামের রুমানিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ডাচিয়াস কেনার জন্য আমাদের টাকা দিচ্ছে। কিন্তু ডাচিয়াস আমার পুরনো মার্সিডিজের মতো নয়। মার্সিডিজের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। গাড়িটি এত শক্ত, নির্ভরযোগ্য আর আরামদায়ক যে এটি চালককে কখনো হতাশ করে না। এ কারণে এখানে আমরা মার্সিডিজ না বলে ‘মার্সি ডিক্স’ বলি।’

মরক্কোর ফরাসি ভাষায় মার্সি ডিক্স শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘দশবার ধন্যবাদ’। তবে মার্সিডিজ স্থানীয় জনপদে এতই জনপ্রিয় যে বেশ কিছু নাটক বানানো হয়েছে মার্সিডিজ নিয়ে। হাসানের উচ্চারণে মাতৃভাষা স্প্যানিশের প্রভাব প্রবল। তাই নাটকের কথা বলতেই নাটকীয় কায়দায় মার্সিডিজ উচ্চারণ করে দেখালেন।

লে গ্র্যান্ড ট্যাক্সি

মরক্কোর পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রণোদনা প্রকল্প বুঝতে গেলে দেশটিতে ট্যাক্সির ভূমিকা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬০ হাজার। কিন্তু সেখানে মাত্র ২৮ লাখ নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে। তাই গড়ে ১১ জন মরক্কোর নাগরিকের ভেতরে মাত্র ১ জনের গাড়ি রয়েছে। মরক্কোর বাস বা রেল পরিবহনব্যবস্থা তেমন উন্নত না হওয়ায় গণপরিবহনের সমস্ত চাপ গিয়ে পড়েছে ট্যাক্সির ওপরে। বেশিরভাগ মানুষই দূরপাল্লার পরিবহনে ট্যাক্সির ওপরে নির্ভরশীল।

হাসান গর্বের সঙ্গে জানালেন তিনি ও তার সহকর্মীরা মরক্কোর স্থানীয় জীবনযাপনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘লে গ্র্যান্ড ট্যাক্সি’ মরক্কোর মেরুদণ্ড। ট্যাক্সি বাদ দিলে মরক্কোর গণপরিবহন অস্তিত্বহীন। অবশ্য মরক্কোর উত্তর দিকে একটি মাত্র ট্রেন লাইন রয়েছে। এত বড় শহরে একটি মাত্র রেললাইন থাকা না থাকায় খুব বেশি ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না। অন্য শহরে যেতে চাইলে যে কেউ গণপরিবহনে ট্যাক্সির বিকল্প হিসেবে বাস বেছে নিতে পারেন। তবে বাস কখন আসবে কখন যাবে কেউ জানে না। আর বাসে করে ছোট শহরে যাওয়া যায় না। সাধারণত বড় বড় শহরে ঢুঁ মারার জন্য বাস ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া মরক্কোতে সড়ক দুর্ঘটনায়ও এগিয়ে আছে বাস। সব দিক বিবেচনা করে তাই স্থানীয় লোকেরা ট্যাক্সিই বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

সুইরায় তাই ট্যাক্সিচালকদের জনপ্রিয়তা নিয়ে বিতর্ক না তোলাই ভালো। সকাল থেকে দেখা যায় ট্যাক্সিচালক আর তেল কালিঝুলি মেখে মেকানিকরা বছরের পর বছর ধরে ব্যবহৃত ট্যাক্সির ইঞ্জিন কর্মক্ষম রাখতে ব্যস্ত। একই সঙ্গে আশপাশেই দূরপাল্লার ভ্রমণযাত্রীদের জড় হতে দেখা যাচ্ছে। যাত্রীরা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছে। একটি ট্যাক্সিতে ৬জন যাত্রী, তাদের ব্যাগ আর ড্রাইভার সব মিলিয়ে তেমন আনন্দদায়ক পরিবেশ নয়। তবে মরক্কোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এটি একটি অতিপরিচিত দৃশ্য।

রঙিন গণপরিবহনব্যবস্থা

মরক্কোর প্রতিটি শহরে একটি করে প্লেস ডে গ্র্যান্ড ট্যাক্সি রয়েছে। প্লেস ডে গ্র্যান্ড ট্যাক্সিকে দেশটির যেকোনো শহরের প্রধান পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। সেখানে একজন প্রধান দালাল রয়েছেন। তার সাঙ্গপাঙ্গরা সব সময় তাকে ঘিরে জটলা পাকিয়ে রয়েছে। তার প্রধান দায়িত্ব চালক ও যাত্রীদের কেউ নিয়ম না মানলে খুবই রুঢ়স্বরে তাদের নিয়ম মনে করিয়ে দেওয়া। 

