সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরে ক্ষুব্ধ উচ্চ আদালত

জনগণের করের টাকায় অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণের কঠোর সমালোচনা করেছে উচ্চ আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার এক রায়ে আদালত জনগণের অর্থের অপচয় রোধে নির্দেশনা দিয়েছে। আদালত শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ‘এখনই যদি বিষয়টি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তাহলে আমাদের খুব শিগগির দেখতে হতে পারে যে, সরকারি কর্মকর্তারা ফরমাল স্যুট পরা শিখতে যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন।’ আদালত বলেছে, জনগণের (করদাতা) টাকায় সরকারি কর্মকর্তারা সুযোগ-সুবিধা পান। তাই জনগণের অর্থ নষ্ট হয় এমন বেপরোয়া আচরণের অধিকার তাদের নেই। রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার নিচের সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি সফর বা ভ্রমণে বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বিদেশ সফরে যেতে পারবেন না। তেমনি সফর শেষে দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সফরের ব্যয়সহ বিস্তারিত বিবরণ সংবলিত প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দেওয়া উচিত।

আরিচা ও মাওয়া ফেরির জন্য সার্চ ও ফগলাইট কেনার আগে তা যাচাই ও পরখ করতে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন বিআইডব্লিউটিসির (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন) কয়েকজন কর্মকর্তা। হাইকোর্টের রায়ে ওই কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ওই কর্মকর্তারা তাদের পদের অপব্যবহারসহ চরম স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়েছেন। জনগণের অর্থের অপচয় করেছেন। আদালত বলে, ১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা চলে গেলেও সরকারি এ কর্মকর্তাদের আচরণ ছিল ‘নব্য জমিদারের’ মতো। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত বুধবার ১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক। আর তাতে একমত পোষণ করেন কনিষ্ঠ বিচারক।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালে আরিচা ও মাওয়ায় বিআইডব্লিউটিসির ফেরিতে সার্চ ও ফগলাইট বসাতে দরপত্র ডাকা হয়। পরে সার্চ ও ফগলাইট বসানোর কাজটি পায় ‘জনি করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর আগে প্রি-শিপমেন্ট দেখতে বিআইডব্লিউটিসির চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সফরে (২০১৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল) যায়। ১০টি ফগলাইটের জন্য ব্যয় ধরা হয় ৬ কোটি। আর এর জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি ছিল ২৮ লাখ টাকা। এরপর চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে এমন অভিযোগ করে ব্যাংক গ্যারান্টি অর্থ নগদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে চিঠি দেয় বিআইডব্লিউটিসি। পরে এ চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জনি করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী ওমর আলী ২০১৬ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর রুল খারিজ করে রায় দেয় আদালত। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী বাহাদুর শাহ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অবন্তী নূরুল। বিআইডব্লিউটিসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইফুর রশীদ। রায়ে বলা হয়, আমরা জানি, সরকারি দাপ্তরিক কাজ বা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ করতে হয়। যদি অত্যাবশ্যক প্রয়োজন না হয় তাহলে এ ধরনের কর্মসূচি নেওয়া উচিত নয়। সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে করদাতাদের (জনগণ) অর্থ যাতে নষ্ট না হয় সেটি দেখা এই আদালতের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

ওই সরকারি কর্মকর্তারা নব্য জমিদার : মামলার নথির বিশ্লেষণ করে রায়ে বলা হয়, এখানে সরকারি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্র সফরে শুধু তাদের অবস্থান এবং কর্র্তৃত্বের অপব্যবহারই করেননি, রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসহ তারা তাদের দায়িত্ব পালনেও ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মকর্তাদের সার্বিক অদক্ষতার কারণে ফগলাইটের গুণগত মান ও কার্যকারিতা সঠিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফগলাইট প্রয়োজন হয় শীতকালে। অথচ কা-জ্ঞানহীনভাবে তারা জুন মাসে ওই লাইট পরীক্ষা করেছিলেন। আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, এই কর্মকর্তারা কেবল তাদের পদের অপব্যবহারই করেননি, তারা তাদের অযোগ্যতা স্বীকার না করে চরম স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়েছেন। হাইকোর্ট বলে, ‘১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও তাদের আচরণ ছিল নব্য জমিদারদের মতো।’

স্যুট পরা শিখতে যুক্তরাজ্যে যাওয়া দেখতে হতে পারে : সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ সফর বা ভ্রমণ নিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আলোচিত কিছু সংবাদের বিষয়টি উল্লেখ করে আদালত। স্কুলে ‘মিড-ডে মিল’ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচ বছরের মধ্যে পাঁচ শতাধিক সরকারি কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাবের বিষয়টি উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলে, সৌভাগ্য যে, সরকার এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়নি। রায়ে বলা হয়, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ যদি শক্ত হাতে থামানো না হয়, এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে দেওয়া হয় তাহলে আমাদের শিগগির দেখতে হতে পারে যে সরকারি কর্মকর্তারা ফরমাল স্যুট পরা শিখতে যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন। এটি হাস্যকর শোনালেও শীঘ্রই তা বাস্তবে পরিণত হতে পারে।’

জনগণের অর্থ নষ্ট হয় এমন আচরণের অধিকার নেই সরকারি কর্মকর্তাদের : সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে রায়ে হাইকোর্ট বলে, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, কোনো অনিশ্চিত শর্তে নয়, জনগণের সেবা করতে তাদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাও করদাতাদের টাকায়। প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তার নৈতিক দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা হচ্ছে, জনগণের সেবা করা। এটি শুধু কর্তব্য ও বাধ্যবাধকতা নয়, সংবিধান ও বিভিন্ন আইন দ্বারা সরকারি কর্মকর্তাদের পরিষেবা নিয়ন্ত্রিত। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তাদের এটি মনে রাখতে হবে যে, তারা বিনামূল্যে কোনো সেবা দিচ্ছেন না। বরং তারা যেসব সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করেন, তার টাকা দিচ্ছে দেশের করদাতারা।’ রায়ে বলা হয়, ‘জনগণের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয় এমন বেপরোয়া ও বিধিবহির্ভূত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের কোনো অধিকার তাদের নেই। আইন, বিধি ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও সেবার বিষয়টি নির্ধারিত।’