বরগুনার বেতাগী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কলেজে সরকারি বরাদ্দের বিভিন্ন খাত থেকে এবং নানান অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া বাড়তি অর্থসহ তিনি প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন ২০১৬ সালের ১১ জুলাই বেতাগী সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর চলতি বছরের ১১ আগস্ট বদলি হয়ে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি (নুরুল আমিন) বদলি হওয়ার পর বেতাগী সরকারি কলেজে নতুন অধ্যক্ষ আসার পরই এসব অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বেতাগী উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে পাওয়া তথ্যমতে, গত ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের জুন মাস পর্যন্ত বেতাগী সরকারি কলেজে বইপত্র ও সাময়িকী কেনা বাবদ ২ লাখ ৪০ হাজার, টেলিফোন বিল বাবদ ৩৫ হাজার, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স ও টেলেক্স বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার, কম্পিউটার কেনা বাবদ ১ লাখ ৫৩ হাজার, কম্পিউটার মেরামত বাবদ ১ লাখ, ক্রীড়াসামগ্রী কেনা বাবদ ২ লাখ ১৫ হাজার, ডাক বাবদ ১৯ হাজার, ভ্রমণ ব্যয় বাবদ ৩ লাখ, গবেষণা সরঞ্জাম কেনা বাবদ ১০ লাখ ৫০ হাজার, শিক্ষা ও শিখন উপকরণ কেনা বাবদ ২ লাখ ৩০ হাজার, অনুষ্ঠান ও উৎসব বাবদ ৯০ হাজার, রাসায়নিকদ্রব্য কেনা বাবদ ৭ লাখ ৫০ হাজার এবং ব্যবহার্যসামগ্রী বাবদ ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়াও ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ১ লাখ ২৫ হাজার ও পৌরকর বাবদ ১৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ভূমি উন্নয়ন ও পৌরকরের টাকা পরিশোধ করলেও সরেজমিন বাকি খাতের ব্যয়ের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
গত মঙ্গলবার বেতাগী সরকারি কলেজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সম্প্রতি একটি কক্ষে স্টোররুম করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের সরকারি বরাদ্দের একটি স্টক রেজিস্টার খোলা হয়েছে। কিন্তু স্টক রেজিস্টারে থাকা মালামালের কোনো অস্তিত্ব কলেজের স্টোররুমে পাওয়া যায়নি। নতুন অধ্যক্ষ আবদুল ওয়ালিদকে সঙ্গে নিয়ে স্টকরুমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সদ্য কেনা কিছু বই ও খাতাপত্র এবং দুটি ক্যারম বোর্ড এবং কার্টনের মধ্যে ছোটখাটো কিছু উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নেই। স্টক রেজিস্টারে উল্লিখিত মালামালের সিকিভাগও স্টোররুমে পাওয়া যায়নি।
কলেজের সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই রেজিস্টারটিও সদ্য তৈরি করা। অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর গত শনিবার একটি কক্ষে স্টোররুম ও নতুন খাতা কিনে স্টক রেজিস্টার বানানো হয়েছে। এছাড়া আগের তারিখে (ব্যাকডেটে) ক্রয় কমিটি গঠন দেখিয়ে ওই কমিটির সদস্যদের বাসায় বাসায় গিয়ে রেজিস্টারে তাদের সিল-স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আবার দুজন শিক্ষকের শুধু সিল আছে, স্বাক্ষর নেই। আর এসব কাজ করেছেন সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের লোক হিসেবে পরিচিত কলেজের হিসাব সহকারী দীপক কুমার গুহ।
মালামাল কেনার বিল ভাউচার দেখতে চাইলে হিসাব সহকারী দীপক কুমার গুহ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওসব এজিতে জমা আছে, আপনি সেখান থেকে দেখে নিয়েন।’ কলেজের হিসাব শাখার কপি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
কলেজে চার অর্থবছরে বইপত্র ও সাময়িকী কেনা বাবদ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে গ্রন্থাগারে এমন কোনো বইয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলেজের সহকারী গ্রন্থগারিক রওশন আরা মালতী বলেন, ‘গত চার অর্থবছরে কোনো বইপত্র কেনা হয়নি। এই বইপত্র ক্রয় বাবদ কোথাও আমার স্বাক্ষর নেই।’
বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা সরঞ্জাম কেনা বাবদ ১০ লাখ ৫০ হাজার এবং রাসায়নিকদ্রব্য কেনা বাবদ চার অর্থবছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিজ্ঞানাগারে ব্যবহারের ও পরীক্ষার জন্য কোনো রাসায়নিকদ্রব্যই কেনা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিজ্ঞানাগারের দায়িত্বে থাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক (সদ্য অবসর) রোহিতোষ চন্দ্র দের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গত চার অর্থবছরে বিজ্ঞানাগারের জন্য কোনো মালামাল ক্রয় করা হয়নি। বিজ্ঞানাগারে পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। আমি বিজ্ঞানাগারের মালামাল ক্রয়ের কোনো রেজিস্টারে স্বাক্ষরও করিনি।’
