কুমিল্লার পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার ঘটনায় পাশের মাজারে আসা তিন আগন্তুকের সন্ধানে নেমেছে গোয়েন্দারা। কক্সবাজার থেকে মূল অভিযুক্ত ইকবালকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে নেমেছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। ধারণা করা হচ্ছে, তারাই কোরআন রাখতে ইকবালকে প্ররোচিত করেছিল। ইকবাল সন্দেহভাজন ওই তিনজনের নাম বলতে না পারলেও তার কাছ থেকে আগন্তুকদের চেহারার বর্ণনা নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্কেচ। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই ঘটনার শিকড়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল ইকবালসহ চারজনকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধৃত ইকবালের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তার কথার মাঝে কিছু অসংলগ্নতা রয়েছে। এ কারণে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে আরও কয়েকজনের সন্ধান করা হচ্ছে। তাদের ধরতে পারলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। তবে এ ঘটনায় শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হবে না বলে তিনি আশ^স্ত করেন।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ইকবালকে গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। এরপর খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশের আরও অন্তত দুটি ইউনিটের কয়েকজন সদস্য। সেখানে রাতভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর ভোরে কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কুমিল্লা জেলা পুলিশ লাইনসে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটসহ কয়েকটি সংস্থার চৌকশ কর্মকর্তারা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ঘটনার আদ্যপান্ত বর্ণনা করেন ইকবাল। তিনি দাবি করেন, চুরির অপবাদে ঘর ছাড়ার পর ২০ দিন ধরে তিনি ওই মাজারে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই ১০-১২ দিন আগে তার সঙ্গে পরিচয় হয় তিন আগন্তুকের। তারা এলাকার পরিচিত মুখ না হওয়ার কারণে প্রথম অবস্থায় তিনি তাদের এড়িয়ে চলতে থাকেন। তবে একপর্যায়ে নেশার জন্য তাদের সঙ্গে মিশতে থাকেন। মাজার ভক্তের বেশে থাকা ওই ব্যক্তিরা তাকে গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের ব্যবস্থা করেন। এমনকি প্রতিদিন ভাত খাওয়ার টাকাও সরবরাহ করতে থাকেন। এরপর তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ওই আগন্তুকরা মাজারে রাত যাপন না করলেও প্রতিদিনই সেখানে আসা-যাওয়া করতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত ইকবালের সঙ্গে নেশা করতেন। পূজা শুরু হলে তারা ইকবালকে মাজারের পাশে মন্দির থাকার কারণে ইসলাম ধর্ম অবমাননা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সময় উত্তেজিত করতে থাকেন। এ বিষয়ে ইকবালের ভূমিকা রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন। ঘটনার দিন রাতে তারা একসঙ্গে মাজারসংলগ্ন একটি স্থানে বসে গাঁজা সেবন করেন। এরপর তারাই মন্ডপে পবিত্র কোরআন রাখতে বলেন। এ সময় ওই আগন্তুকদের সঙ্গে তাল মেলান মাজারের মসজিদ ও মাজারের কর্মী মো. হুমায়ুন কবির ও খাদেম মোহাম্মদ ফয়সলও। একপর্যায়ে তাদের কথামতো ইকবাল মাজারের একটি কোরআন নিয়ে মন্ডপে রেখে আসেন। এমনকি ঘটনার দিন সকালে তিনি মন্দির ভাঙচুরেও অংশ নেন। বিষয়টি এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত মাজারের কর্মী ও খাদেমও স্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল বলেন, ইকবালের তথ্য অনুযায়ী ওই তিন আগন্তকের স্কেচ তৈরি করে তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা শনাক্ত হয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, ‘ইকবাল ভবঘুরে হলেও খুবই চালাক। সে অনেকটা হিসাব করেই পুলিশের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। পূজামন্ডপে হামলার সঙ্গে অনেক রাঘববোয়াল জড়িত থাকার তথ্য পাচ্ছি। তবে সবগুলো তথ্যই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, গত শনিবার ইকবাল, ৯৯৯-এ কল দেওয়া ইকরাম হোসেন, নগরের দারোগা বাড়ি মসজিদ ও মাজারের কর্মী মো. হুমায়ুন কবির ও খাদেম মোহাম্মদ ফয়সালকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন রাখা, মন্ডপের প্রতিমা থেকে গদা সরিয়ে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে কোন পুকুরে ফেলেন, সেটি বলেননি। তাকে নিয়ে পুলিশ ওই গদা উদ্ধার করবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে যাবে। