প্রকাশ্যে বালু নদী ভরাট

ঢাকার চারপাশের নদী দখল ও দূষণমুক্ত করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার সরকারি উদ্যোগের মধ্যেই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বালু নদী দখলের চেষ্টা করছে। সরকার ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীগর্ভ ও নদীতীরের বিরাট এলাকা ইতিমধ্যেই ভরাট শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কয়েকটি ড্রেজারের মাধ্যমে নদী ভরাটের এ কাজ রাতারাতি শেষ করেছে তারা। বিশাল এলাকাজুড়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডও বসিয়ে দিয়েছে তারা। নদী রক্ষা না করতে পেরে শেষে প্রাণ গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার। গতকাল রবিবার রাতে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বাদী হয়ে রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় প্রাণ গ্রুপের কর্মকর্তাসহ মোট চারজনকে মামলায় আসামি করা হয়। এ ছাড়া এ কাজে সহযোগীরা জন্য আরও অজ্ঞাত ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধি ১৪৩/১৮৬/২৮৩/৪৩১/৪৩৪/৫০৬ অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে এই প্রতিষ্ঠানের শীতলক্ষ্যা নদী দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।

বিআইডব্লিউটিএর দায়ের করা মামলায় এজাহারে বলা হয়, ‘নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে নদীদখলমুক্ত রাখতে কাজ করা হচ্ছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে রাজাখালীর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আসান হাবিব খান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রকৌশলী মিলে খিলক্ষেত থানার পাতিরা মৌজায় বালু নদীর পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখতে পায় বালু নদীর লে আউট সীমানা পিলার ২৮, ২৯ এবং ৩০ নম্বরের ভেতরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ২৫০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৫০ ফুট প্রস্থ ও ১২ হাজার ৫০০ বর্গফুটের নদীর তীরভূমি ও নদীগর্ভ ভরাট করেছে। সেখানে অভিযান চালিয়ে কাউকে ধরা সম্ভব হয়নি।’

এজাহারে আরও বলা হয়, ভরাট সম্পর্কে স্থানীয় জনসাধারণের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ম্যানেজার (অ্যাডমিন) মো. ফয়সাল মাহমুদ, ম্যানেজার সরওয়ার আলম, এমভি তিথি ড্রেজারের মালিক মো. জাহেদ আলী, সোহা মেসার্স মদিনার মালিক মো. মোক্তারসহ আরও ৮-১০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের এরূপ কার্যকলাপে নদী ভরাট হয়ে যাওয়া, নৌপথ সংকুচিত, পরিবেশ বিপন্ন, নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়া, সরকারি সম্পক্তি দখল, সীমানা পিলার নির্মাণকাজে বাধা দেওয়াসহ বেআইনিভাবে লোকজন জড়ো করে ভরাট কার্যক্রমের মতো অপরাধ করেছে।’

খিলক্ষেত থানার ওসি মুন্সী ছাব্বীর আহম্মদ বলেন, নদী ভরাট নিয়ে আমরা বিআইডব্লিউটিএ থেকে একটা এজাহার পেয়েছি। এর ভিত্তিতে একটি মামলা রুজু হয়েছে। মামলা নম্বর ২৪, তারিখ ২৪-১০-২০২১। তদন্ত করে এ ব্যাপারে বলা যাবে।

এদিকে গতকাল অভিযান চালানো ওই স্থানে সরেজমিন দেখা যায়, নদীর মধ্যে এখনো বালুভর্তি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি বাল্কহেড। সীমানা পিলার থেকে নদীর দিকে অন্তত ১০০ ফুট পর্যন্ত বালু ভরাট করা হয়েছে। সেখানে লাগানো হয়েছে ‘ক্রয়সূত্রে এই সম্পত্তির মালিক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ’ লেখা সাইনবোর্ড। এছাড়া প্রাণ-আরএফএলের পুরনো কিছু নিরাপত্তা চৌকি, রেডিমিক্স ও কংক্রিট ব্লক ফ্যাক্টরি এবং গোডাউনের একাংশ সীমানাপিলার ছাড়িয়ে চলে এসেছে নদীর দিকে।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, নদী দখল-দূষণ মুক্ত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ঢাকার চারপাশে প্রবহমান বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী দখল, দূষণমুক্ত করা ও মৃতপ্রায় নদীগুলোকে উদ্ধারে হাইকোর্টের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনার আলোকে জেলা প্রশাসক, বিআইডব্লিউটিএ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। এর আগেও আমরা বালু নদীতে অভিযান চালিয়েছি। পুনর্দখল ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এর আগে গত মার্চ মাসে রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কলিঙ্গা এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী তীরের জমি প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি কর্তৃক বালু দিয়ে ভরাটকে কেন্দ্র করে ওই কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৩৭ জন আহত হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শটগানের দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

নরসিংদীর পলাশ থানার ডাঙ্গা কাজিরচর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাশে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির অফিস। আর নদীর পশ্চিম পাশেই রয়েছে কলিঙ্গা গ্রাম। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, ওই কোম্পানি তাদের সুবিধার্থে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাশে কলিঙ্গা গ্রামে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান ও জেটি নির্মাণের উদ্দেশ্যে বালু ভরাট শুরু করে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনেকের জমি না কিনেই বালু ভরাট করছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে পুরো জমি না কিনে বালু ভরাট করতে গেলে গ্রামবাসী বাধা দেয়। কিন্তু গ্রামবাসীর বাধা অগ্রাহ্য করে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মচারী ও সন্ত্রাসীদের নিয়ে বালু ভরাটের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এরপর গ্রামবাসী ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বাগ্্বিতণ্ডা শুরু হলে একপর্যায়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।