চট্টগ্রামের কক্সবাজার ও পেকুয়ায় পাহাড়ধস ও নগর অচল হয়ে পড়া জলাবদ্ধতায় সংগতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, চট্টগ্রামে দুর্যোগের দায় কি শুধু প্রকৃতির; নাকি মুনষ্যসৃষ্ট অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডেরও প্রতিফল। ফের পাহাড়ধসে সৃষ্টি হয়েছে মর্মন্তুদ পরিস্থিতির। বিগত কয়েক দশকে পাহাড়ধসে নিভে গেছে অনেক জীবন প্রদীপ। চট্টগ্রামবাসীর সামনে ফিরে ফিরে সৃষ্ট এই সংকট নিয়ে কথা হয়েছে যত কাজ হয়নি এর কিয়দংশও। পাহাড়ধসে প্রাণহানি প্রায় প্রতি বছরের মর্মন্তুদ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর পেছনে মুখ্যত দায়ী কিছু মানুষের লোভের থাবা। যারা পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা ভাঁজে ভাঁজে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন, তারা সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একাংশ। তাদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে বলবানরা তৈরি করেছেন এবং করছেন মৃত্যুফাঁদ। আর জলাবদ্ধতার কারণ আরও বহুমাত্রিক।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে দেশে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেছে। আগের বৃষ্টিপাতের তুলনায়, এটি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন অসময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে যে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, তা পরবর্তী সময়ে হচ্ছে। এর ফলে বৃষ্টির সময়সীমা বদলে গেছে। এই বৃষ্টিপাত আসা-যাওয়ার সময়ের পরিবর্তনের কারণে, অনেক সমস্যা হচ্ছে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে ভূমি এবং সমুদ্রের স্বাভাবিক তাপমাত্রার মধ্যে একটা বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে। ফলে একটা ফিউশন তৈরি হয়েছে। যে কারণে দেশে তিন-চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এতে শহর বা নগর এলাকার অবস্থার ভয়ানক। এটা আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে কিন্তু ভূমিধসসহ অনেক কিছু হচ্ছে। এর ফলে ড্রেনেজ সিস্টেমসহ অনেক কিছু কলাপস হয়ে যাবে। বিভিন্ন কারণে পানি রাস্তা থেকে জায়গামতো যেতে পারছে না। তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। যে পানি সাগরে যাওয়ার কথা, যেতে পারছে না। এ কারণে অল্পতেই জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে। বিশেষ করে, পাহাড়ি এলাকার মাটি তা সহ্য করতে পারছে না। যে কারণে সময়ে-অসময়ে ভূমিধস। তাহলে এর পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? প্রকৃতিগত সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। প্রধানত আমাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। আমরা যা করছি, তা কখনো এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে পারবে না।
অন্যদিকে বিশেষ করে রোহিঙ্গারা যেখানে আছে, সেখানে তাদের আশ্রয়ের জন্য আমরা স্বল্পসময়ের সমাধানের চেষ্টা করেছি। এটা কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। এটি কখনো দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি হতে পারে না। এর ফলে কখনো বৃষ্টিপাতের ধরন এবং শক্তিশালী জলপ্রবাহে পরিবর্তন নিয়ে আসা যাবে না। কারণ, সেখানের ভূমি অনেকটা নরম হয়ে গেছে। এর ফলে ওয়াশআউট হলেই ভূমিধস হবে। ঠিক তখনই অবধারিতভাবে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু। এটা অস্বীকারের উপায় নেই, নগর এলাকায় এ বিষয়ে অনেক বিদগ্ধ, বরেণ্য বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কিন্তু তারা অনেকটাই অসহায়। আমরা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই নষ্ট করে ফেলেছি। আমরা কেটে ফেলেছি প্রচুর গাছপালা। প্রকৃতিকে ধ্বংস করার ফলে সরাসরি পরিবেশের অসংখ্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, বঙ্গোপসাগরে যে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে, তাতে ভারতের উড়িষ্যা থেকে শুরু করে মিয়ানমার এবং নিম্নচাপের কারণে আমাদের নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ অনেক এলাকায় উচ্চ ধরনের মেঘ জমে আছে। এর ফলে চলতিসহ আগামী কয়েক দিন প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। ড্রেনেজ সিস্টেম কলাপস হওয়ার কারণে কয়েক দিন যে পরিমাণ জলধারা প্রকৃতিতে আটকে থাকবে তা সাগরে আসবে না। এ কারণে সহজে সমাধানও আসবে না। আগামী এক সপ্তাহের মতো শহরের জলাবদ্ধতা থেকেই যাবে।
সময়ের প্রবহমান স্রোতে প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের পথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রকৃতি, প্রাণ ও পরিবেশ এ তিনের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলেই দুর্যোগের ঘনঘটা শুরু হতে থাকে প্রকৃতিতে। বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সামগ্রিকভাবেই বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলা এবং ‘সমুদ্রকন্যা’ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে তা চরম জীবনঝুঁকির। এ কথা মনে রাখতেই হবে, প্রকৃতির প্রতি অবিচার করলে প্রকৃতি অভিঘাত করবেই। পাহাড়ধসের ফলে এমন মর্মন্তুদতার জন্য পরিকল্পনাগত ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। স্যাটেলাইট কিংবা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস সংগ্রহ করা সম্ভব। স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে খুব সহজে পাহাড়ধসের সম্ভাব্য এলাকা এবং কবে নাগাদ ঘটতে