প্রথমেই ঢাকার সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীকে টিকা

দেশের ১২-১৭ বছর বয়সী স্কুল ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টিকা পাবে। প্রথমে টিকা দেওয়া হবে রাজধানীর শিক্ষার্থীদের। এজন্য ঢাকায় ১২টি স্কুলে ৩৯২টি বুথ করা হচ্ছে। পরে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ২১টি জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে, সেখানেই কেন্দ্র করা হবে। এসব শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে ফাইজারের টিকা।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে এ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামীকাল শনিবার থেকেই এ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করতে গতকাল রাতেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, পহেলা নভেম্বর থেকে ঢাকার ১২টি কেন্দ্রে এবং ঢাকার বাইরের ২১টি কেন্দ্রে এ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিকা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র বৃদ্ধি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী যেসব স্থানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সুবিধা নেই সেখানে দ্রুততার সঙ্গে শীতাতপ সুবিধা তৈরি করে ঢাকায় টিকা কেন্দ্র বৃদ্ধি করাসহ দেশের সব জেলাতেই ক্রমান্বয়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ১২-১৭ বছর বয়সী স্কুলগামী শিশুদের ফাইজারের টিকা দেওয়া হবে। ফাইজারের টিকা দেওয়ার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকতে হয়। এজন্য দেশের সব জেলাতেই ক্রমান্বয়ে প্রয়োজন মতো শীতাতপ ব্যবস্থা ঠিক করে দেশব্যাপী ১২-১৭ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার কাজ শুরু করা হবে। ফাইজারের টিকা এখন হাতে পর্যাপ্ত রয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে আরও ৩৫ লাখ ডোজ ফাইজারের ভ্যাকসিন দেশে আসবে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

দেশে বর্তমানে টিকার কোনো সংকট নেই উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, গত ২৭ অক্টোবর রাত দেড়টায় চীনের সিনোফার্মের আরও ৫৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন এসেছে। এ নিয়ে এখন আমাদের হাতে প্রায় ২ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন মজুদ রয়েছে। আগামীতেও এভাবেই টিকা আসতেই থাকবে বলে আশা করছি। কাজেই ডিসেম্বরের মধ্যেই টিকাদানের ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার ৫০ ভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে।

১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষদের জন্যও টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে এ সময় জানান মন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গতকাল ও আগামী দুদিন দেশের সাধারণ মানুষকে করোনার দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে প্রায় ৮০ লাখ ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি, স্কুলগামী শিশুদের জন্যও টিকাদান কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই চলমান থাকবে।

শিক্ষার্থীদের টিকাদানের ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারের করোনা টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা টিকাদান কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করছি। আশা করছি শিগগির শুরু করতে পারব।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৩০ অক্টোবর অথবা ১ নভেম্বর শুরু হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের প্রস্তুতি লাগবে। যেহেতু ফাইজার টিকা দেওয়া হবে, এ টিকা সংরক্ষণের জন্য এসিরুম লাগে। ওই ধরনের ১২টি স্কুল নির্দিষ্ট করেছি। এসব স্কুলে টিকা দেওয়া হবে। আপাতত ঢাকা মহানগরীতে দেওয়া হবে। তারপর পুরো দেশে দেওয়া হবে।

প্রথমে টিকা পাবে রাজধানীর শিক্ষার্থীরা : প্রাথমিকভাবে রাজধানীর সরকার নিবন্ধিত স্কুল ও কলেজের ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে, থানাভিত্তিক সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকাকেন্দ্র করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টিকা নিতে পারবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, ১২টি স্কুলে ৩৯২টি বুথ করা হয়েছে। প্রতিটি বুথে প্রতিদিন ২০০ জন শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে হিসাবে প্রথম দিন ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হতে পারে। এর আগে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর রাজধানীর সরকারি নিবন্ধিত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে তালিকা পাঠানো হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো তালিকা সুরক্ষা অ্যাপে আপলোড করে আইসিটি বিভাগ। টিকা নিতে হলে এসব শিক্ষার্থীকে সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধন করতে হবে।

এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক বিভাগ) বেলাল হোসেইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীতে সরকার অনুমোদিত স্কুল ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাড়ে পাঁচশোর মতো। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ থেকে পৌনে চার লাখের মতো। এদের সবার তালিকা আমরা আইসিটি বিভাগে পাঠিয়েছি। তারা নিবন্ধন করবে। ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিবন্ধন করতে পারবে। সুরক্ষা অ্যাপে এসব শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা বিভাগ থাকবে। সেখানে তারা নিবন্ধন করতে পারবে।’

টিকা দেওয়া হবে যেসব স্কুলে : রাজধানীর ১২টি স্কুলে কেন্দ্র করা হয়েছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা এলাকার হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং রামপুরার সাউথ পয়েন্ট স্কুল কেন্দ্রে বাড্ডা ও ডেমরা শিক্ষা থানাভুক্ত নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা, গুলশান-১-এর চিটাগং গ্রামার স্কুল কেন্দ্রে গুলশানের, সূত্রাপুরের কসমোপলিটন ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে কোতোয়ালি ও শ্যামপুরের, বিজিবির পিলখানা সদর দপ্তরে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ কেন্দ্রে লালবাগ ও ধানম-ি এলাকার, মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কমার্স কলেজ কেন্দ্রে মতিঝিল এলাকার, মিরপুরের ঢাকা কমার্স কলেজ কেন্দ্রে শাহআলী, পল্লবী ও মিরপুর এলাকার, ধানম-ি-১৫-তে অবস্থিত কাকলি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ধানম-ি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকার, উত্তরার ১১নং সেক্টরের সাউথ ব্রিজ স্কুল কেন্দ্রে উত্তরা এলাকার, মিরপুর ১৩ নম্বরের স্কলাস্টিকা স্কুল কেন্দ্রে কাফরুল ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার, উত্তরখান এলাকার তালতলা বাজারে অবস্থিত বিএইচ খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এবং নয়াবাজারের পিকে ঘোষ স্ট্রিটে অবস্থিত আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি কেন্দ্রে কোতোয়ালি থানা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা টিকা পাবে।

চলছে গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে এক মাস আগে যারা করোনার প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছিলেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন, জেলা, উপজেলা, পৌর ও সিটি করপোরেশন এলাকার নির্ধারিত কেন্দ্রে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ মানুষকে এর আওতায় আনা হবে। প্রথম ডোজের মতো এবারও দেওয়া হচ্ছে চীনের সিনোফার্মের টিকা। এ উপলক্ষে গতকালও কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভিড় দেখা গেছে। সাবই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা নিয়েছেন। কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে এ টিকা দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে অস্থায়ী কেন্দ্র করা হয়। এছাড়া অনেক কেন্দ্রে সকালে ভিড় থাকলেও বিকেলে ফাঁকা দেখা যায়।