ঋণং কৃত্বা গাড়ি সেবা নগদায়ন-৪

কর্মকর্তাদের গাড়ি সেবার ‘ফি-মাসি ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়নযুক্ত মোটরগাড়ি-ঋণ কারবারের উদ্যোক্তা প্রাইভেট ব্যাংক (উদ্যোক্তা তো উঠে আসে প্রাইভেট থেকেই!) শুরুই করে সব মেওয়া একবারেই মাখিয়ে। সুদের গোদ নামেই শুধু (বিনা সুদে কারবার নাই কিনা ব্যাংকে), ব্যথা নাই মোটে! শোধের দায় নেই সুদ কিংবা আসলের, ৬০ কিস্তির সবটাই অগ্রিম দাতা ব্যাংকই চালাবে। অবচয়ে গাড়ির মূল্য পুরো ক্ষয় ৫ বছরে! বিনামূল্যে নিলে হয় বেদামি, তাই পুরো ১টি (ডানে-বামে শূন্য নাই একটিও) টাকা দাম দিয়ে নিয়ে দামি গাড়িটা বিক্রি করেন বাজারমূল্যে। পরের বছর একই চক্রে আবার একখানা গাড়ির নতুন অগ্রিম। এটা নাকি চাকরিরই বেনিফিট প্রাইভেট ব্যাংকারের (কারবারই বেনিফিট লেনদেনের)। আর কিছু কি আছে মাখাতে! বেসরকারির পদচিহ্ন ধরে সরকারি ব্যাংকাররা শুরু করলেও মেওয়া লাগাতে পারেননি নিজেদের গাড়ি-ঋণে। পেলা দিয়ে শুধু ঋণ আর ‘ফি-মাসি ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়নের টাকার আঁকশিটা আছেন বাজারদরের গোড়ায় ঠেকিয়ে। প্রকল্প-প্রেষণের মামাবাড়ি নাই ব্যাংকারের। ঋণে অবচয় জেনেশুনেও নিতে পারেননি বোর্ডে থাকা সরকারি খাসের বাগড়াতে। সুদটা মুক্ত, আসলটা পুরোই শুধতে হবে কিন্তু ‘ফি-মাসি ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়ন থেকে। পদভেদে নাকি ঋণ আর মাসিকে একটু বৈষম্যও আছে। ‘নাল্পে সুখমাস্তি’, সুখ নেই স্বল্পে!     

১০ শতাংশ হারে আট বছরের অবচয়, ফি-মাসে ৫০ হাজারি ফ্রি-বাচ্চা’ (প্রকল্প-প্রেষণে, মাঠে-ঘাটে থাকলে ২৫ হাজার) মেওয়া মাখানো সুদমুক্ত গাড়ি-ঋণের সরকারি মোহন ভোগ ২০১৭-তে নেমে আসে খাস সরকারি উপ-সচিবেরও সমুখে। ইকোনমিক ক্যাডার শুরু থেকেই ভোগে থাকলেও যুগ্ম-প্রধানের নিচে আর নামাতে পারেনি ২০১৯-এ প্রশাসন ক্যাডারভুক্ত হয়েও। ইকোনমিকের গন্ধটাই কি বাদ সাধল তাকতে! আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং বিভাগ ভাগ বসিয়েছে ২০১৪-তে পরিবহন অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে ঢোকে। বেলটা ভেদ করল কোন তাকতে জানতে পারেনি একই ছাদের তলায় থাকা আইন ও বিচার বিভাগ। আইনের বিচার ছাড়া জোর নেই কিছুতে! তবে কি না যুগ্ম-সচিবের নিচে নামাতে পারেনি ড্রাফটিং-ও। এটুকুই ঢের নন-ক্যাডার তাকতে! সশস্ত্র বাহিনী পেয়েছে (মেজরের নিচে নামেনি) ২০১৯-এ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিজাত প্রজ্ঞাপনে। সরকারি রেসিপিটা দিয়ে নিজেদের নথিতে অবিকল স্বাদের মোহন ভোগ বানিয়েছে সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ডেসকো (ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি) ২০১৩-তে, কিছু আগে পরে ডিপিডিসি (ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি), আর ২০২১-এ ওজোপাডিকো (ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি)। পাওয়ার বরাত মিলবে পাওয়ারে! গ্রাস করার সক্ষমতা ছাড়া পাওয়ার নয় অভাব দেখিয়ে অক্ষমের! তবেই হয়েছে আর গাড়ি সেবা নগদায়নযুক্ত ঋণ পাওয়া সেবা প্রদানকারী ২৫ ক্যাডার আর ক্যাডারচ্যুত জুডিশিয়াল সার্ভিসের কমজোরি পাওয়ারে!   

নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত গাড়ি-ঋণ পাওয়া একজনে বললেন, ডিজিটাল যুগের দুর্দান্ত অফার! সুদমুক্ত ৩০ লাখে গাড়ি দেখালেই বছরে ১০ শতাংশ ধরে ৮ বছরি অবচয়ে (ডেপ্রিসিয়েশন) আপসেআপ শোধবোধ ১৭ লাখ তক্ষুনি, শুধু ১৩ লাখ শুধবেন ১০ বছরে ১২০ মাসে। ঘরের থেকে ভর্তুকি দিয়ে নয়, কিস্তি চালাবেন গাড়িটাতেই চড়ে ঋণটার ‘ফি-মাসি ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়নের ফুর্তি দিয়ে। মাসে ৫০ হাজারি নগদায়ন থেকে গাড়িচড়ন খরচা বড়জোর ২৫ হাজার, কিস্তি ১২ হাজার, সার্ভিস চার্জ চোদ্দোশ (১ শতাংশ হারে কাটা ধরেছে ২০১৯-এ) বাদে হাতে থাকে ১১ হাজার ছয়শ। ১২০ মাসে কিস্তি মাত করে ‘নিট-বেনিফিট’ ১৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা নগদে, আর যতেœ পোষা গাড়িটা এক্কেবারে ‘ফ্রি-তে’। সরকারি খাতাতে ১৩ লাখে নামালেও ১০টা বছরে বাজার কি আর বসে থাকবে পুরাতনটাই ৩০ লাখে উঠতে! আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! লাভের হিসাব ধরছে না আর খাতাতে!

এত ভোগেও প্রকল্প-প্রেষণে থাকা এক খাসনবিশের খেদ, দুদক নাকি তার অনেক ‘লস’ করে দিয়েছে! কেন? না, প্রকল্পেরই গাড়ি চড়ে মাসে ৫০ হাজারই নগদায়ন চলছিল দিব্যি। সেটা ২৫ হাজারে নেমেছে নাকি দুদকের চিঠিতে (এই এক মুশকিল দুদকের, দুর্নীতি দেখে সবকিছুতে)! খোঁজ করে দেখি, কে অথবা কারা নাকি অভিযোগ দেয় দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটে, দুদক সেটা ২০২০-এর ২২ সেপ্টেম্বর লাগিয়েছে জনপ্রশাসনকে। জনপ্রশাসনের গাড়ি সেবা শাখা আবার ২০২০-এর ২৮ অক্টোবর লাগিয়েছে সবখানে যে, নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত গাড়ি-ঋণ নেওয়া কিছু সরকারি কর্মকর্তা নীতিমালা ভেঙে মন্ত্রণালয়/বিভাগের অধীনস্থ দপ্তর/অধিদপ্তর/সংস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি এমনকি টিওএন্ডইভুক্ত (সাংগঠনিক কাঠামো এবং যানবাহন ও সরঞ্জামাদির তালিকাভুক্ত) মাইক্রোবাস নিজের অফিস যাতায়াতসহ পারিবারিক কাজেও ব্যবহার করেন, আবার অনেকে সরকারি গাড়ি ব্যবহার সুবিধা থাকার পরেও পুরো ৫০ হাজারই নগদায়ন করেন। হুঁশিয়ারি হাঁকিয়েছে, ‘শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা’-য় অসদাচরণ এসব, বরদাস্ত করা হবে না এরপরে।

