উসকানি ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে সাম্প্রদায়িক উসকানি ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আশিক মল্লিক (৩০) নামে এক হিন্দু যুবককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। যিনি কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সহযোগী নিয়ে ফেইসবুক পেজ খুলে মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করছিলেন। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সহযোগী অন্য সদস্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের অস্থায়ী মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলেন এসব তথ্য জানান র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন।

তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় লিপ্ত হয় স্বার্থান্বেষী মহল। কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এটাকে পুঁজি করে নানা ধরনের অপপ্রচার শুরু করে। র‌্যাব সাইবার টিম দেখতে পায়, কতিপয় ব্যক্তি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আসছিল। কেউ কেউ ফেইসবুকে বিভিন্ন গুজব ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে সহিংসতার ইন্ধন দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এ ধরনের একাধিক ফেইসবুক গ্রুপ ও তাদের অ্যাডমিনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায় র‌্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে আশিক মল্লিককে গ্রেপ্তার করা হয়।’

র‌্যাবের কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গুজব ছড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। ঢাকা কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করে ফার্মগেটে একটি কোচিং ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৬ অক্টোবর একটি ফেইসবুক পেজ খুলে ওই পেজে এবং তার ব্যক্তিগত আইডি থেকে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকেন আশিক। তিনি নিজেই পেজের অ্যাডমিন এবং তার সমমনা আরও কয়েকজনকে অ্যাডমিন হিসেবে নিয়োগ করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই পেজের সদস্য ও ফলোয়ার কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই ফেইসবুক পেজ থেকে কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা তথ্য প্রচার ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হচ্ছিল। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও সহিংসতা ছড়ানোর অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল।

ওই ফেইসবুক পেজে প্রতিবেশী দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নৃশংস ঘটনার ভিডিও আপলোড করে জনমনে ভয়ভীতি তৈরিসহ উসকানি দেওয়া হচ্ছিল। অভিযুক্ত আশিক মল্লিক প্রতিটি পোস্ট হ্যাশট্যাগ করে দেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

যেসব গুজব ছড়ায় : সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, আশিক মল্লিক ও তার সহযোগীরা পার্বত্য জেলার একজন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি মিথ্যা তথ্য পোস্ট করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষদের হুমকি দিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান’। নোয়াখালীতে মারা যাওয়া এক ব্যক্তিকে পায়ের রগ কেটে পুকুরে ফেলে দিয়েছেন বলে অপপ্রচার করা হয় তাদের ফেইসবুক পেজে। এ ছাড়া অনেক আগের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনায় পঞ্চগড়ে ও গাইবান্ধায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘর পুড়ে যাওয়াকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে অপপ্রচার করেন তিনি। ‘চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে গভীর রাতে কয়েকটি পরিবারে অগ্নিসংযোগ ও গুপ্টি গ্রামে বসবাসরত বীরেশ্বর কর্মকারের বাড়িতে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে আগুন দেওয়া হয়েছে মনে হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ দেশে জন্মই যেন অভিশাপ’ এ ধরনের বক্তব্য লিখেও প্রচার করেন তিনি।

র‌্যাব কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মোমেন বলেন, এসব গুজব ও অপপ্রচার ছাড়াও অভিযুক্ত আশিক গত কয়েক দিনে চলমান অপ্রীতিকর ঘটনায় চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছেও বলেও গুজব ছড়িয়ে দেন। এ ধরনের অপপ্রচার অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে বলে র‌্যাব মনে করে। সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উসকানিমূলক ও ভুল তথ্য প্রদানের পাশাপাশি রংপুরের ঘটনাকে ১৯৭১ সালের পুনরাবৃত্তি বলেও তুলনা করা হয় তার পরিচালিত ফেইসবুক পেজে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব কর্মকর্তা মোমেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে আশিক নিজে থেকেই ফেইসবুক পেজ খুলেছেন। তবে কারও প্ররোচনায় অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন কি না, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তার সহযোগীদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।