পুঁজিবাজারে ২০২০ সালের ১৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর নানামুখী উদ্যোগ ও সংস্কারের মাধ্যমে এক বছরেরও কম সময়ে পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছেন। শিবলী রুবাইয়াতের নেতৃত্বে গত দেড় বছরে ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। লেনদেন শত কোটি টাকা থেকে প্রায় তিন হাজার কোটিতে উন্নীত হয়। একাধিকবার বিশ্বসেরা পুঁজিবাজারের তালিকায় নাম উঠে বাংলাদেশের। পুঁজিবাজারের নানা উদ্যোগ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার আলতাফ মাসুদের সঙ্গে
‘আমরা এই মুহূর্তে সেকেন্ডারি মার্কেটে কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো দেশ বা ব্যাংকিং সেক্টরের একচ্ছত্র অধিপত্য থাকুক সেটা চাই না। একটা সময়ে পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং সেক্টরের বড় ইনভলভমেন্ট থাকার কারণেই ২০১০ সালের ধস হয়েছে হঠাৎ করে। এটা কিন্তু আমাদের এসইসির কারও দোষে হয়নি। হঠাৎ করে একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মার্কেটে প্যানিক করে ধ্বংস করে দেয়।’
এসইসির নানা উদ্যোগে দীর্ঘদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর এখন কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর কারণ কী?
আমাদের জানার কোনো কারণ নেই। এখানে মানুষ বিভিন্ন ধরনের কারণের কথা বলছেন। কেউ বলছেন দেশে পূজা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার একটি প্রভাব রয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের গুজব কাজ করছে। আমি পদত্যাগ করেছি, এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছে।
পুঁজিবাজারে গুজব একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে গুজব চললেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এসইসির বর্তমান কমিশন গুজব প্রশমনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেবে কি?
যারা সোশ্যাল মিডিয়াতে গুজব ছড়ায়, তাদের জন্য আমাদের নতুন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধমে দেখে নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। সম্প্রতি একজন গুজব ছড়াচ্ছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ইতালিতে থাকেন। তার দেশের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। তিনি ইতালি থেকে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে দেশের পুঁজিবাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তার বিস্তারিত তথ্য আমরা পেয়েছি।
অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে নজরদারি করতে পারলেও ফিল্ডে আমরা তা পারি না। সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা গণমাধ্যমে কিছু করলে আমরা ধরতে পারি। আমাদের আইসিটি অ্যাক্ট আছে, যার মাধ্যমে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। এ কারণে এখন গুজব অনেক কমে গেছে। কিছুদিন আগেও সিলেট থেকে একজনকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে উনি মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। আর এখন নতুন যাদের শনাক্ত করা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই দেশের বাইরে থেকে গুজব ছড়াচ্ছেন। গুজব মনিটরিংয়ে আলাদা সেল করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা কিংবা পরামর্শ করার একটি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখছি, অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান তা অনুসরণ করছে না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য।
সবার বোঝা উচিত, পুঁজিবাজার একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এখানে একটু গুজব, প্যানিক, তথ্য একটু ভুলভাবে আসলেই প্রতিক্রিয়া হয়। পশ্চিমা বিশ্বে বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীর ঠোঁট নাড়াচাড়ার ওপরেই বাজার ওঠানামা করে। এ রকম একটি বিষয় যখন আমরা জানি, তখন এমন বিষয়ে কিছু করার ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়ার জন্য ২০১২ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমি অনুরোধ করব পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে এমন কিছু করার আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য, তা না হলে আমাদের ম্যানেজমেন্টে খুবই অসুবিধা হচ্ছে।
গত দেড় বছরে কমিশনের অনেক সাফল্য রয়েছে। পুঁজিবাজারে গতি ফিরেছে, বিনিয়োগকারীরাও আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। সামনের দিনগুলোতে পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
যেদিন আমরা দায়িত্বে এসেছি, সেদিন আমাদের লেনদেন ছিল শত কোটি টাকার আশপাশে। আমি ওইদিনই বলেছিলাম এটা ২/৩ হাজার কোটি টাকায় যাবে। সেটা কিন্তু হয়েছে। এরপর আমি বলেছি, লেনদেন পাঁচ হাজার কোটি টাকায় যাবে। আমি যখনই যেটা বলি সবাই দেখি কেন যেন একটু হালকাভাবে দেখেন। কিন্তু আমার বলার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ থাকে। সেকেন্ডোরি মার্কেট দিয়ে আমরা অলরেডি ২/৩ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে গেছি। ৫ হাজার কোটি টাকার কথা বলেছি, কারণ আমাদের ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল, পার্পিচুয়াল বন্ড এখন ট্রেড হবে। আমাদের ট্রেজারি বন্ডের সাইজই কিন্তু দুই লাখ টাকার ওপরে। এর বাইরে পার্পিচুয়াল বন্ড রয়েছে। ১১টি ব্যাংকের বন্ড লেনদেন শুরুর কাজ চলছে। এটিবি বোর্ড ও আমাদের আইটি যখন আরও শক্তিশালী হবে দৈনিক লেনদেন তখন ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে চলে যাবে। আমরা কীভাবে পরিকল্পনা করছি, সবাই হয়তো তা জানে না। তবে আপনারা একটা একটা করে দেখবেন এবং সেভাবেই কাজ এগুচ্ছে।
প্রায় প্রতি বছর কোনো না কোনো ব্রোকারেজ হাউজ বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাৎ করছে। এসব ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীর সম্পদ আটকে থাকছে। বিনিয়োগকারীর সম্পদ সুরক্ষায় কোনো পদক্ষেপের কথা ভাবছেন কি-না?
বীমার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের সুরক্ষার বিষয়ে সম্প্রতি ডিএসইতে একটি সেমিনার হয়েছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আইডিআরএর সঙ্গে আলোচনা হবে। তবে ইচ্ছা থাকলেও এটা তাড়াতাড়ি করা যায় না। কারণ হচ্ছে, আমরা লিঙ্ক অ্যাকাউন্ট করে দিই, তরপরও অল্প কিছু থেকে যায়। এখানে দুপক্ষেরই সমস্যা থাকে। মাঝে মধ্যে দেখা যায়, ঘটনার পর অনেকেই বেশি টাকা দাবি করছেন। এক্ষেত্রে আমাদের আবার সেটা প্রমাণ করতে হয়। এজন্য একতরফা কিছু করা যায় না, দুপক্ষের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমরা চাইলেও দ্রুত সমাধান করতে পারি না। তবে লিঙ্ক অ্যাকাউন্ট করে শেয়ারগুলো দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা আমরা করি।
এসইসি চলতি বছর বিদেশে তিনটি রোড-শোর আয়োজন করেছে। এতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করার পাশাপাশি বিদেশি ও এনআরবিদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ এলে বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ার শঙ্কা করছেন অনেকেই। আপনি কী ভাবছেন?