উত্তরদিকে একটি নির্দিষ্ট শহরগামী মানুষের জন্য একসারি ট্যাক্সি, দক্ষিণের জন্য আবার আরেক সারি। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি গাড়ির সমস্ত আসন পূর্ণ না হবে ততক্ষণ সেটি অপেক্ষা করবে। ট্যাক্সি ভরে গেলেই চলে যাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। গন্তব্য যত দূরে হবে ট্যাক্সি নিয়ে তত আগে বেরিয়ে পড়তে হবে। বেশিরভাগ ড্রাইভার প্রতিদিন ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দেওয়া সত্ত্বেও তারা প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরতে চান। কিন্তু গন্তব্য দূরে হয়ে গেলে প্রতিদিন বাড়িতে ফেরা সম্ভব না-ও হতে পারে।

হাসান বলেন, ‘ওখানে পার্ক করা সবুজ ট্যাক্সিটি দেখুন। এটি সুইরার পশ্চিমের শহর তারৌদান্ত থেকে এসেছে। রাতে সেখান থেকে ফিরতে পারেনি। মরক্কোর প্রতিটি শহরে যাওয়ার ট্যাক্সির রং আলাদা। যাতে রং দেখে সহজে গন্তব্য সম্বন্ধে জানা যায়। আমার ট্যাক্সির রং নীল। সুইরায় আমাদের নীল ট্যাক্সি আমাদের মাছ ধরার নৌকার অনুভূতি দেয়। এক সময় এই ট্যাক্সি আমাদের ভাগ্য ফিরিয়ে দিয়েছিল।’

সুইরায় সমুদ্র থেকে ট্যাক্সির নীল রঙ এসেছে। শহরের সবখানে নীল রঙের ছোঁয়া। ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে শুরু করে মানুষের বাড়ির সামনের দরজা রং পর্যন্ত নীল। সেখানে ট্যাক্সির নীল রং তো খুবই স্বাভাবিক।

মরক্কোয় মার্সিডিজ

জার্মান ব্র্যান্ড ও উত্তর আফ্রিকার মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অটোমোবাইলের অবদান অনস্বীকার্য। অটোমোবাইল তখন প্রথম প্রথম বাজারে এসেছে। ১৮৯২ সালে মরক্কোর তৎকালীন সুলতান হাসান মার্সিডিজ বেঞ্জের মালিকানাধীন সংস্থা ডেমলারের গাড়ি কেনার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দেন। তার হাত দিয়েই মরক্কোতে গাড়ি আমদানি অব্যাহত থাকে। বর্তমান রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ এখনো মার্সিডিজ বেঞ্জ ৬০০ মডেলের গাড়ি ব্যবহার করেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তার বাবার কাছ থেকে গাড়ি পেয়েছিলেন। মরক্কোর যেকোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাকে ঐ গাড়িটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। 

হাসান বললেন, ‘মার্সিডিজ গাড়ির লোগো বনেটের ওপরে দেওয়া থাকে। লোগো দেখে প্রথমবারের মতো মরক্কোর নাগরিকরা চমৎকৃত হয়। এই গাড়িগুলো খুব প্রশংসিত হয়েছিল। সে সময়ে মরক্কোয় গ্র্যান্ড ট্যাক্সি ব্যবস্থা ছিল না। ষাট ও সত্তরের দশকে আমরা এখানে পুরনো আমেরিকান গাড়ি চালাতাম। কিন্তু আশির দশকে সব পাল্টে গেল। মার্সিডিজ আসার পরেই গাড়ির বাজার একচ্ছত্র দখলে নিয়ে নিল কোম্পানিটি।’

মরক্কোর ট্যাক্সিচালকরা কী চান সেটি বুঝতে পেরেছিলেন ইউরোপের ক্যাব মালিকরা। পরে ট্যাক্সিচালকদের জন্য নির্মিত হয় ডিজেলচালিত মার্সিডিজ। হাসান মেসফারের বর্তমান ট্যাক্সি মার্সিডিজ ডব্লিউ ১১৪ বাজারে আসার পরপরই সাড়া ফেলে দেয়। এর উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত মডেল ডব্লিউ ১২৩। ১৯৭৬ সালে এটি বাজারে আনা হয়। পরের ৯ বছর ছিল ডব্লিউ ১২৩ এর স্বর্ণযুগ। এই মডেলটির মোট ২৯ লাখ গাড়ি বাজারে ছেড়েছিল মার্সিডিজ। মার্সিডিজের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডব্লিউ ১২৩ ২৪০ ডি মডেলের ট্যাক্সি। হাসান মেসফার ট্যাক্সিচালক জীবনে ২৮ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন তার এই গাড়ি দিয়ে।

সত্তর ও আশির দশক ইউরোপের গাড়ির বাজারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দশক। তখন গাড়ির বাজারে ইউরোপ সবে শিশু। গাড়ি উৎপাদনে ইউরোপের বয়স সাত বছরেরও কম। শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে মার্সিডিজ খুব দ্রুত নতুন গাড়ি বাজারে আনে। একইসঙ্গে ইউরোপের পুরনো হয়ে যাওয়া মডেলগুলো বিক্রি করার জন্য উদীয়মান বাজার হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। ব্যবহৃত গাড়িগুলোতে ছাড় দিয়ে তারা আফ্রিকার বাজারে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে তোলে।

