ফোর নাইন্টিন এ

না, এটা কোনো আইনের ধারা নয়, আমার এক সহপাঠীর রোল নম্বর বটে। মাধ্যমিক পাস করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছি কলেজে। প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস। শুরুতেই যথারীতি (সেকালের) রোল কল। আমাদের সেকশনের রোল নম্বর শুরু হয়েছিল ৪০১ থেকে। ‘ফোর জিরো ওয়ান’ বলে শুরু করে স্যার ‘ফোর নাইন্টিন’ পর্যন্ত ডাকার পর ডাকলেন ‘ফোর নাইন্টিন এ’ বলে। তারপর ঠিকমতোই ডেকে গেলেন ‘ফোর টোয়েন্টি ওয়ান’ থেকে। আরে, ‘ফোর টোয়েন্টি’ কোথায় গেল! পাশ থেকে এক ডেঁপো (কাঁচা আমি বরাবরই) সহপাঠী ফিসফিস করে বলল, “চাপা দিয়েছে ‘ফোর নাইন্টিন এ’ ডাকে।” কথা দিয়ে কথা না রাখা, বানিয়ে বানিয়ে বাড়িয়ে বলা অক্ষতিকারক চাপাবাজ লোককে ‘ফোর টোয়েন্টি’, কখনো-বা ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ বলত লোকে আগেকার দিনে। আমাদেরকালেও সেটা বচনে ছিল, অভিধানে আর ঢোকেনি।

আসল ‘ফোর টোয়েন্টি’/‘চারশ বিশ’ চেনা হলো আরও পরে, আইন পড়তে গিয়ে দণ্ডবিধির ধারায়। দেখি মেকলে সাহেব (আমাদের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির মুসাবিদাকারী থমাস বেবিংটন মেকলে) প্রতারকের সাজা বেঁধে গেছেন এই ধারায়। কথা দিয়ে কথা না রাখা, বানিয়ে বানিয়ে বাড়িয়ে বলা, চাপাবাজি, সবটারই একটাই ধান্দা যাদের, অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে বাগিয়ে নেওয়া। এমন লোকের ‘ফোর টোয়েন্টি’/‘চারশ বিশ’ ধারা বসে আদালতে। প্রতারক সে। প্রতারণাকর্মে নয়, আমার সহপাঠীর রোল নম্বরটা ‘ফোর টোয়েন্টি’ পড়ে নিতান্ত ভর্তিচক্রে। ‘ফোর টোয়েন্টি’/‘চারশ বিশ’ ডাকে তাকে যেন আবার এই ‘ফোর টোয়েন্টি/চারশ বিশ’ ধারার প্রতারক না ভাবে লোকে! তাই তার ‘ফোর টোয়েন্টি’ রোল নম্বরটা ঢাকা হয় ‘ফোর নাইন্টিন এ’ ডাকে। কি ঝামেলা!

ঝামেলা লাগিয়েছিল দুদকে, আসল ‘ফোর টোয়েন্টি/চারশ বিশ’। টাকা নিয়েও ফ্ল্যাট না দেওয়া ইত্যাকার নানা প্রতারণার অভিযোগ আসে। তফসিলে (দুদক আইনের) না থাকায় নখদন্তহীন মনে তখনকার চেয়ারম্যানের প্রাণ কাঁদছিল। ২০১৩-এর নভেম্বরের সংশোধনীর (দুদক আইনের) আয়োজনকালে সুযোগ পেয়ে তিনি চেয়ে বসলেন ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ সোজাসুজি দুদকের তফসিলে। ঢুকে গেল ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ দুদকে। তিনি গেলেন চলে, মেয়াদ ফুরিয়ে গেল বলে। দুদকে ঢল নামল প্রতারণার, সরাসরি অভিযোগের চোটের ওপর মামলারও, থানা থেকে, কোর্ট থেকে। দেখা গেল পোষানি দেওয়া একখানা ছাগল ফেরত না পাওয়ার বিবাদে ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ লাগানো মামলাও তদন্তে এসে গেছে। ফ্ল্যাট ধরবে, না ছাগল খুঁজবে! অবস্থা কাহিল, এত ঠগ বাছার লোক নেই দুদকে। সবচেয়ে ভালো ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ তাড়ানো। বললেই তো যায় না সহজে! ফ্ল্যাটে-ছাগলে অবস্থায় চলে গেল আড়াই বছর। ২০১৬-এর জুনের সংশোধনীতে (দুদক আইনের) কাটাকাটি হলো ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’। ছুটে গেল ফ্ল্যাট-ছাগল, রয়ে গেল সরকারি ও ব্যাংকের সম্পদ, আর থাকল সরকারি লোকে বা ব্যাংকারে যদি আকামটা করে। এবারে আবার আদালত থেকে আসা শুরু হলো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের পাওনা বাকির বিবাদে প্রতারণার ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ লাগানো মামলার তদন্ত। ব্যাংকের টাকা ‘পাবলিক মানি’ বটে, শুধু পাওনা বাকি ফেলার কাজটা কি প্রতারণা হবে! যুক্তি রেখে মামলা ফেরত দিয়েছিলাম দুদক থেকে।

