পলাতক ই-কমার্স উদ্যোক্তারা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক লাইভে

প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দেশের বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। এর মধ্যে কোনো কোনো অভিযুক্ত উদ্যোক্তা দেশে নেই বলে জানা গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের খুঁজছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনের কাছে ধরা না দিলেও ফেইসবুক ও ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাডমিনদের কাছে ধরা দিচ্ছেন। তাদের নিয়ে লাইভ অনুষ্ঠান হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের পেজ ও চ্যানেলে। কখনো কখনো উদ্যোক্তারা গোপন কোনো স্থান থেকে ধারণকৃত বক্তব্যের ভিডিও ছেড়ে দিচ্ছেন, যা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বিভিন্ন পেজে শেয়ার করছেন পেজগুলোর অ্যাডমিন ও মডারেটররা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইভ অনুষ্ঠানে বা ধারণকৃত ভিডিওতে পলাতক আসামি বা অভিযুক্তদের উপস্থাপনের বিষয়ে আইনগত কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকলেও তাদের খুঁজে বের করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে অনুষ্ঠানের আয়োজকরা সহযোগিতা করতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে আয়োজকরা তাদের লোকেশন গোপন করলে তা বেআইনি হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

গত ২৫ অক্টোবর একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ই-কমার্স খাতের দুই পলাতক উদ্যোক্তাকে দেখা যায় ইউটিউব ও ফেইসবুকের একটি লাইভ অনুষ্ঠানে। এই দুই পলাতক উদ্যোক্তা হলেন ধামাকা শপিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জসিম উদ্দিন চিশতি ও আনন্দের বাজার লিমিটেডের এমডি আহমেদুল হক খন্দকার মিঠু। ফেইসবুকে ফেস দ্য পিপল নামে পেজ ও ইউটিউবে একই নামের চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন সাইফুর সাগর। পেজ ও চ্যানেলে যে যোগাযোগের নম্বর দেওয়া রয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের একটি নম্বর।

ওই লাইভ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের দুজন আইনজীবীও অংশ নেন। তারা হলেন ইভ্যালি ডটকম ডটবিডির পক্ষের আইনজীবী নিঝুম মজুমদার ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম।

অবশ্য অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সাইফুর সাগর ওই দুই উদ্যোক্তার পালিয়ে বেড়ানোর কারণ জানতে চান লাইভ অনুষ্ঠানে। আনন্দের বাজার লিমিটেডের এমডি মিঠু এই প্রশ্নের উত্তর দেননি। ধামাকা শপিংয়ের এমডি চিশতি বলেন, দেশের বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এমন অবস্থা করে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো কিছু করার আগেই আমাদের চোর বলে সাবস্ত করা হচ্ছে। চরিত্র হনন করা হচ্ছে। এটাকে একটি ‘জাজমেন্টাল’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ধামাকা শপিং ও আন্দন্দের বাজারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ রয়েছে।

অর্থ আত্মসাতের মামলায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ধামাকা শপিং লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সিরাজুল ইসলাম রানা, সিস্টেম ক্যাটাগারি হেড ইমতিয়াজ হাসান সবুজ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম স্বপন ওরফে মিথুন খানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

ওই লাইভ অনুষ্ঠানে ধামাকা শপিংয়ের এমডি চিশতি জানান, ৩০ বছর যাবৎ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। তিনি চিকিৎসা করাতে গত এপ্রিলে দেশ ছাড়েন বলে জানান।

এই প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের ৮০৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানা যায়। তবে চিশতি ওই লাইভ অনুষ্ঠানে এই পরিমাণ দেনার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তাদের দেনা ২৬ কোটি টাকা। তারা এটা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

আনন্দের বাজার লিমিটেডের এমডিকেও খুঁজছে পুলিশ। অনলাইন এই মার্কেটপ্লেসের গ্রাহক ও মার্চেন্টদের দাবি, প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার মতো পাওনা রয়েছে আনন্দের বাজারের কাছে। ৫ অক্টোবর এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন মিঠু। গুশলানের জব্বার টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির অফিস ছিল। একরাতেই অফিসের সব সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই দিনই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের মামলা হয়।

এবারের ওই লাইভ অনুষ্ঠানের আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই পেজটির আরেকটি লাইভ অনুষ্ঠানে দেখা যায় আনন্দের বাজারের এমডি আহমেদুল হক খন্দকার মিঠুকে। এর আগে তার ধারণকৃত ভিডিও বার্তাও কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে ইভ্যালির সমর্থকদের বিভিন্ন পেজে।

প্রসঙ্গত, দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রির নামে গ্রাহকের টাকা আগাম নিয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করায় এ খাতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও এর উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলায় ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন, এমডি মো. রাসেল, কিউকমের উদ্যোক্তা রিপন মিয়া, ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, এসপিসি ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আল আমীন ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শারমীন আক্তার, রিং আইডির পরিচালক সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে মামলা হওয়ার পরও গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন চিশতি, মিঠুসহ আরও বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা। এ ধরনের পলাতক উদ্যোক্তাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুষ্ঠান করার বিষয়ে ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা যেহেতু পলাতক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যারা এই অনুষ্ঠান করেছে, তারা যদি এদের লোকেশন জানে তাহলে তা গোপন করলে বেআইনি হবে।’