দোলেশ্বর মসজিদ পেল ইউনেস্কোর স্বীকৃতি

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। সংস্থাটির এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কার্যালয় থেকে গত বুধবার অনলাইনে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ফিজি থেকে শুরু করে কাজাখস্তান পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোকে  প্রতিবছর স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। এ পুরস্কারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ডস ফর কালচারাল হেরিটেজ কনসারভেশন’। ২০২১ সালে ছয়টি দেশের ৯টি স্থাপনাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’ শ্রেণিতে স্বীকৃতি পেয়েছে কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থাপনা এ বছর ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর ইউনিয়নে দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদটি নির্মাণ করা হয় ১৮৬৮ সালে। তখনকার জনসংখ্যার বিবেচনায় এটি ছোট আকারে নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর মসজিদটি একাধিকবার সম্প্রসারণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় মসজিদের অবকাঠামো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছিল। কয়েক বছর আগে মসজিদটিকে সংস্কার করে পুরনো রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তার পরিবার ১৫০ বছর ধরে মসজিদটি দেখাশোনা করে আসছে।

২০১৮ সালে স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদের নেতৃত্বে মসজিদটির সংস্কারকাজ শেষ হয়। পুরনো মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয় নতুন আরেকটি মসজিদ। পুরনো মসজিদটি এখন লাইব্রেরি ও মক্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তিনি আবেদন করেন।

ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে বলেছে, এসব স্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্যের যে বৈচিত্র্য ধরে রাখা হয়েছে সেটি সত্যিই প্রশংসার বিষয়। যেসব স্থাপনা পুরস্কার পেয়েছে সেগুলোতে টেকসই উন্নয়নের নানা দিক রয়েছে। পুরনো স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ ঠিকমতো হয়েছে কি না সেটি বিশ্লেষণ করে দেখে ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞ কমিটি। সংস্কারের মাধ্যমে পুরনো রূপ দেওয়া হয়েছে দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদকে।

মসজিদটির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, ১৮৬৮ সালে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর দাদির বাবা ও দাদার বাবার হাতে এর গোড়াপত্তন হয়। ১৯৬৮ সালে বিপুর বাবা অধ্যাপক হামিদুর রহমান তৈরি করেন মসজিদটির মিনার। এরপর বংশ পরম্পরায় মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আসে বিপুর হাতে।

সরেজমিনে হানাফিয়া জামে মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, পুরানো মসজিদটিকে ঠিক রেখেই সংস্কার করে বর্ধিত করা হয়েছে নতুন ভবন। লাল রংয়ের মসজিদটি সম্পূর্ণ কংক্রিটের তৈরি। মসজিদের ছাদটাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ভাগ হয়ে যাওয়া ছাদের অংশকে নিচ থেকে ধরে রেখেছে গাছের মতো তৈরি করা কলামগুলো। ভিন্ন ভিন্ন ভাগে ভাগ হওয়ার কারণে উপর থেকেও মসজিদের ভেতরে আলো প্রবেশ করছে। বাতাস ঠিকমতো চলাচলের জন্য মসজিদের চারপাশ খোলা রাখা হয়েছে। এ কারণে দিনভরই যথেষ্ট আলো ও বাতাস থাকে, ফলে বিদ্যুৎ অপচয় কম হয়।

স্থানীয় কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ফারুক জানান, দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদে একসঙ্গে দুই হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।

মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোক্তা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদের সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য স্থপতি সাঈদ মোস্তাক আহমেদ পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টা দেশের জন্য যেমন বিরাট সম্মানের, তেমনি আমার জন্যও ভীষণ আনন্দের। মসজিদটি যখন সংস্কারের কথা চলছিল তখন অধিকাংশ মানুষই এটাকে ভেঙে নতুনভাবে তৈরির কথা বলেছিল। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম পুরাতন ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখতে। আমরা যখন নতুনের কথা বলব তখন পুরনোকে সঙ্গে নিয়েই কথা বলতে হবে। পুরনো ঐতিহ্যকে দেখে রাখতে হবে। নতুন প্রজন্ম আমাদের এইগুলো না দেখলে তারা বুঝতে পারবে না এই দেশ কেমন ছিল।’

ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে আনন্দিত মসজিদটির সংস্কারকাজে নেতৃত্ব দেওয়া এশিয়ার স্থপতিদের সংগঠন আর্ক এশিয়ার সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ধরনের কাজে আমাদের দেশে ইউনেস্কোর এটাই প্রথম স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়াটা অবশ্যই আনন্দের বিষয়। গত ২৫ বছর ধরে এই ফিল্ডে কাজ করছি, এই স্বীকৃতি আমার ব্যক্তিগত স্বীকৃতি না। আসলে এটা দেশের প্রতি স্বীকৃতি যে, আমাদের পুরাতন জিনিসগুলা রক্ষা করতে হবে। এই পুরস্কারটা এই ফিল্ডটাকে আরও প্রসার করবে। পুরো বাংলাদেশে পুরাতন যেসব স্থাপনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার অনেকগুলো হয়তো বেঁচে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আরও কাজ করতে হবে। সরকারের এই সেক্টরে আরও অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই সেক্টরে আরও বেশি ফান্ড ও জনবল দিতে হবে। দেশ হয়তো অনেক ডেভেলপ হয়ে যাবে, বড় হয়ে যাবে। কিন্তু ঐতিহ্য না থাকলে দেশের তো মূল্য থাকবে না। ঐতিহ্য না থাকলে দেশের পরিচয় থাকবে না।’