কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, তাদের উপাসনালয়, বাসগৃহে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। মহানগর পর্যায়ে সিএমএম (মুখ্য মহানগর হাকিম) ও জেলাপর্যায়ে সিজেএমকে (মুখ্য বিচারিক হাকিম) ঘটনার তদন্ত করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়। রুলে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, বাসগৃহ, তাদের জীবন ও সম্পত্তির ওপর হামলা ঠেকাতে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বিবাদীদের (রিট মামলার সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিচারিক তদন্তের নির্দেশ সাম্প্রদায়িক হামলার এসব ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে গত ২১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অনুপ কুমার সাহা ও মিন্টু কুমার মণ্ডলের পক্ষে এ আবেদনটি করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। আবেদনে বিচারিক তদন্তের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশনার পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ধর্মকে কটূক্তি ও অবমাননা করে এমন সব পোস্ট ও ভিডিও অপসারণের নির্দেশনা চাওয়া হয়। এতে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলি যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) চেয়ারম্যান, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারসহ (এসপি) ২১ জনকে বিবাদী করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল বিষয়টি শুনানির পর্যায়ে আসে। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়–য়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী।
শুনানির বরাতে জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, ‘২০০১ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই ২০ বছরে হিন্দু সম্প্রদায় কিংবা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর কোনো ঘটনারই আসলে এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। বরং কোনো কোনো ঘটনায় মৃত ব্যক্তিকে কিংবা কারাগারে থাকা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করে গ্রেপ্তার-বাণিজ্য করে এ ধরনের ঘটনা থামানো যাচ্ছে না। সত্যিকার অর্থে ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত থাকেন তাদের বিচার হয়ে শাস্তির বিষয়টিও নিশ্চিত হয় না। ফলে বারবার একই রকম ঘটনা ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইন অনুযায়ী যখন একটি ধর্তব্য অপরাধের তথ্য পাওয়া যায় তখন সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ তথ্য পেলে তাদের দায়িত্ব রয়েছে যে আক্রমণের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়া। নাগরিক হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি ফৌজদারি অপরাধের শিকার হন তাহলে তার বিচার পাওয়া এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এসব বিষয় আদালতে তুলে ধরেছি। আদালত ঘটনার বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়ে রুল দিয়েছে।’
উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে ওই জেলার বেশ কিছু পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনার জেরে চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুরসহ বেশ কিছু জেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপ, মন্দির ও হিন্দুদের বাসাবাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে গত ১৭ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে রংপুরের পীরগঞ্জের ১৩ নম্বর রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া-বটতলা ও বড়করিমপুর গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে লুটপাট করে দুর্বৃত্তরা।