সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচারে ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’ ছিল প্রথাবিরোধী এক অনন্য সৃষ্টি। এ বইয়ের মাধ্যমে আমেরিকার দাসবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ঘনীভূত হয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অভিযাত্রায় শামিল হয়। আঙ্কেল টমস কেবিনের লেখিকা হেরিয়েট বিচার স্টোকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
১৮৬২ সাল। দাস প্রথার বিলুপ্তি নিয়ে দক্ষিণ বনাম উত্তর আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে দেখা করতে এসেছেন একজন লেখিকা। আঙ্কেল টমস কেবিনের লেখিকা হেরিয়েট বিচার স্টো। হেরিয়েট বিচারের সঙ্গে ছিল তার ছেলে চার্লস স্টো। দেখা করে শ্রদ্ধা মিশ্রিত কণ্ঠে আব্রাহাম লিঙ্কন বলে বসলেন, ‘সুতরাং আপনিই সেই নারী যে কিনা একটি বই লিখে মহান এক যুদ্ধের সূচনা করে দিয়েছেন?’ লিঙ্কনের কাছে এ যুদ্ধ মহানই ছিল। দাসপ্রথার বিলুপ্তিতে তিনি ছিলেন সবসময় সোচ্চার। ১৯ শতকে আমেরিকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দাসপ্রথা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের পারস্পারিক মতামত। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা আলোচনা ছাপিয়ে যায়। দাসত্ববিরোধী রাজনীতিবিদ হিসেবে ১৮৬০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসেন আব্রাহাম লিঙ্কন। দাসত্ববিরোধী প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিপত্তি ঘটে যায়। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার ৭টি অঙ্গরাজ্য নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেয়। লিঙ্কন প্রথমদিকে সমঝোতার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা দাসপ্রথাকে জিইয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। ফলে যুদ্ধের মেয়াদ বাড়তে থাকে। তৎকালীন আমেরিকার ৩৪টি অঞ্চলের মধ্যে ১১টি রাজ্যই দাসপ্রথার পক্ষে দাঁড়ায়। ১৮৬২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দাসপ্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তিকল্পে একটি মুক্তির ঘোষণাপত্র নিয়ে হাজির হন প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন। আমেরিকার জন্য গৃহযুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে এই ঘোষণা। কিন্তু একথা সত্যি যে, কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শই দাসপ্রথাকে মুছে ফেলতে সক্ষম ছিল না। এ ঘোষণার আগে বেশ কয়েক দশক ধরে আমেরিকার সমাজে দাসপ্রথাবিরোধী মনোভাব দানা বেঁধে উঠছিল। সে আগুনে ঘি ঢালে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’। বইটি প্রথম সপ্তাহে ১০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। বৃহত্তর স্বার্থে আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলোপই হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকার ভবিষ্যৎ। চলমান নিপীড়ন ও দাসবিরোধী হিসেবে এ যুদ্ধে যোগ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না তখন। হেরিয়েট বিচার স্টো তখন দাসপ্রথার বিলোপে সোচ্চার মুখ। যদিও মাঠেঘাটে নিজের বই নিয়ে কম কথা বলেন। কিন্তু দাসপ্রথার বিলোপে বহুদিন ধরে লেখালেখি চালিয়ে গেছেন তিনি। ফলে আমেরিকায় দাসপ্রথাবিরোধী প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের জয়ে অনেকখানিই অবদান ছিল হেরিয়েট বিচার স্টোয়ের। অনেক স্থানে এমন কথাও শোনা যায়, আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরুতে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল আঙ্কেল টমস কেবিনের।