অজ্ঞাতসারে নিলে হয় চুরি, জোর করে নিলে হয় লুট (জোরের ধরনভেদে হয় ‘এক্সটরশান’, ‘রবারি’, ডাকাতি)। চুপিসারি-জোরাজুরি নেই প্রতারণায়, আছে জারিজুরি। আচ্ছন্ন করে বোধবুদ্ধি এমনভাবে যে, আপন ইচ্ছায় আপনিই তুলে দেবেন প্রতারকের হাতে। মেকলে সাহেব প্রতারকের টেকনিক ঠিকমতোই চিনিয়ে গেছেন দণ্ডবিধির ১১৫ ধারায় চিটিং বলে। চিটিংবাজ প্রতারক পয়লাই মারে ধাপ্পা। সেই ভাঁওতায় বোধবুদ্ধি ভোঁতা হলেই নিজের ক্ষতি নিজেই করার বাকি কাজগুলো সব একে একে করতে থাকবেন তার মতলব মতো। প্রতারণার আদি গুরু শয়তানেরও এই ছিল টেকনিক, আজও আছে, কালও থাকবে অপরিবর্তিত। প্রতারণা জয়ী হয় আপনার বোধবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে। আপনার বোধবুদ্ধির দুর্বলতাই হলো প্রতারকের সঞ্জীবনী শক্তি। আর, আপনার অবাস্তব লাভের লোভে সিদ্ধি হয় প্রতারকের। প্রতারকরা শয়তানেরই চ্যালা। সব প্রতারকই বিমূর্ত শয়তানেরই মূর্ত প্রতিরূপ। প্রতারকের কারবারে ছাড় দেওয়াও শয়তানি কারবার বটে।

কে যে প্রতারক আর কে যে নয়, চেনা বড় মুশকিল আজকে! চারদিকে এখন শুধু প্রতারণা আর প্রতারণা! বাড়ছে সংখ্যা, জুড়ছে নতুন নতুন ফন্দিফিকির। প্রতারণার উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠল নাকি এই ভূমি! সঙ্গে জুটেছে উফশী (উচ্চফলনশীল) প্রযুক্তি একালের ডিজিটাল। চারদিকে যেন প্রতারণার জাল বিছানো! ধরা পড়ছে ছোট-বড় নির্বিশেষে, ঝাঁকে ঝাঁকে। আগে প্রতারিত হতো বুদ্ধিহীন ছোট লোকে। এখন শুনি বুদ্ধিমান বড় বড় লোকেও পড়ে প্রতারকের খপ্পরে। প্রতারকের জালে ফাঁসে প্রতারক ধরা সরকারি লোকেও। করোনা চিকিৎসা চুক্তি, ভিআইপি প্রটোকল বাগিয়ে নেয় প্রতারকে। খবরে দেখা গেল কদিন আগে, মুজিববর্ষের লোগো লাগিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ সেজে এক ‘ফোর টোয়েন্টি চারশ বিশ’ গাছ লাগানোর কথা বলে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে কারবার সেরেছে। আবার, বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ভাঙিয়ে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার উপরি কারবার করেছে ব্যবসায়ীদের টাকায়। আজব কারবার দেখি! ব্যবসায়ী ধরাশায়ী প্রতারকের কাছে! ঠগের মুল্লুক হয়ে গেল নাকি শেষে! তাহলে তো বিদেশিরা আসবেই প্রতারণার কারবারে! হালে আবার ডিজিটালের ভার্চুয়ালে কারবার জমেছে জম্পেশ, ব্যবসার নামে। প্রতারণা তো তবে এইবারে শিল্পের জাতে উঠেছে! শিল্প তো আবার রোখা যাবে না, রাখতে হবে টিকিয়ে, অর্থনীতি বাঁচাতে! হুজ্জতির মধ্যে কি বজ্জাতিও চলবে!