হায়! যারা পায় তাদেরই দুঃখের অন্ত নাই, নিজের দুঃখ বলি কারে! সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ির প্রাধিকারপ্রাপ্ত তালিকায় ঠাঁই হলো ২০১২-তে জেলা জজের পদে গিয়ে। বরাতে জুটল ১২ বছর আগের ‘এসি-কাটা’ মোটরগাড়ি, বিনিময়ে মাসে মাসে নতুন হারে বেতন কাটা। গৃহনির্মাণ না হওয়া সেই ঋণের কিস্তি টেনে ১২০ নম্বরে কিস্তি মাত করে ২০১৩-তে দেখি খেলা শুরু নতুন করে! টানা ১০ বছরে বার্ষিক ১০ টাকার সরল সুদটা সোজা এসে ঠেকেছে আসলের কাছে এক্কেবারে ১ লাখ ২০ হাজারে (কিস্তি কম নেওয়ার দম ছিল না রোজগারে)। এখন বাঁকাই কী করে! হিসাবরক্ষণ অফিস বলে, রক্ষা নাই হিসাব থেকে। ১ লাখ ২০ হাজারই সুদ শুধতে হবে, হোক সেটা একশ বিশ বারে কিংবা একবারে। সরলেরই এই চক্র! চক্রবৃদ্ধির চক্করে পড়লে কী ছিল কপালে! গাধাও কিছু বুদ্ধি ধরে, কাজ কি তবে কিস্তি কমিয়ে! ১২০ কিস্তিই সই, খেলা শুরু আবার ১০ বছরের। ৬ বছরেই চাকরি নামল অবসরে, সরকারি গাড়িটা রেখে আমি নামলাম ‘মুন্সেফি শ্রীচরণ ভরসা’-তে, ঘাড়ের ওপর ‘শাকের আঁটি’ বাকি ৪ বছরের কিস্তি। শেষে আমাকে চাণক্য পণ্ডিত প্রণীত চার শত্রুর (এক শত্রু ঋণকর্তা পিতা) তালিকাবদ্ধ থেকে মুক্ত করল হিসাবরক্ষণ অফিস, ৪ বছরের সব কিস্তি খচ করে অবসরের গ্র্যাচুইটি থেকে একবারে কেটে নিয়ে। অঙ্ক কষে বের করুন বিচারকের কত মূল্য এখানে! বিচারক নাকি বিচারকর্মী আমি, স্ট্যাটাসটা কোন পর্যায়ের! শুনেছিলাম বিচারকদের নাকি স্ট্যাটাসের একখানা মামলা ছিল, সেটাতেই সাম্য, ভারসাম্য সব হবে! নিষ্পত্তির পরে সেটা আটকে আছে বিপত্তিতে, ছুটবে কোন জনমে! মক্কেলকে সারাক্ষণ ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’-র মন্ত্রণা দিয়ে নিজেরা মামলা ঠুকতে গেছেন কোন আক্কেলে! 

