নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুর, এটা ছাত্রদের কাজ নয়। এটা কেউ করবেন না দয়া করে। লেখাপড়া করেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশটাকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’
গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল উদ্বোধন এবং ধানমণ্ডিতে জয়িতা টাওয়ারের ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি চালকদেরও সতর্কের সঙ্গে গাড়ি চালাতে বলেছেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, ‘একটা গাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে একটা মানুষ মারা গেল বলে আরও ১৫টা গাড়ি ভাঙা ও সেখানে আগুন দেওয়া এবং সেই ভাঙার ফলে ও আগুন দেওয়ার ফলে গাড়িতে যাত্রী, ড্রাইভার, তারা যারা আহত হয় অথবা নিহত হয় সেই দায়িত্বটা কারা নেবে?’
আন্দোলনের নামে যারা নাশকতায় জড়াচ্ছে, তাদের হুঁশিয়ার করে সড়কে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যারা গাড়ি ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগ করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘গাড়ি ভাঙচুর, আগুন দেওয়া যারা করবে, তাদের খুঁজে বের করা হবে, তাদেরও শাস্তি দেওয়া হবে। আর ওই যে গাড়িতে আগুন দেবে, সেই গাড়িতে যদি কেউ মারা যায় বা কেউ আগুনে পোড়ে, তাহলে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’
ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে সরকার বাসের ভাড়া বাড়ানোর পর থেকে শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। এর মধ্যে ২৪ নভেম্বর সিটি করপোরেশনের গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসান এবং ২৯ নভেম্বর রামপুরায় বাসচাপায় একরামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়লের শিক্ষার্থী মাঈনুদ্দীনের মৃত্যু হলে আন্দোলন আরও জোর পায়। মাঈনুদ্দীনের মৃত্যুর পর ওই সড়কে বেশ কয়েকটি বাসে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা, ভাঙচুর করা হয় আরও কয়েকটি যানবাহন।
সড়ক দুর্ঘটনার পর মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে লাঠিসোঁটা হাতে কিছু মানুষের গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়িতে আগুন দেওয়া কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘এই যে আগুন দেওয়া শুরু হলো, ওই গাড়িতে কি যাত্রী নাই? শিশু নাই? ওখানে কি ছাত্রছাত্রী নাই? ওই আগুনে যারা পুড়বে, আহত হবে বা মারাও যেতে পারে, তার দায়িত্বটা কে নেবে? খুব স্বাভাবিকভাবে যারা গাড়ি ভাঙচুর করছে তাদের ওপর বর্তায়। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সেই ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
হতাহতের দায়ও ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগকারীদের নিতে হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যদি আহত হয় বা নিহত হয়, সেটার দায়িত্ব যারা ভাঙচুর করছে, তাদের। সে কারণে আমি বলব, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’
সড়কে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে পরপর পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করে দেখারও নির্দেশ দেন। সিটি করপোরেশনের গাড়িচাপায় প্রাণহানির ঘটনায় কারা দায়ী তা খুঁজে বের করারও নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘তখন ময়লার গাড়ি নিয়ে যে যাচ্ছিল, সেই গাড়ির সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে যাবে কেন? সেটাও তো দেখতে হবে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। আর গাড়ি যে চালাচ্ছিল, তার এই গাড়ি চালাবার মতো দক্ষতা আছে কি না সেটাও বিবেচনা করতে হবে। উভয় দিকেই দায়িত্বশীলতা কার কতটুকু আছে সেটা আমাদের দেখতে হবে।’ গাড়িচালকদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তাদের সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে।’
জনবহুল এই দেশে আরও অনেক গাড়িচালক প্রয়োজন জানিয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকার যতগুলো মহাসড়ক করছে, সেখানে চালকদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে।’ বেসরকারি বাসচালকদের জন্য প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে তাদের কর্মঘণ্টা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় দেওয়ার কথা বলেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাটে চলার সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হবে। রাস্তার যেকোনো জায়গা থেকে, যেখান থেকে সেখান থেকে রাস্তা পার হতে গেলে অ্যাকসিডেন্ট হবেই। একটা চলমান গাড়ি চট করে ব্রেক করতে পারে না। সেটার ব্রেকটা কষতে সময় লাগে। প্রত্যেকটা রাস্তায় পারাপার করার জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে। সেখান থেকেই রাস্তা পার হওয়া সমীচীন। হঠাৎ করে দৌড় দেবে আর অ্যাকসিডেন্ট হবে আর অ্যাকসিডেন্ট হলেই রাস্তায় লোক নেমে গাড়ি ভাঙা, গাড়িতে আগুন দেওয়া, গাড়ি পোড়ানো এটা কী ধরনের কথা?’
বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং অতীতের সঙ্গে দেশের মানুষের জীবনযাপনের পার্থক্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন যা দেখছে, আগে তা ছিল না সেটাও শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় রাখতে হবে। কাজেই তাদের ভবিষ্যতে বাংলাদেশটাকে এই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’
সংক্রমণ বাড়লে আবার স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে : আবারও যে মহামারীর নতুন ঢেউ আসতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবার বেড়ে গেলে স্কুলও ফের বন্ধ করে দিতে হবে।’ গতকাল ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একই অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা সতর্ক করেন, ‘মহামারীর প্রকোপ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। আবার নতুন আরেকটা ওয়েভ আসছে। কাজেই এটা মাথায় রেখে... যেকোনো সময় যদি বিস্তার লাভ করে, আবার কিন্তু স্কুল সব বন্ধ হয়ে যাবে।’
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
অধিকারটা অর্জন করে নিতে হবে : নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে নারীদের স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী-পুরুষ সমতায় বাংলাদেশের ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির’ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের নারীরা যেন সবসময় এটা মনে রাখেন যে অধিকার অধিকার করে বললে, চিৎকার করলে, অধিকার দেবে না। অধিকারটা অর্জন করে নিতে হবে। নিজেদের কাজ নিজেরা করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে আন্তর্জাতিকভাবেও এটা স্বীকৃত, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, টানা সপ্তমবারের মতো জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে।’
শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর করে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবাইকে লেখাপড়া করতে হবে। বাবা-মা-অভিভাবকের কথা মানতে হবে।’
নারী ও শিশুদের কল্যাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তার মেয়ে শেখ হাসিনা। নারীরা যেন সর্বস্তরে স্থান করে নিতে পারে, সেজন্য সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও বলেন। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য “গর্বের”।’ শিশুদের উদ্দেশে বলেন, ‘আজকের শিশুরাই হবে তখনকার কর্ণধার। কাজেই সেভাবেই নিজেদের তৈরি করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনাম, জয়িতা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।