ক্রীড়া সরঞ্জাম কেনা বাবদ চার অর্থবছরে কলেজে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে কলেজে তেমন কোনো ক্রীড়াসামগ্রী পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শরীরচর্চা শিক্ষক মিজানুর রমহান মজনু বলেন, ‘গত চার বছরে কোনো ক্রীড়াসামগ্রী কেনা হয়নি, শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার জন্য ক্রীড়াসামগ্রী চাইলেও আমি দিতে পারিনি, বরং তাদের নিজ অর্থায়নে কিনে আনতে বলেছি। অধ্যক্ষ স্যারের কাছে বরাদ্দের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ক্রীড়া সংস্থা থেকে ক্রীড়াসামগ্রী এনে চালিয়ে নিতে বলতেন।’
ঠিক একইভাবে কম্পিউটার কেনা বাবদ ১ লাখ ৫৩ হাজার ও কম্পিউটার মেরামত বাবদ ১ লাখ, টেলিফোন বিল বাবদ ৩৫ হাজার, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স ও টেলেক্স বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কলেজে একটি মাত্র টেলিফোন থাকলেও তা চার বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। নতুন অধ্যক্ষ সেটি মেরামত করে সম্প্রতি চালু করেছেন।
কলেজের অফিস সহকারী মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চার বছরে কোনো কম্পিউটার ক্রয় বা মেরামত করা হয়নি। নিজের প্রয়োজনে একটি মোডেম কিনে নিজ খরচে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। ইন্টারনেটে মেইলে তথ্য আদান-প্রদানের কারণে ডাক, টেলেক্স বা ফ্যাক্স এসবের কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।’
এছাড়াও করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে বন্ধ থাকায় কলেজে অনুষ্ঠান, উৎসব পালন বা ভ্রমণের মতো কোনো কর্মকাণ্ড হয়নি। এসব খাতের বরাদ্দের পুরো অর্থই সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি বরাদ্দের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে চার বছরে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে। এ কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সেশন ফি, ভর্তি ও প্রবেশপত্রসহ অভ্যন্তরীণ এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালের ৯ জুলাই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে এনে তাকে অপসারণের দাবিতে বেতাগী কলেজের শিক্ষার্থীরা উপজেলা পরিষদের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
বেতাগী সরকারি কলেজের ভর্তি রেজিস্টারের তথ্যমতে ২০১৭-১৮ সেশন থেকে ২০২০-২১ সেশনে ২ হাজার ৮২১ জন শিক্ষার্থী শুধু উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়ন করেছেন। কলেজে অধ্যয়নরত বর্তমান ও সাবেক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নবায়ন অধিভুক্তি ফি বাবদ ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। এতে দুই বছরে মোট আদায় হয়েছে ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। তবে অফিস সহকারী মিজানুর রহমান জানান, চার বছরের এ বাবদ বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। বাকি টাকা কোথায় এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কলেজে সদ্য যোগদান করা অধ্যক্ষসহ কোনো শিক্ষক। এছাড়াও ভর্তি বাবদ বোর্ডের নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষার্থীপ্রতি মাত্র ১ হাজার টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও ৪৩টি খাত দেখিয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি আদায় করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। এর বাইরে ভর্তি ফরম বাবদ মাথাপিছু আদায় করা হয় আরও ১৫০ টাকা। সে হিসাবে চার বছরে মোট ৬৯ লাখ ১১ হাজার ৪৫০ টাকা আদায় করা হয়েছে। আর এ থেকে বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৮ লাখ ২১ হাজার টাকা। বাকি ৪৬ লাখের বেশি টাকা আদায় করা হয়েছে কলেজের বিভিন্ন উন্নয়ন ফান্ডের খাত দেখিয়ে। কিন্তু ওইসব খাতের অনুকূলে উন্নয়নে ব্যয়ের কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি কলেজ কর্র্তৃপক্ষ।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের সদ্য যোগদান করা অধ্যক্ষ আবদুল ওয়ালিদ বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। গত চার বছরের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে যদি কেউ সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করে থাকে সেটা অবশ্যই নিরীক্ষায় বের হয়ে আসবে। আমি চেষ্টা করছি কলেজ সঠিক নিয়মে পরিচালনার জন্য।’
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বেতাগী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘ক্রয় কমিটির মাধ্যমে আমি বরাদ্দের অর্থ খরচ করেছি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা হয়নি। তবে এত বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে একটু এদিক-সেদিক করতেই হয়।’
এ বিষয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডর কলেজ শাখার পরিদর্শক ড. লিয়াকত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে যদি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তবে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’