বিচার করে হামলা-বিদ্বেষ রুখতে হবে

দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলার তান্ডব চলছেই। এ নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করা হলেও হামলা থামছে না। সাম্প্রতিক কালের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পাশাপাশি দেশে সমান্তরালভাবে বেড়ে চলেছে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা-বিদ্বেষের মানসিকতা। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিদ্বেষ ছড়ানোর চর্চা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন এই পরিস্থিতির নেপথ্যে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে বিচার না করার সংস্কৃতি। দেশে হিন্দুদের ওপর হামলা, বৌদ্ধদের ওপর হামলা, খ্রিস্টানদের ওপর হামলাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ওপর হামলার কোনো বিচার হচ্ছে না। এ কারণেই বারবার প্রায় একই কায়দায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে, বসতবাড়িতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করা হচ্ছে, লুটতরাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় মামলা হলেও কোনো মামলাতেই বিচার হচ্ছে না।

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘বিচার না হওয়ায় বারবার হামলা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিগত দুই দশকে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় করা মামলায় বিচার না হওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, সাম্প্রদায়িক হামলা-সন্ত্রাসের ঘটনা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে গত ১৯ বছরে সারা দেশে ২৫৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার একটিতেও রহস্য উদঘাটন হয়নি। যে কারণে বিচারও শেষ হয়নি। ইতিমধ্যে জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে বিভিন্ন মামলার বিপুল সংখ্যক আসামি। আবার কিছু মামলা আছে দিনের পর দিন ধরেও তদন্ত শেষ হচ্ছে না। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বাচনী বিজয়ের পরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয় তার কোনো মামলারই বিচার হয়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন অনেক সুপারিশ করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। একইভাবে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে বিগত বারো বছরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোরও কোনো বিচার হয়নি। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধদের ওপর হামলার ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি বিচার কার্যক্রম। অন্যদিকে বেশিরভাগ আসামিই ইতিমধ্যে জামিন পেয়েছে। তাদের মধ্যে চার শতাধিক আসামিই পলাতক। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বসতিতে হামলার তদন্ত প্রায় পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। ওই সময় যাদের আটক করা হয়েছিল তারাও জামিনে মুক্ত হয়ে গেছে। পাবনার সাঁথিয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলাতেও কেউ শাস্তি পায়নি। সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও সবাই জামিন পেয়েছেন।

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই যে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা, সন্ত্রাস এবং ঘৃণা-বিদ্বেষ বাড়তে থাকার নেপথ্যে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে সেটা সরকারসহ দেশের সব রাজনীতিকদেরই স্বীকার করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের সূত্র জানিয়েছে, সরকারের হাইকমান্ড সাম্প্রদায়িক হামলার ২৫৩টি মামলা পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব মামলার তদন্ত শেষ করা এবং বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার এসব মামলা যেন রাজনৈতিক বিরোধীদের জব্দ করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়। স্মরণ করা যেতে পারে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামি করে নানাভাবে হয়রানি করে। এখন ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেই এসব হামলার নেপথ্যে দায়ী করছেন। অন্যদিকে, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আসছে। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে প্রকৃত সব অপরাধীর বিচার করা গেলেই জনগণকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে আসল বার্তাটি দেওয়া সম্ভব হবে। সেটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।  

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরেও দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা-বিদ্বেষের এই ভয়াবহতা থেকে খুব স্পষ্টভাবেই এই শিক্ষা নিতে হবে যে, সমাজে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজন রোধ করা না গেলে দেশকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, দেশে হিন্দুদের পূজা উপলক্ষে একটা শঙ্কা বহু আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কেননা, বাংলাদেশের যে সমাজ, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে মৌল ভিত্তি, যে এখানে বাঙালি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এবং অন্যান্য জাতি-সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করছে এবং নিজ নিজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাচ্ছে; সেটাকে একটা বিভাজনের দিকে নিয়ে যাওয়া আর বিভাজন থেকে ঘৃণা-বিদ্বেষ-সংঘাত উসকে দেওয়ার মারাত্মক এই অসুখ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। এজন্য এবারের ঘটনাসহ অতীতের সব সাম্প্রদায়িক হামলার বিচারে একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। কেননা এসব ক্ষেত্রে কার কী দায়দায়িত্ব, কার কী ভূমিকা সেসব অবশ্যই সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে উদঘাটিত হতে হবে। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবারই জবাবদিহি থাকতে হবে।