কিন্তু সে সময় খুব কমসংখ্যক নারীই ঘরের বাইরে বেরিয়ে বিশাল জনসভায় কথা বলতে পারতেন। পুরুষের সঙ্গে প্রকাশে কথা বলা অশোভন হিসেবে বিবেচিত ছিল তখন। তাই খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও খুব কম সময়ই নিজের বই নিয়ে কথা বলতেন তিনি। তার সম্মানে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে সেখানেও বইয়ের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতেন। অবশ্য তার পরিবর্তে তার জীবনসঙ্গী ক্যালভিন ও তার ভাই বইয়ের সপক্ষে প্রচার চালিয়ে যান।
আঙ্কেল টমস কেবিনের প্রেক্ষাপট
১৮৫০ সালে হেরিয়েট বিচার স্টোয়ের জীবনসঙ্গী কেলভিন স্টো বোডোইন কলেজের অধ্যাপক হন। পরিবারসহ মেইনে চলে আসেন তারা। একই বছর আমেরিকান কংগ্রেস পলাতক ক্রীতদাস আইন পাস করে। এ আইনের আওতায় ক্রীতদাস পালিয়ে গেলে তাদের ধরে এনে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। তৎকালীন অনেক রাজ্যে দাসত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে এই আইন পাসের পর ক্রীতদাসরা যেকোনো রাজ্যে পালিয়ে গেলেও সেখান থেকে তাদের ধরে আনতে আর কোনো বাধা থাকে না।
১৮৫১ সালে হেরিয়েট বিচার স্টোয়ের এক ছেলে মারা যায়। মৃত্যুকালে ছেলের বয়স ছিল ১৮ মাস। এই মর্মান্তিক ঘটনা তাকে দাস জীবনের ব্যথা বুঝতে সাহায্য করেছিল। দাস মায়ের কোল থেকে যখন শিশুকে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় তখন সে মায়ের অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করেন তিনি। সন্তানহারা মায়ের বেদনাকে লেখায় রূপ দিলেন। পলাতক ক্রীতদাস আইন ও সন্তান হারানোর বেদনাই দাসজীবনের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে লিখতে উৎসাহিত করেছিল।
আঙ্কেল টমস কেবিনের প্রধান চরিত্র টম। কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তিনি একজন সম্মানিত ক্রীতদাস ছিলেন। নিজের পরিবার ও মালিকের জন্য তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ। মালিকের অধীনে তিনি তার পরিবার নিয়ে বাস করতেন। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড়ে সব এলোমেলো হয়ে যায়। মালিকের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বিক্রির উদ্দেশ্যে নিলামে তোলা হয় তাকে। নিলাম শেষে জাহাজে তোলা হয়। জীবনে আসে নতুন মোড়। জাহাজেই এক ধনী শ্বেতাঙ্গ পরিবারের বাচ্চা মেয়ে ইভার জীবন বাঁচান তিনি। কৃতজ্ঞচিত্তে ইভার বাবা টমকে কিনে নেন। ইভার একমাত্র ভালো বন্ধু হয়ে দাঁড়ায় আঙ্কেল টম। উপন্যাসের কাহিনী নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যায়। আসে নতুন মুখ, নতুন পরিস্থিতি। এক পর্যায়ে ইভা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মৃত্যুশয্যায় ইভা তাদের অধীনে থাকা দাসদের মুক্ত করে দিতে বাবাকে অনুরোধ জানায়। মেয়ের অনুরোধ ফেলতে পারেন না বাবা। কিন্তু তার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। টমের ভাগ্যে জোটে নতুন মালিক। নতুন মালিক নির্মম। দাসদের ওপরে নৃশংস অত্যাচার চালান। তিনি দাসপ্রথা জিইয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। তার অত্যাচার থেকে বাঁচতে দুই দাস পালিয়ে যায়। টমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে সে নাকি তাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। বাকি সব দাসদের চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য আঙ্কেল টমের ওপরে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। সারা জীবন খ্রিস্টধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস ছিল তার। জীবনের শেষ সময়েও সে বিশ্বাস হারাননি তিনি। মালিকের বেধড়ক মারধরের শিকার হয়ে মারা যান তিনি। আঙ্কেল টমস কেবিনের মাধ্যমে শক্তিশালী ধর্মীয় বার্তা দেওয়া হয়। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয় দাসত্ব ও খ্রিস্টধর্মের মতবাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দাসত্ব পাপ।