২০০০ সালে মরক্কোতে আমদানি করা সমস্ত গাড়ির প্রায় ৭০% গাড়িই পাঁচ বছরের পুরনো ছিল। এসব গাড়ির মধ্যে ছিল অনেক পুরনো মার্সিডিজও। কিন্তু শক্তিশালী কাঠামো ও সহজে সংরক্ষণযোগ্য বলে সেসব গাড়ি অনেক টেকসই বিধায় আফ্রিকায় কয়েক দশকের পুরনো মার্সিডিজের বাজারে ভাটা পড়েনি। মার্সিডিজ বেঞ্জ বহু আগেই এসব মডেলের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু মরক্কোসহ আফ্রিকার অনেক দেশে এখনো পর্যন্ত মার্সিডিজের এসব পুরনো মডেলের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা রয়েছে। মরক্কোর উঁচু-নিচু রাস্তায় মার্সিডিজের উপযোগিতা নিয়ে হাসান জানালেন, ‘গাড়িগুলো ভালোমানের ইস্পাত দিয়ে তৈরি।’

নতুন নীতি

যেকোনো যানবাহন দীর্ঘদিন ব্যবহারের সুফল ভোগের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অপকারী দিকও রয়েছে। পুরনো দিনের এসব যানবাহন পুরনো দিনের প্রযুক্তিতে বানানো হয়েছে। ফলে প্রযুক্তি বিশ্বের নতুন ভাবনায় যুক্ত হওয়া অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়েছে মরক্কোবাসী। এখন প্রযুক্তি বিশ্বে জনপ্রিয় ভাবনার মধ্যে আছে কার্বন নিঃসরণের হার কমানো। পুরনো দিনের ডিজেলচালিত গাড়ির ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে মরক্কোর বাতাস। দিনের পর দিন বেড়েছে বায়ুদূষণের হার। বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ অনুসারে, ১৯৯৭ সাল থেকে দেশটিতে বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুহার বেড়েছে ৫০%। মরক্কোর কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে উঠে এসেছে যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া। বায়ুদূষণ থেকে মরক্কোর শহরগুলোকে বাঁচাতে সরকার দেশটির উন্নয়নকল্পে বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ২০১০ সালে ৫ বছরের পুরনো সমস্ত গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে অন্য কোনো দেশ থেকে ব্যবহৃত গাড়ি আমদানির ওপরে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এরপর ২০১৪ সালে গ্র্যান্ড ট্যাক্সিচালকদের জন্য প্রথমবারের মতো নগদ প্রণোদনা প্রকল্প নিয়ে আসে। যদিও হাসান মেসফারের মতো ট্যাক্সিচালকরা এসব প্রকল্পে ভরসা রাখতে পারছেন না। এ প্রকল্পে একাধিকবার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। সরকার তার উচ্চভিলাষী লক্ষ্য থেকে সরে আসছে কি না তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে সবার মধ্যে। অবশ্য দেশটিতে অটোমোবাইল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে এ প্রকল্প অবদান রাখবে।

নীতিনির্ধারণী দোলাচলের মধ্যেও দেশটি তার স্থানীয় শিল্প বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে যাচ্ছে। উত্তর আফ্রিকার এ দেশটি মোটরগাড়ি খাতে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছে দেশটির শিল্প সংশ্লিষ্টরা। ধারণা করা হচ্ছে, অটোমোবাইল শিল্পে মরক্কোর শিল্পমূল্য আগামী ৫ বছরের মধ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউরো হতে চলেছে। ২০১৯ সালের হিসাব অনুসারে, যানবাহন যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে মরক্কোর বৈশ্বিক অবস্থান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০% এবং ইউরোপের প্রতি ৫টি নতুন গাড়ির একটি আমদানি করা হচ্ছে মরক্কো থেকে। অর্থাৎ মরক্কো ইতিমধ্যেই আমদানিকারকের অবস্থান থেকে ইউরোপের বাজারে রপ্তানিকারকের অবস্থানে পৌঁছে গেছে।

হাসান মেসফার অবশ্য এসব বুঝতে চান না। একজন প্রবীণ চালক হিসেবে তিনি তার ট্যাক্সি পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক নন। তিনি বলেন, ‘আমি  কয়েক বছরের ভেতরেই অবসরে চলে যাব। এখন নতুন কোম্পানির ট্যাক্সিতে অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি আমার জন্য রীতিমতো অপচয়। তাছাড়া আমার গ্রাহকরাও এটি পছন্দ করবে না। মার্সিডিজের সঙ্গে মিশে আছে আমার অবিস্মরণীয় অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। চালক জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি সে গল্পে ইতি টানতে চাই না। আমি চাইআমার চালকজীবন ও মার্সিডিজ ট্যাক্সির গল্প একই সঙ্গে শেষ হোক।’