স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সহিংসতা বেড়েই চলছে। বন্ধ হচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর অনাস্থা জানিয়ে তৃণমূলের এ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। তবুও অনেকটা প্রতিপক্ষহীন এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই জড়িয়ে পড়ছেন দ্বন্দ্বে। এবারের ইউপি নির্বাচন আয়োজন শুরুর পর থেকে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ গেছে কমপক্ষে ১৫ জনের। প্রচার শুরুর আগেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ঘটছে এসব ঘটনা। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনও (ইসি) সহিংসতার মাত্রা বাড়ায় উদ্বিগ্ন। তারাও নির্বাচনী সহিংসতা ও মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর পথ খুঁজছেন বলে একজন নির্বাচন কমিশনার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। আর নির্বাচনী সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে ‘ফায়দাভিত্তিক রাজনীতিকে’ দায়ী করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানির বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম (ইসি) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনারা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি আমরাও কিন্তু কম উদ্বিগ্ন না। আমরা অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। কী করা যায়, কীভাবে করা যায়। এক হচ্ছে নির্বাচন বন্ধ করা। কিন্তু এটা করা যাবে না। কারণ নির্বাচন করাই আমাদের দায়িত্ব। তফসিল ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।’
সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে জানিয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘তাদের (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) কড়া ইন্সট্রাকশন দেওয়া আছে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছি। অপ্রত্যাশিত, অনাকাক্সিক্ষত অনেক ঘটনাই ঘটে যাচ্ছে। এগুলো কীভাবে থামানো যায় সেই পথটা আমরা খুঁজছি, চেষ্টা করছি। জানি না আমরা কতটুকু সফল হব। মৃত্যুর সংখ্যা কমানো বা আদৌও যেন না হয়।’
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি’র ফলে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা কোটিপতি। তারা দলীয় পদ-পদবি পেয়ে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা পাবে, এজন্য তারা চেইনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সুযোগ-সুবিধা পাওয়া তো অন্যায় না, কিন্তু অন্যায় সুযোগ-সুাবিধা, অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, বেআইনি সুযোগ-সুবিধা অন্যায়। ক্ষমতাসীন দলের পদ এবং এসব নির্বাচিত পদ পাওয়ার জন্য তারা মরিয়া। যার ফলে এরকম অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা। নির্বাচনের পরে সোনার হরিণ হাতে পেতে তারা মরিয়া। সোনার হরিণ হাতে পেলেই অনেক রকম সুযোগ-সুবিধা, অন্যায় করে পার পাওয়া ইত্যাদি। মনোনয়ন বাণিজ্য করছে, পেশিশক্তি ব্যবহার করতেও দ্বিধা করে না। আর নির্বাচন কমিশন তো নির্বাসনে চলে গিয়েছে, তাদের তো বিচার হওয়া উচিত।’ নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগেরও দাবি জানিয়েছেন এই স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নরসিংদীর রায়পুরার কাচারিকান্দিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং নারীসহ অন্তত সাতজন আহত হয়। তার আগে ২৬ অক্টোবর মধ্যরাতে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও তিনজন। গত ২৪ অক্টোবর ফরিদপুরের সালথায় নির্বাচনী সহিংসতায় মারিজ সিকদার (৩৫) নামে একজন নিহত হন। একই দিনে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর এক সমর্থককে হত্যার ঘটনা ঘটে। গত ১৫ অক্টোবর মাগুরা সদর উপজেলার জগদল গ্রামে ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় একই পরিবারে আপন দুই ভাইসহ চারজন নিহত হয়। ওই ঘটনায় আহত হয় কমপক্ষে ২০ জন। এছাড়া প্রথম ধাপের স্থগিত ১৬০ ইউপির ভোটে নির্বাচনী সহিংসতায় গত ২০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুজন নিহত হয়। আর বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ যায় একজনের। এছাড়া প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোলার চরফ্যাশনের হাজারীগঞ্জে দুই ইউপির সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের মধ্যে গুলিতে একজন নিহত হয়েছে। এর বাইরে নির্বাচনী সহিংসতায় বরিশালে দুজন নিহত হয়েছে।
নির্বাচনী সহিংসতা প্রসঙ্গে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতা ভোটের আগে হচ্ছে, কিন্তু আমাদের তো মেইনলি (প্রধানত) কর্নসান (উদ্বেগ) কেন্দ্রভিত্তিক ভোটকেন্দ্রে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এটা দেখবে। লোকাল ল-এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) আছে। এসপি-ডিসিদের কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে।’
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ চেয়ারম্যান : গত ২০ জুন অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপে ২০৪ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ২৮ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৬০ ইউপির ভোটে ৪৫ জন বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া আগামী ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৬টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ হবে। দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৬ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত ৮১ জনের সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকার মনোনীত প্রার্থী।