সে সময় দাসবিরোধী মতামত তুলে ধরার জন্য স্থানীয় একটি পত্রিকা বের কর হয়। সে পত্রিকার নাম ‘দ্য ন্যাশনাল এরা’। এ পত্রিকাতেই প্রথমবারের মতো ধারাবাহিক লেখা হিসেবে ছাপানো হয় আঙ্কেল টমস কেবিন। ১৮৫১ সাল থেকে ১৮৫২ সালব্যাপী সে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছে। তারপর দুই খণ্ডের উপন্যাস হিসেবে ছাপা হয় বইটি। এক বছরের ভেতরে আমেরিকায় ৩ লাখ কপি ও ব্রিটেনে ১০ লাখেরও বেশি কপি বই বিক্রি হয়। রাতারাতি সফল লেখিকা হিসেবে সবার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। উনিশ শতকের প্রথাবিরোধী লেখিকা হিসেবে দাসপ্রথার বিলোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সফরে যান তিনি।
বেড়ে ওঠা
১৮১১ সালে ১৪ জুন কানেকটিকাটের লিচফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন হেরিয়েট বিচার স্টো। বাবা লিমান বিচার। ভাইবোনদের ভেতরে তিনি ছিলেন সপ্তম। পাঁচ বছর বয়সে মা মারা গেলে তিনি তার বড় বোনের হাতে লালিত-পালিত হন। ফলে তার জীবনে বড় বোন ক্যাথরিন বিচারের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আট বছর বয়সে তিনি লিচফিল্ডের ফিমেল অ্যাকাডেমিতে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ১৮২৪ সালে ক্যাথরিন বিচারের হার্টফোর্ড ফিমেল সেমিনারিতে অংশ নেন। অল্পবয়সী মেয়েদের জন্য অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার স্থান ছিল সেটি। তার বড়বোন ক্যাথরিন ছিলেন নারীশিক্ষায় সোচ্চার। ক্যাথরিন বিচার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মেয়েদের পুরুষদের মতো একইরকম শিক্ষার সুযোগ দেওয়া উচিত। যদিও তিনি কখনই নারীর ভোটাধিকার সমর্থন করেননি। ১৮২৩ সালে তিনি হার্টফোর্ড ফিমেল সেমিনারি প্রতিষ্ঠা করেন। সে যুগের গুটি কয়েকটি বিদ্যালয়ের মধ্যে ফিমেল সেমিনারি নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ফলে সমাজকর্মী ও প্রথাবিরোধী অগ্রযাত্রায় নিজের বোন হ্যারিয়েট বিচারকেও তিনি স্কুলে ভর্তি করে দেন। পরে পড়াশোনা শেষে ১৮২৯ সাল থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত হার্টফোর্ড মহিলা সেমিনারিতে শিক্ষকতা করেন হ্যারিয়েট বিচার স্টো।
সাহিত্যজীবন
পারিবারিকভাবে প্রথাবিরোধের প্রচলন থাকায় পরিবারের অনেক সদস্যই লেখালেখির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার ভাইবোনদের অনেকেই সমাজের পরিচিত মুখ ছিলেন। ১৮৩২ সালে সপরিবারে ওহাইওর সিনসিনাটিতে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের লেখালেখি নিয়ে তেমন সোচ্চার ছিলেন না তিনি।
সিনসিনাটিতে গিয়ে হেরিয়েট বিচার স্টো ওয়েস্টার্ন ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। এটিও ক্যাথরিন প্রতিষ্ঠিত আরেকটি স্কুল। এ স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়েই সাহিত্যের সঙ্গে নিজের পথচলা আরও গভীর হয়ে ওঠে তার। ছোটগল্প ও নিবন্ধ লেখা শুরু করেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে পাঠ্যপুস্তকের সহ-লেখক হিসেবে তার নাম উঠে আসে।
কেন্টাকির নদীর ওপারেই অবস্থিত ওহাইওর আরেকটি রাজ্য ছিল। সে রাজ্যে দাসত্ব ছিল বৈধ। হেরিয়েট বিচার স্টো প্রায়ই সেখান থেকে পালিয়ে আসা দাসদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের যতœ নিতেন। তাদের জীবনের গল্প শুনতেন। সেখান থেকেই তার দাসবিরোধী ভাবনা আরও দৃঢ় হয়। হেরিয়েটের চাচা তাকে বিভিন্ন ক্লাবে আমন্ত্রণ জানান। এরকমই একটি ক্লাব ‘সেমিকোলন’। সেমিকোলন ক্লাবে গিয়ে শিক্ষক কেলভিন এলিস স্টোসহ বিশিষ্ট লেখকদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। সাহিত্য জগতের প্রকাশক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে হেরিয়েট বিচারের লেখার দক্ষতা বাড়তে থাকে।
কেলভিন এলিস স্টো ও হেরিয়েট বিচার ১৮৩৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিয়ে করেন। জীবনসঙ্গী হিসেবে কেলভিন ছিলেন উদার। হেরিয়েট বিচারের লেখা ছোটগল্পের নিয়মিত পাঠক ছিলেন তিনি। ১৮৪৬ সালে হেরিয়েট দ্য মে ফ্লাওয়ার; অর, স্কেচ অব সিনস অ্যান্ড ক্যারেক্টারস অ্যামং দ্য ডিসেন্ডেন্টস অব দ্য পিলগ্রিমস প্রকাশ করেন।
তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই আঙ্কেল টমস কেবিন। উত্তর আমেরিকার রাজ্যগুলোয় আঙ্কেল টমের দাস জীবনের গল্প ঝড় তুলে দিয়েছিল। এ বইয়ের মাধ্যমে তৎকালীন আমেরিকানদের মনে বহুল চর্চিত দাসপ্রথা নিয়ে জনমানুষের মনে ক্ষোভ জমে ওঠে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন ‘দাস’ হয়ে জন্ম নেওয়া মানুষটিও পরিবারের আশা করতে পারে। তাদের মনেও অন্য সবার মতোই আশা ও স্বপ্নের বাস থাকে। তারা প্রতিনিয়ত যে অমানবিক জীবন ও সহিংসতার সম্মুখীন হচ্ছিলেন সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। দাসপ্রথা হয়ে ওঠে ‘অদ্ভুত’। আমেরিকার বেশিরভাগ মানুষই আঙ্কেল টমের কষ্টকে ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে দাসবিরোধী হয়ে ওঠেন। ফলে দাসপ্রথার বিলোপ চাওয়া ব্যক্তিরা হয়ে হয়ে একটি ছোট দল থেকে হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকায় আঙ্কেল টমস কেবিন ক্রীতদাস মালিকদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাদের মনে হয়েছিল, হেরিয়েট বিচার তার বইয়ে দাস ব্যবসায়ীদের আক্রমণ করেছেন। তাদের ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও বইটিতে কোমল মনের অধিকারী দাস ব্যবসায়ীদের কথাও বলেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার দাস ব্যবসায়ী লোকজন তাদের প্রচলিত বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন। অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার জন্য তাদের কাছে দাস ব্যবসা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি স্থানে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে বেশি। ফলে সেখানেও চরম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি। এ বইয়ের জনপ্রিয়তা যত বাড়ে, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে ভাবনার ফারাক তত বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১৮৫০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রিপাবলিকান পার্টিতে দাসত্ববিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়ে ওঠে। গণমানুষের সেই মনোভাবের কারণেই আব্রাহাম লিঙ্কন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আর অবধারিতভাবে আমেরিকা মুখোমুখি হয় গৃহযুদ্ধের।
হেরিয়েট বিচার স্টোয়ের দাসত্ববিরোধী লেখালেখি চলতে থাকে। ১৮৫৩ সালে তিনি দুটো বই প্রকাশ করেন আ কি টু আঙ্কেল টমস কেবিন ও ড্রেড : আ টেল অব দ্য গ্রেইট ডিসমেল সোয়াম্প। আঙ্কেল টমস কেবিন বইয়ে প্রকাশিত তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করার জন্য নথি ও বিভিন্ন দাসের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার তুলে ধরেন ‘আ কি টু আঙ্কেল টমস কেবিন’ বইয়ে। আর ‘ড্রেড : আ টেল অব দ্য গ্রেইট ডিসমেল সোয়াম্প’ বইয়ে তুলে ধরেন ব্যক্তিগত ভাবনা ‘দাসত্ব সমাজের জন্য অমানবিক’। ১৮৯৬ সালের ২ জুলাই নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। এক জীবন শেষে পেছনে রেখে যান শব্দ, সাহিত্য ও আদর্শের বহু উত্তরাধিকার।