‘মোষের যেমন শিং  (What the horns are to the buffalo), বাঘের যেমন থাবা (what the paw is to the tiger), মৌমাছির যেমন হুল (what the sting is to the bee), প্রাচীন গ্রিক গীতিকাব্যে রমণীর যেমন রূপচ্ছটা (what beauty, according to the old Greek song, is to woman), বাঙালির হলো শঠতা তেমনই [কাজের]  (deceit is to the Bengalee)। প্রতিশ্রুতির পাহাড় (Large promises), অনায়াস অজুহাত (smooth excuses), সুবিধামতো মিথ্যাচারের বিস্তীর্ণ জাল (elaborate tissues of circumstantial falsehood), ছলচাতুরী  (chicanery), কিরা-কসম কেটে অবলীলায় মিথ্যাচার (perjury) আর জালিয়াতিই (forgery) হলো নিম্ন গাঙ্গেয় অববাহিকার লোকদের আক্রমণ ও আত্মরক্ষার হাতিয়ার  (are the weapons, offensive and defensive, of the people of the Lower Ganges)।’ বলে মেকলে সাহেব (গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের প্রথম আইন সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ ভারতে ছিলেন ১৮৩৪-৩৮) বাঙালি চরিত্রের অপবাদ দিয়ে গেছেন সেই ১৮৪১ সালে (‘ওয়ারেন হেস্টিংস’ নামে তার লেখায়)।

যে প্রতারণার এত দোষ এই বাংলায় তার চলতি শব্দগুলো তো দেখি আদি বাংলা নয়। প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, ছলনা, শঠতা নির্ভেজাল সংস্কৃত। ঠগবাজি, বাটপারি হয়েছে সংস্কৃত থেকে। জোচ্চুরি, ধাপ্পাবাজি, ধোঁকাবাজি হয়েছে হিন্দি থেকে (বাঙালি আরেক ধোঁকা খায় ডাল দিয়ে রেঁধে)। শঠ, প্রতারক, প্রবঞ্চক, ঠগবাজ, বাটপার, ধোঁকাবাজ, জোচ্চোর কিছু ছিল বাংলায় টেটন নামে। চিট বানিয়েছে ইংরেজ। বাঙালিকে শঠ, প্রতারক বলে মেকলে সাহেব সেই ঢালাও অপবাদটা ঢেলেছেন এক মহারাজ নন্দ কুমারকে উপলক্ষ করে। ইংরাজে মহারাজে প্রতারণার খেলা ছিল তখনকার রাজনীতি। রাজস্বভাব তো ধরার কথা নয় প্রজাদের। তবে কেন এখন মেকেলের দেওয়া সেই অপবাদ সত্য প্রমাণেই ব্যস্ততা বেশি!

ইংরাজ, মহারাজ আরও কত রাজে বাঙালিকে প্রতারিত করেছে বারবার। স্বরাজেও কেন প্রতারিত হতে হবে! রাষ্ট্রই যদি পড়ে প্রতারকের খপ্পরে বাঙালির আর কি আশা থাকে! যত প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র দিয়েছিল ৫০ বছর আগে, দিয়ে যায় বছরে বছরে, সেসব রক্ষা না হলে নাগরিকের যে আবার প্রতারিতবোধ আসে। প্রতারকের খপ্পর থেকে নিজের এবং নাগরিকদের রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই কাজ। সত্যিকারের কোনো প্রতারককে কি সেই ‘ফোর নাইন্টিন এ’-এর মতো কোনো কায়দা করে ঢাকা দেওয়া, ছাড় দেওয়া চলে!

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com