পারে, তা জানা কঠিন নয়। বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে মানবসৃষ্ট অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। সঠিক সময়ে সঠিক জ্ঞানের প্রয়োগ না করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সদ্ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়া, সমন্বয়ের অভাব, ঝুঁকি অনুমান, ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তুতি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফলের ওপর গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে সামগ্রিক উন্নয়নের পথে পরিবেশ ও প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকৃতিপ্রদত্ত বাস্তুসংস্থানের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করে নির্বিচারে ভূমির ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্থানীয় মানুষের স্থাপনাকৌশল বাদ দিয়ে কংক্রিট স্থাপনার সম্প্রসারণ করে ভূমিরূপের ক্ষয়সাধনকে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। প্রকৃতির নানা স্বাভাবিক চক্র ক্রমেই বিনষ্ট হচ্ছে মানুষের অতি ভোগবিলাসিতার কারণে। জন্মলগ্ন থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে পৃথক দুর্যোগ আঘাত হানার বদলে সমন্বিত দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। একটি দুর্যোগ আরেকটি দুর্যোগকে প্রভাবিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সমস্যা, যা অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তিত আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজন ঘটিয়ে নেওয়ার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে পরিবেশের নানাবিধ বিষয় ও দুর্যোগের বিষয়াবলির মোকাবিলা করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাহাড় ও সমতলের মধ্যে মেলবন্ধন করতে গিয়ে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা সঠিকভাবে গবেষণালব্ধ ফলাফল বের না করেই তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বনায়নের হার না বাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পদ্ধতিগত ত্রুটি, প্রায়োগিক ও বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ও আগাম পূর্বাভাস ব্যবহার না করা, দক্ষ জনবলের অভাবসহ ঝুঁকি অনুমান না করতে পারা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। সমন্বয়মূলক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা হিসেবে দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক সুবিধা পাওয়া যাবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় উৎসাহ বাড়ানো জরুরি। আরও কিছু বিষয়ের দিকে নজর গভীর করা জরুরি, যেমন ভূমিধস, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, তীব্র দাবদাহ, পাহাড় ও সমতলে সুপেয় পানির সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূপৃষ্ঠের ও উপরিভাগের পানি সঞ্চালন প্রক্রিয়ার ব্যাপক তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে অল্প সময়েই বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ঝুঁকিপূরণ স্থানগুলোতে বসতি স্থাপন না করা, সড়ক সম্প্রসারণ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করা, সঠিকভাবে কম উচ্চতাসম্পন্ন ও কম দুর্যোগ সহনশীল ভবন নির্মাণ করার পাশাপাশি ভূমির ওপর অতিমাত্রায় চাপ না ফেলা, নদ-নদী, খালবিল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সমন্বিত পরিকল্পনা করাসহ নানাবিধ বিষয়ে নজর দিতে হবে। বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অধিকাংশ সময় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হয়। প্রকৃতির নানা প্রভাবক ও আদর্শ স্থান বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে বিরূপতা তো সৃষ্টি হবেই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দায়িত্বশীলদের অনেকেই প্রাণ-প্রকৃতির কথা বিবেচনা না করে বাস্তুসংস্থানের চক্রাকারে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। ফলে অগোচরেই নিজেদের বিপর্যয় ডেকে আনা হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস কিংবা পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতা। বিদ্যমান বাস্তবতায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে বড় আকার ধারণ করতে পারে এই আশঙ্কা অমূলক নয়। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা দেশজুড়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেও কাজ করতে দিতে হবে। দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণার প্রায়োগিক দিকগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। অথচ এই বিভাগগুলো প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে সঠিক প্রায়োগিক পরিকল্পনা ও ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলো জানাতে।
আরও একটি কথা মনে রাখা জরুরি, যারা নিরুপায় হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা ভাঁজে ভাঁজে ‘মৃত্যুকূপে’ বসবাস করেন তাদের উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে আর যাদের বৈরী কর্মকা-ে প্রকৃতিতে অভিঘাত লাগছে তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস যদি আমরা সমন্বিতভাবে আগেই আদায় করতে পারি তাহলে জীবনরক্ষা সম্ভব, এমনকি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়াও সহজ হবে।
লেখক : প্রাকৃতিক দুর্যোগ গবেষক ও বিশ্লেষক। অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়