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ভবঘুরে ও মাদকাসক্ত ইকবালকে এই অপকর্মে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্তও তাদের হাতে এসেছে। এসব তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তা ছাড়া ১১ অক্টোবর গভীর রাতে ওই অপ্রীতিকর ঘটনার আগে তিন ব্যক্তি ১০-১২ দিন ইকবালের সঙ্গে মাজারে আসা-যাওয়া করতেন বলে তথ্য পেয়েছেন তারা। তবে ঘটনার পর তাদের আর এলাকায় দেখা যায়নি। স্থানীয়রা তাদের পরিচয়ও জানাতে পারেনি। এতে ওই ঘটনার সঙ্গে ওই তিন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকার সন্দেহ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। তাদের পরিচয় উদঘাটন ও আটকের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ওই তিন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে এরই মধ্যে মাজার ও এর আশপাশের এলাকার প্রতিটি সিসি ক্যামেরার ৫ থেকে ১০ অক্টোবরের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন গোয়েন্দারা। এসব ফুটেজ পর্যালোচনা করে ইকবালের সঙ্গে মাজারে আসা-যাওয়া করা লোকজনের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে; যা থেকে ঘটনার পর এলাকা থেকে সরে পড়া তিন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তদন্তে জড়িত পুলিশের একটি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, স্পর্শকাতর এ বিষয়টি তদন্তে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যাতে কোনোভাবে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, এ ব্যাপারে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন। সরকারের ওপরমহল থেকেও তাদের এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাই কিছুটা ধীরে হলেও প্রতিটি বিষয় নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন তারা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইকবাল কিছুটা অপ্রকৃতস্থ ও মাদকাসক্ত হওয়ায় ষড়যন্ত্রকারী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে ভয়ংকর অপকর্ম করার জন্য বেছে নিয়েছে। তাকে মাদক কিংবা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে হয়তো এই কাজে সম্পৃক্ত করেছে। তাই কারা, কিসের প্রলোভন দেখিয়ে ইকবালকে এ ধরনের অপরাধে যুক্ত করেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তারা। আমরা আশাবাদী, যারা তাকে দিয়ে এই অপকর্মে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা দ্রুত সময়ের মধ্যেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে আসা এবং হনুমানের মূর্তির হাত থেকে গদা সরিয়ে নেওয়ার কথা ইকবাল নিঃসংকোচে স্বীকার করলেও কে বা কারা তাকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে এখনো জানাননি। এমনকি ঘটনার আগে যে তিন ব্যক্তি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করেছেন এবং একসঙ্গে মাজারে যাতায়াত করেছেন, তাদের ব্যাপারেও তিনি কোনো তথ্য দিচ্ছেন না। কখনো বলছেন, বহিরাগত ২-৩ জন তাকে এটা-ওটা খাইয়েছেন, গাঁজা-ইয়াবাও দিয়েছেন। তার সঙ্গে ধর্ম-অধর্ম, মাজার-মন্দির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তাদের চেহারা তার ভালো মনে নেই। ঘটনার পরই ছায়া তদন্তে সম্পৃক্ত হয়েছে র্যাব, পিবিআইসহ কয়েকটি সংস্থা। এর মধ্যে একটি সংস্থা ইকবালের কাছ থেকে ওই তিন ব্যক্তির চেহারার বর্ণনা শুনে তাদের চেহারার স্কেচ তৈরির চেষ্টা করছে। সুষ্ঠুভাবে এ কাজ সম্পন্ন করা গেলে তাদের চিহ্নিত করা যাবে। তারা স্থানীয় নাকি বহিরাগত এ বিষয়টিও পরিষ্কার হবে। এতে তদন্তের বড় একধাপ অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা জানান, ঘটনার নেপথ্য মদদদাতারা কোনো জঙ্গি সংগঠনের সদস্য কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সন্দেহভাজন ওই তিন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে তদন্তে।
ইকবাল সাত দিনের রিমান্ডে : কুমিল্লা প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেন জাকির জানান, ইকবালসহ ৪ আসামির ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল শনিবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম মিথিলা জাহান নিপা আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে তাদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুল ইসলাম।
এদিকে, সকালে নগরীর নানুয়ার দীঘিরপাড় এলাকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে একটি এবং জাসদের হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পৃথক প্রতিনিধিদল। এ সময় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন গয়েশ^র চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, এ সরকার জনবিচ্ছিন্ন একটি সরকার, ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই সরকার এসব নাটক করছে। একই সময় জাসদের হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তার সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর আহমেদ পল্টু, সাংবাদিক আবেদ খানসহ বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।