মনে ধরলেই ব্যাংক কোম্পানি, বিদ্যুৎ কোম্পানি নিজেরাই পারে টাকা বের করার নতুন খাত বানাতে। সরকারি এ কাজে নাকি সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ লাগে, আইন লাগে, নিদেনপক্ষে এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) একটা লাগেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের। সবই দেখি মিছে! সক্ষমতা থাকলে সংস্থাপন (হালে জনপ্রশাসন) মন্ত্রণালয়ের এক পরিবহন অধিশাখার (হালে গাড়ি সেবা শাখা) নথিজাত অফিস আদেশের প্রজ্ঞাপনেই ‘ফি-মাসে ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত গাড়ি-ঋণ জোটে! লেখাও লাগে না কোন আইনের হাতে কী বিধি দিয়ে নীতিমালাটা গড়লেন! পাশে পড়ে চেয়ে থাকে জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস, ২৫৮ বিধির সরল আর চক্রবৃদ্ধি সুদে মোটরগাড়ির ৬০ হাজার টাকার অগ্রিম ধরে, যদি কোনো দিন বে-আক্কেল জেনারেলের (সাধারণ) কেউ চায়! সংবিধান, আইন আঁখি মুদে মগ্ন সাম্যের গানে!      মোটরগাড়ির এই মোহন ভোগ নীতিমালা গড়নদাররা যুক্তি দেন মুখে (লেখা যায়নি নীতিমালাতে), কর্মকর্তাদের গাড়ি চড়া সেবা দিতে ড্রাইভারের তেল-পানিতে সরকারি অর্থের অপচয় চলছিল, অর্থের সাশ্রয়ে তাই এ-নীতিমালা। কয়টা গাড়ি-ঋণে পুলের গাড়ি কয়টা কমবে, কজন ড্রাইভারের চাকরি যাবে লেখেননি তো সেটাতে! কয়টা গাড়ি-চাকরি কমেছে! বছরে এখন সাশ্রয় কত? হিসাব তো দেখি না কোনোখানে! দুদকের চিঠির বরাতে লেখা চিঠিতে তো দেখছি অপচয়ের খাতগুলো দিব্যি আছেই, আবার কায়দা বেড়েছে। ঋণ না পাওয়া অভাগা প্রাধিকারপ্রাপ্তদের গাড়ির তেল-পানির সরকারি অপচয়টা গুনলেনই না সাশ্রয়ের হিসাবে। উপসচিবকে নতুন করে প্রাধিকারপ্রাপ্ত বানালেন যেন কীসের সাশ্রয়ে! সাশ্রয় নাকি ‘সুখং’ লাভের আশ্রয় আসলে! ‘কেউ সুখী হয় কেউ হয় না’, সে-গান তো সবাই জানে। লুকানোর কি আছে! জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলসে ঢোকালে সবাই পেয়ে যায়, তাতে টান পড়ে সরকারি সক্ষমতায়। সরকারি অর্থ বাঁচিয়ে দিয়েছে খাস সরকারিরা নিজেদের নথিজাত আদেশের প্রজ্ঞাপনে সবাইকে বঞ্চিত করে কেবল নিজেরা নিয়ে। সাশ্রয়টা এইখানে! নিজের বেলায় মোহন ভোগ, অন্যের বেলায় দুর্ভেদ্য বেল!

সত্যিকারের গৃহনির্মাণের সরকারি ঋণের নীতিমালাও একটা হলো অবশেষে। জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস পাশ কাটিয়েই, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথিজাত আদেশে। এবারে আর কর্মকর্তা নয়, নেমেছে একেবারে কর্মচারীতে। ঋণ ২০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা। ফি-মাসি নগদায়ন সুবিধা নাই মোটে। সুদমুক্ত নয়, ব্যথা (রেট) কম হলেও গোদ একটু আছেই। ৯ শতাংশের (শুরুতে ছিল ১০) ৪ শতাংশ (শুরুতে ছিল ৫) কর্মচারী নিজে, বাকিটা সরকারে ভর্তুকি দেবে। মন্দ নয়। ২০১৮-তে চালু হলে প্রশ্ন ওঠে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা পাবে কি না। আমারটা পরিষ্কার একেবারে, বয়সের সর্বোচ্চ সীমা ৫৬ অতিক্রান্ত! ২০১৯-এ নীতিমালায় জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদেরও ঢোকানো হলো (সরকারি কর্মচারী বলে), বয়সের সর্বোচ্চ সীমাও ওঠানো হলো ৫৮-তে, তখন আমি ৫৯ অতিক্রমের শেষ প্রান্তে! কাকদশা আমার ঘুচল না এবারেও! আর কি রাখি কালো গাউন গায়ে! সরকারি অন্যান্য সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদেরও রাখা আছে এই নীতিমালার বাইরে। আলাদা করে আর কারও নীতিমালা বানানো হয়েছে কি না খবর করুন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। আমার ‘সুখং’ হয়ে গেছে! আর নয় ‘ঋণং কৃত্বা’।  (সমাপ্ত)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com