প্রথমত, আপনি বাজার বলতে সেকেন্ডারি মার্কেটকে বোঝাতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা তা বলতে চাচ্ছি না। আমরা বাজার বলতে বন্ড, ডেরিভেটিভ, কমোডিটি মার্কেট এবং আরও অনেক ধরনের প্রডাক্ট আসছে বা আসবে সেগুলোর কথা বলতে চাচ্ছি। ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এসে গেছে অলরেডি। পার্পিচুয়াল বন্ড ট্রেডেড হবে। এসবেই বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। মিউনিসিপ্যাল বন্ডেও বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। ইনভেস্টমেন্ট মানে শুধু সেকেন্ডারি মার্কেটের এক্সিট প্ল্যান নয়। এমনকি সামনে কারেন্সি হেজিংয়েরও একটা ভালো ব্যবসা হবে। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।
আমরা যে বিদেশে যাই, সেখানে কিন্তু শুধু ক্যাপিটাল মার্কেট কিংবা সেকেন্ডারি মার্কেট প্রমোট করতে যাই না। এটা একটা অংশ। তবে আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ। আমরা চাই এদেশে যাতে ব্যাপক বিনিয়োগ আসে, এনআরবিদের সঙ্গে যাতে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে দেশের প্রতি এনআরবিদের ভালোবাসা যেমন তৈরি হয় আবার বিনিয়োগের বিপরীতেও তারা যাতে ভালো রিটার্ন পেতে পারেন, সেটাও তুলে ধরা হয়। সব মিলিয়ে এনআরবিরা লাভবান হবেন এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ব্যক্তিশ্রেণির ধনী বিনিয়োগকারী যাতে এখানে বিনিয়োগ করেন। এতে একদিকে বিনিয়োগকারীরা ভালো রিটার্ন পাবেন, আমরাও উপকৃত হব।
বিদেশে এ ধরনের অনুষ্ঠানের ফলে এসডিজি গোল অর্জনে আমাদের যে বিনিয়োগ লক্ষ্য, সেটা পূরণ হবে, যা এখনো ঘাটতিতে রয়েছে। আরেকটা হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমাদের যে ‘টেকনিক্যাল নো হাউ’ নেই, সেই ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা। খেয়াল করবেন, বিদেশে আমাদের রোড-শোতে বেজা, বেপজা, বিডার প্রতিনিধি যান। তাই আমরা বিদেশের ওই রোড-শোকে ইনভেস্টমেন্ট সামিট নাম দিয়েছি। এবার এই ধরনের আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নিজে যাচ্ছেন এবং সেখানে আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আমন্ত্রণ জানাব। দেশে বিনিয়োগ এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যাপিটাল মার্কেট, মানি মার্কেট লাভবান হবে।
সেকেন্ডারি বাজারে বিদেশিরা আসবেন যাবেন। আর যদি সেকেন্ডারি বাজারে বিদেশিদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে যাই, তাহলে দেখা যাবে একদিনেই ওরা এত বড় আকারে বিক্রি করে দিয়ে চলে যাবে এবং তাতে ওই দিনই ধস নামবে। আমরা এই মুহূর্তে সেকেন্ডারি মার্কেটে কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো দেশ বা ব্যাংকিং সেক্টরের একচ্ছত্র অধিপত্য থাকুক সেটা চাই না। একটা সময়ে পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং সেক্টরের বড় ইনভলভমেন্ট থাকার কারণেই ২০১০ সালের ধস হয়েছে হঠাৎ করে। এটা কিন্তু আমাদের এসইসির কারও দোষে হয়নি। হঠাৎ করে একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মার্কেটে প্যানিক করে ধ্বংস করে দেয়।
এখনো আমরা খেয়াল করে দেখেছি, গত কমিশনের সময় বিদেশিদের বড় বিনিয়োগ ছিল। প্রায়ই হঠাৎ করে বিদেশিরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যেত। এই মার্কেট থেকে হঠাৎ করে যদি ২/৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়, তখন কিন্তু ইমপ্যাক্ট চলে আসে। এখন আমাদের চাওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন সেক্টর ও রিটেইল ইনভেস্টরদের নিয়ে ডাইভার্সিফাইড করা। যদি একসঙ্গে এক হাজার রিটেইলার টাকা তুলে তাহলে কিন্তু বাজারের তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ইনস্টিটিউট যদি সব একসঙ্গে টাকা তুলতে থাকে, বিদেশি কিংবা ব্যাংকিং সেক্টর টাকা তুলতে থাকে তখন কিন্তু বিরাট সমস্যা দেখা দেয়।
তার মানে কি আমাদের সেকেন্ডারি বাজার এখনো বড় আকারের বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত নয়?
প্রস্তুত, কিন্তু আমরা হয়তো বড় আকারের ঝুঁকি নিতে ভয় পাই। কিন্তু সেজন্য আমরা বিদেশিদের বিনিয়োগে মানাও করছি না।