চামড়াশিল্প

নজর দেওয়া হোক উৎসে 

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪ এএম

আমাদের চামড়াশিল্প ব্যাপক সম্ভাবনাময় খাত হওয়া সত্ত্বেও অব্যবস্থাপনা, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ নানা নেতিবাচক কারণে খাতটি বিকশিত তো নয়ই, উপরন্তু দুর্নীতি-অনিয়মের ছায়াতলে রয়েছে। সরকার নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় উঠে এসেছে বিবর্ণ চিত্র। ৮ জুলাই দেশ রূপান্তরে ‘অনিয়মের দুর্গন্ধ চামড়া শিল্পনগরীর সারা গায়ে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির শিরোনামেই স্পষ্ট ধারণা করা যায়, কী রকম কদাচার-দুরাচারের অভিঘাত লেগেছে খাতটিতে। বলা হয়েছে, ‘ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চামড়া শিল্পনগরী দেশের চামড়া খাতের প্রধান কেন্দ্র। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর কথা ছিল চামড়াশিল্প খাত পৌঁছাবে আন্তর্জাতিক মানে। একই সঙ্গে রোধ করা যাবে ভয়াবহ পরিবেশদূষণ। তবে প্রায় দেড় যুগ পর এসে দেখা যাচ্ছে, এসব লক্ষ্যের খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে। উল্টো প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি এবং অনিয়মের প্রমাণ উঠে এসেছে। লক্ষ্য পূরণের পরিবর্তে এই শিল্পনগরী নিজেই দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।’

আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, কেন দেড় যুগেও হাজারীবাগের তুলনায় সাভারে উৎপাদন ব্যবস্থা বেশি পরিকল্পিত হওয়া সত্ত্বেও এই শিল্পনগরীর ঔজ্জ্বল্য দৃশ্যমান করা গেল না? ওই প্রতিবেদনের গর্ভে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর পরিবেশগত ঝুঁকির যেসব তথ্য উঠে এসেছে, এর দায় এড়ানোর অবকাশ নেই সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই। পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সমীক্ষায় প্রকল্পটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘প্রকাশ গণকেন্দ্র’  যে সমীক্ষা পরিচালনা করেছে তাতে উঠে এসেছে অবৈধ আড়ত, মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা, কাঁচা চামড়া বাজারে অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ভবনের ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু না হওয়া, রেন্টাল নীতিমালার অভাব, অডিট আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু অবকাঠামোর অপূর্ণাঙ্গ ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো। পরিবেশগত ঝুঁকি নিরসনে এত দিনেও কেন ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়নি, আমরা প্রশ্ন রাখি এও।

চামড়া দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা আছে বিশ^বাজারে। কিন্তু এর মূল ক্ষেত্রটিই যদি হয় বিবর্ণ তাহলে সম্ভাবনার পথ কণ্টকাকীর্ণ হতে বাধ্য। আমরা জানি, শিল্প-কারখানা ও উৎপাদনশীলতা মানুষের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের মূল চাবিকাঠি। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল যথার্থই বলেছেন, ‘কৌশল যতই চমৎকার হোক না কেন, মাঝে মাঝে এর ফলাফলগুলোর দিকেও নজর দেওয়া উচিত।’ আর টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেমের জনক বলে খ্যাত টাইচি ওহনো বলেছেন, ‘শিল্পে কেবল অপচয় দূর করার দিকেই মনোযোগ দিলে হবে না, বরং উৎপাদন প্রক্রিয়া ও শিল্প-কারখানার প্রতিটি স্তরে ও পরিবেশের দিকে মনোযোগ গভীর রাখা বাঞ্ছনীয়।’ আমাদের চামড়াশিল্প তো বটেই, বিকাশমান সব শিল্পের ক্ষেত্রেই তাদের এই কথাগুলো কতটা প্রণিধানযোগ্য এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পবিত্র  ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি।  কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি ও চামড়াশিল্পে ব্যাপক  কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত হলেও অসত্য নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া নিয়ে যে চরম অব্যবস্থাপনা ও বিপর্যয় দেখা গেছে, তা গত ঈদেও পিছু ছাড়েনি। এর অভিঘাত লেগেছে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ক্ষতির চিত্রও ফের স্ফীত হয়। কোরবানির পশুর চামড়া অর্থনীতিতে যে মূল্য সংযোজন করে, তার ওপর মৌসুমি ব্যবসায়ীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। চামড়াশিল্প খাতে শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সুচারু না হলে বড় অংশের জনগোষ্ঠী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর ক্ষত উপশম করে দ্রুত এই শিল্পকে নতুন করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই । আমরা এও মনে করি, অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানিমুখী বাজারের জন্য আলাদা শিল্প কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে উৎসে নজর দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধানও নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত