অবৈধ ক্ষুদ্রাস্ত্রের ছড়াছড়ি ইউপি নির্বাচনে

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের শঙ্কা বেড়েছে। বেড়েছে সহিংসতার আশঙ্কাও। এমন পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী মাঠে পেশি শক্তির মহড়া ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়িয়েছে নজরদারি। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউপি নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি সরবরাহের সিন্ডিকেট আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহও বেড়েছে। এক জায়গার অস্ত্র আরেক জায়গায় যাচ্ছে। একজনের অস্ত্র আরেকজন ভাড়া নিচ্ছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের জন্য দেশীয় অনেক কারবারি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

অবৈধ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার ও প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা র‌্যাব-পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সিলেট, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি দিয়ে সবচেয়ে বেশি অ্যামুনেশন (গুলি) নিয়ে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র কারবারিরা। এসব চক্রের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ ডিলাররা বেশি জড়িত। এই ডিলারদের কাছ থেকেই বৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারী অনেকে অবৈধ গুলি কিনে থাকেন। সেসব গুলি ব্যবহারের কোনো হিসাব থাকে না।

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের  ভাষ্য, বৈধ-অবৈধএই দুই শ্রেণির আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীদের অবৈধ গুলি সংগ্রহে বেশি আগ্রহের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বৈধ অস্ত্রধারীদের প্রত্যেকটি গুলির হিসাব দিতে হয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। এ কারণে অনেক বৈধ অস্ত্রধারী, তাদের গুলির ব্যবহার গোপন করতে অবৈধ উপায়ে গুলি সংগ্রহ করে থাকেন। আবার কখনো কখনো বৈধ লাইসেন্সধারী অস্ত্র ভাড়া দিয়ে থাকেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আহমেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ অস্ত্র ও গুলির কারবারিদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব অবৈধ কারবারির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র তৈরির বেশ কয়েকটি কারখানার তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। এসব কারখানায় তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র নানা হাত ঘুরে দেশের বিভিন্ন জায়গার অপরাধীদের কাছে চলে যায়। এছাড়া কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এলাকা দিয়ে মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির চালান নিয়ে আসে অবৈধ কারবারিরা। সেসব চালানের অধিকাংশই বৈধ ডিলারদের হাতে আসে। পরবর্তীকালে তাদের মাধ্যমেই বৈধ কিংবা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীদের কাছে চলে যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব কারবারির অপতৎপরতা কিছুটা বেড়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় কোনো ইউপি নির্বাচন হচ্ছে না। তারপরও এখানকার কোনো অবৈধ অস্ত্রের কারবারি যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, এক জায়গার অস্ত্র আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে না পারেসে বিষয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলছে। কোথাও অস্ত্র মজুদ কিংবা পরিবহনের নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েকটি জায়গায় গোলাগুলির ঘটনায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে প্যাট্রলিং জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা কার্যক্রম। বাইরে থেকে কোনো চক্র যাতে অবৈধ অস্ত্রের চালান নিয়ে না আসতে পারে সে বিষয়ে সতর্কতার অংশ হিসেবে অবৈধ অস্ত্রকারবারিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

গত ২৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নরসিংদীর রায়পুরাতে বিবদমান দুই পক্ষের লোকজন টেঁটা-বল্লম নিয়ে সংঘর্ষের পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করে। এতে দুজন নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকে র‌্যাব-পুলিশের একাধিক টিম অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে মাঠে নেমেছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নরসংদী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আশরাফুল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো বিরোধ ছিল না। আগে থেকেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। যারা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশীয় একটি অবৈধ অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। এই অস্ত্র ও গুলির সরবরাহকারী কারা তাদের বিষয়েও তদন্ত হচ্ছে।

এর আগে ১৫ অক্টোবর মাগুরা সদরের জগদল গ্রামে দুই মেম্বর প্রার্থী নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ আলী হাসান গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে সৈয়দ আলী হাসান গ্রুপের আপন দুই সহোদরসহ চারজন নিহত হয়। আহত হয় উভয় পক্ষের কমপক্ষে ২০ জন। এছাড়া সিলেট, বগুড়া, ফরিদপুর ও ঢাকার ধামরাইয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব জায়গায়ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ১১ নভেম্বর দেশের ৬৩ জেলায় ৮৪৬ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পক্ষ-বিপক্ষ দলের লোকজন আধিপত্য বিস্তার ও নিজ নিজ পক্ষের শক্তির শোডাউন দিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে গত বুধবার ঢাকার ধামরাইয়ে ইউপি নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে কয়েকটি ইউনিয়নে সংঘর্ষ হয়। নির্বাচনী প্রচারণাকালে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এই সংঘর্ষ চলাকালে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে উঠেছে। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন প্রার্থী আজহার আলীর একজন সমর্থক।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক পুলিশ সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন।