একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর যে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চের গণহত্যার পরেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহর ঢাকা হয়ে ওঠে আতঙ্কের শহর। দল বেঁধে মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গ্রামের দিকে পাড়ি দিতে থাকে লাখো মানুষ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় সীমান্ত অতিক্রম করা। জীবন বাঁচাতে মানুষ দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেয়। এভাবে ধীরে ধীরে ভারত হয়ে ওঠে বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল। এপ্রিল থেকে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও ভারত সরকার প্রকাশ্যে শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করে জুন মাস থেকে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য দিতে শুরু করে। জুলাই থেকে প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা এবং গেরিলাদের অপরারেশন শুরু হয় বাংলাদেশ ভূখ-ে। এর আগে অল্প পরিসরে অপারেশন চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আবার ভারত সীমান্তে চলে যেতেন। কিন্তু জুলাই থেকেই নিজেদের ভূখন্ডে অবস্থান করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য অর্জন করেন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। মার্চ থেকে ডিসেম্বর এই প্রায় নয় মাসের খন্ড খন্ড যুদ্ধ ডিসেম্বরে এসে একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আবার ঠিক এই সময়েই, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেখা দেয় যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা। জাতিসংঘে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। এই সময়ে সামনে চলে আসে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বাংলাদেশ ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ে জাতিসংঘে ঢাকার গণহত্যা নিয়ে বিশ^ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। বিশ্ব নেতারা ঢাকার গণহত্যার বিবরণ জেনে পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুললেও অনেকেই চুপ থাকেন কী হতে যাচ্ছে আগে দেখা যাক, এমন চিন্তা থেকে।
তবে ৩ ডিসেম্বর বিকেলে পশ্চিম ভারতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হামলার পরে ভারত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বেগবান হয়; বিশেষ করে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় বাহিনীও প্রকাশ্যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ভারতের বিমানঘাঁটিতে আক্রমণের দিন প্রথমে নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ ডিসেম্বর। পরে এক দিন পিছিয়ে করা হয় ৩ ডিসেম্বর। এই আক্রমণ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাক জেকব তার ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। রিচার্ড সিসন ও লিও রোজ তাদের লেখা ওয়ার অ্যান্ড সিজেশন বইয়ে লিখেছেন, ইয়াহিয়ার যুদ্ধ ঘোষণার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলোয় পাাকিস্তান সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করা হতো, তাতে এই সেনানায়ক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবেন। দ্বিতীয়ত, পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় কর্মকা-ের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জনমত ও প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানের পক্ষে যায়নি। তৃতীয়ত, কোনো ব্যবস্থা না নিলে ‘ফাঁসিতে ঝোলাব’ বলে ইয়াহিয়াকে ভুট্টো উপহাস করেন।
তবে পাকিস্তান যে কারণেই ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলা করুক না কেন, তত দিনে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল; বিশেষ করে ঢাকার মধ্যে গেরিলাদের হামলায় পাকিস্তানি সেনাদের দিশেহারা অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে সীমান্ত এলাকায়ও মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সৈন্যদের যৌথ হামলায় পাকিস্তানিরা পিছু হটতে শুরু করেছে। জেনারেল ইয়াহিয়ার শাসনামলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক বৈঠকে বসলাম ৩০ নভেম্বর। আমাকে বলা হলো ৩ ডিসেম্বর ভোররাতে আমাদের প্রাথমিক আক্রমণ করতে হবে। তার আগে পিএএফ পূর্ব পাঞ্জাবে শত্রুর বিমানঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা চালাবে। ৩ ডিসেম্বর কী মাহাত্ম্য ছিল জানি না, তবে একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। সেটা হলো, আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি।’
এদিকে ডিসেম্বর মাসের শীত চলছে। মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া প্রায় নয় মাসের কাছাকাছি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে; তবুও কোনো ফলাফল না আসায় পাকিস্তানি অনেক সেনার মনোবল ভেঙে পড়ছিল। অনেকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছুটি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরতে চাইছিল। ভারতের হামলা শুরু হওয়ার পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান নিয়াজী বাংলাদেশের ভূখন্ডের ভেতরে তার অবস্থানকে ‘মজবুত ঘাঁটি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল উদ্ধার করতে পারেনি।