নোয়াখালীতে তাণ্ডব

‘স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার জবানবন্দিতে ১৫ জনের নাম’

নোয়াখালীর চৌমুহনীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি ফয়সাল ইনাম কমল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জেলার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাঈদীন নাঁহীর আদালতে গত সোমবার দেওয়া ওই জবানবন্দিতে তিনি পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুসহ বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ১৫ জনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় নোয়াখালীর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তবে তিনি ‘তদন্তের স্বার্থে’ হামলার সঙ্গে জড়িত কারও নাম বলতে রাজি হননি।

এছাড়া পূজাম-প ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় সুধারাম, হাতিয়া, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এবং র‌্যাব সদস্যরা গত সোমবার রাতভর অভিযান চালিয়ে আটজনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করেছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

এদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে ‘পুঁজি করে’ বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘গণগ্রেপ্তার’ এবং হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে নোয়াখালী জেলা বিএনপি। গতকাল বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহজাহানের বাসায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ফয়সাল ইনাম কমলকে সোমবার রাতে জেলার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাঈদীন নাঁহীর আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন। জবানবন্দিতে কমল সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার উসকানিদাতা হিসেবে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুসহ বিএনপি-জামায়াতের ১৫ নেতার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।

সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমিল্লার একটি মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার অভিযোগে সহিংসতা শুরুর পর তা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, কক্সবাজার, ফেনী ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ অক্টোবর দশমীর দিন নোয়াখালীর চৌমুহনীতে কয়েকটি মন্দির ও মণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেদিন হামলার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একজনের মৃত্যু হয়। পরদিন মন্দিরের পুকুর থেকে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

নোয়াখালীর ঘটনায় মোট ২৬টি মামলা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ২০০ জনকে। এর মধ্যে ফয়সাল ইনাম কমলসহ বিএনপি-জামায়াতের ১১ নেতাকর্মীকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে গত রবিবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বেগমগঞ্জ মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বেগমগঞ্জের রাজুল্লাহপুর গ্রামের আবু হানিফের ছেলে ফয়সাল ইনাম কমলকে (৩৯) সহিংসতার ঘটনার অন্যতম উসকানিদাতা ও ইন্ধনদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয় ওই মামলায়।

আরও ৮ জন গ্রেপ্তার : গত সোমবার রাতভর চালানো অভিযানে গ্রেপ্তাররা হলো সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সুমন (৩৩), বেগমগঞ্জের করিমপুরের আলমগীর হোসেনের ছেলে ইমরান হোসেন নিশান (২০), একই এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে রনি (২৮), মীরওয়ারিশপুর গ্রামের প্রয়াত রফিকউল্লাহর ছেলে বিএনপিকর্মী মো. ইউসুফ (৩০), হাজীপুরের নুরুজ্জামানের ছেলে আক্তারুজ্জামান (৫০), সোনাইমুড়ীর রশিদপুরের প্রয়াত ফজলুল হক পাটোয়ারীর ছেলে রবিউল হোসেন রনি (৩২), লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের চরভুতা গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে সাহেদুল ইসলাম (২২) এবং হাতিয়া পৌর বিএনপির প্রচার সম্পাদক ছেরাজুল হক বেচু (৪২)।

গণগ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির : সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে ‘পুঁজি করে’ বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘গণগ্রেপ্তার’ এবং হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে নোয়াখালী জেলা বিএনপি। গতকাল দুপুর ১টার দিকে জেলার রশিদ কলোনিতে বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহজাহানের বাসার চতুর্থ তলায় হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, দুর্গাপূজায় কুমিল্লার পূজাম-পে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় চৌমুহনীসহ জেলার কয়েকটি স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজাম-পে একদল উগ্রবাদী হামলা চালিয়ে লুটপাট, ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। বিএনপি সবসময়ই ধর্মীয় সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। ধর্মীয় সহিংসতা নিয়ে ইতিমধ্যে নোয়াখালীতে অনেকগুলো মামলা হয়েছে। প্রত্যেকটি মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার সময় অনেকেই এলাকায় ছিলেন না। ধর্মীয় সহিংসতাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক হয়রানি করা হচ্ছে দাবি করে তা বন্ধ করাসহ গ্রেপ্তার সব বিএনপি নেতাকর্মীর দ্রুত নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

অন্যদের মধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সলিম উল্যাহ বাহার হিরন ও জেলা কৃষক দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান পলাশ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।