ইউপি নির্বাচনে হানাহানি বাড়ার আশঙ্কা পুলিশের

আসন্ন দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। খুন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই শাসক দলের নেতা ও কর্মী। সংঘর্ষের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আরও কঠোর হতে দিকনির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকালও পুলিশের সবকটি রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবর তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও আছেন আতঙ্কে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার নরসিংদীর রায়পুরায় ইউপি নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন।  জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউপি নির্বাচন নিয়ে যাতে কেউ ফায়দা লুটতে না পারে সেজন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যারা অপকর্ম করার চেষ্টা করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দর হয় সেজন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আশা করি বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ থাকে নির্বাচন কমিশনের হাতে। তারপরও খুনোখুনি ও সংঘর্ষের ঘটনা যেন না ঘটে এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। থানা ও জেলার সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ডেকে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত তা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করছেন জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা। তারপরও আরও খুনোখুনির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রার্থী ও সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপের নির্বাচন শেষে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১১ ও ২৮ নভেম্বর। এরই মধ্যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এ দুই ধাপের মনোনীতদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৮ ও তৃতীয় ধাপে ১০০৭টি ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাছাড়া ২৮ নভেম্বর দেশের ১০টি পৌরসভায়ও নির্বাচন হবে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই খুনোখুনি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কয়েক জেলায় বড় ধরনের সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও প্রাণহানি ঘটেছে। সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে গত ২৬ অক্টোবর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সভায় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় মাঠপুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ের পুলিশ ইউপি ও পৌর নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত এলাকাগুলোয় টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে। এরপরও প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় হামলা, সংঘর্ষ ও খুনোখুনির মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও মাঠপুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা অব্যাহত করছেন। গতকালও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ডিআইজি ও এসপিদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।

ইউপি নির্বাচনে নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও খুনোখুনির আশঙ্কা বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন ও প্ল্যানিং) হায়দার আলী খান বলেন, ‘স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রতিটি ইউনিয়নে নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়। মাঠপুলিশকে সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও টহল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য চেয়ে একটি চাহিদা দেওয়া হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা সে অনুযায়ী সরবরাহ করে। এর বাইরে পুলিশ একটি নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে কাজ করছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও ঝুঁকির বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন থাকলে সেগুলো আমলে নিয়ে মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদে সহিংসতার বিষয়টি নির্ভর করে মূলত প্রার্থীদের আচরণের ওপর। খুনোখুনি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারসহ সামগ্রিক বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি। পুলিশ ছাড়াও বিজিবি, আনসার সদস্যরাও নির্বাচনী নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। তারা নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা রোধে কাজ করছেন।’

নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে সতর্ক থাকা ও স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও এসপিদের বলেছি যাতে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটতে না পারে। পাশাপাশি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আমরা বিশেষ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। নির্বাচন কমিশনার, কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সফর করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।’ পাশাপাশি তফসিল ঘোষিত এলাকাগুলোয় পুলিশি টহল ও তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। ইসি ও পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে সতর্কবার্তা এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সতর্ক থাকার পরও নির্বাচনে খুনোখুনি ও সহিংসতা থামছে না।

গত ১৭ অক্টোবর কাপ্তাইয়ে সদর ইউনিয়নের প্রতিবেশী চিৎমরম ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নেথোয়াই মারমাকে নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। ওই ঘটনার পর এই ইউনিয়নের নির্বাচন পিছিয়ে ২৮ নভেম্বর নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। কাপ্তাইয়ের বাকি তিন ইউনিয়নের নির্বাচন আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নে নির্বাচনী সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। প্রথম ধাপের নির্বাচনে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সহিংসতায় নিহত হন দুজন আর বরিশালের গৌরনদীতে নিহত হন দুজন। সর্বশেষ গতকাল নরসিংদীর রায়পুরায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে কাচারিকান্দি এলাকার মলফত আলীর ছেলে সাদিব মিয়া এবং আসাদ মিয়ার ছেলে হিরন মিয়া খুন হন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও আটজন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছিল ১১৭ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, যে এলাকায় ইউপি নির্বাচন হবে সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার, হামলা-পাল্টা হামলা, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ সন্ত্রাসকা- ও কেন্দ্র দখলের মতো অপরাধ ঘটতে পারে। এ আশঙ্কায় সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় আইজিপি মাঠপুলিশকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউপি নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারসহ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে। তাই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।