ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই কাজটি করতে পারলে এসএমই ফাউন্ডেশনও কার্যকর হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসএমই খাতের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শনের জন্য এমএমই ফাউন্ডেশন ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ডিসপ্লে সেন্টার করতে পারে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাত করা সহজ হবে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ৮ দিনব্যাপী এসএমই পণ্য মেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এসএমই ফাউন্ডেশন এই মেলার আয়োজন করে। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মেলার উদ্বোধন করেন।
নবম জাতীয় এসএমই পণ্যমেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসএমই ফাউন্ডেশন এক খন্ড জমি নিয়ে সেখানে এসএমই উদ্যোক্তাদের জায়গা করে দিতে পারে।’ বিষয়টি এসএমই ফাউন্ডেশনকে ভেবে দেখার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তা ছাড়া এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতেও আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় আমাদের সরকার এসএমই খাতে চলতি মূলধন ঋণ দেওয়ার জন্য প্রথম দফায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় দফায় পল্লী এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ঋণদান কার্যক্রম সম্প্রসারণে আরও ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রণোদনার আওতায় ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে সরকার ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে। অর্থাৎ গ্রাহককে মাত্র ৪ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা এসএমই ফাউন্ডেশনকে এ ক্ষেত্রে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। গত অর্থবছরে দুই মাসের মধ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন ১০০ কোটি টাকা সফলভাবে বিতরণ করেছে। এই ঋণের ২৬ শতাংশ পেয়েছে নারী উদ্যোক্তারা। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে এসএমই ফাউন্ডেশন বাকি ২০০ কোটি টাকাও বিতরণ করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সে জন্য ফাউন্ডেশনকে আরও কিছুটা উদ্যোগ নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্রেডিট হোলাসেলিং প্রোগ্রামের আওতায় এসএমই ফাউন্ডেশন যাতে আরও ঋণ দিতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থা করে দিতে চাই। তবে যত্রতত্র শিল্প-কারখানা করা যাবে না। আমরা চাই আমাদের কৃষিজমি রক্ষা করতে। খাদ্যের চাহিদা কখনো কমবে না, বরং বাড়বে। কভিড-১৯ এর পর অনেক দেশেই খাদ্য চাহিদা বেড়েছে। অনেক দেশ এখন খাদ্য চাহিদায় ভুগছে। আমাদের দেশে সেই সমস্যা নেই। করোনা দেখা দেওয়ার পর আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম, যে করেই হোক আমাদের খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি করতে হবে। সেই দিক দিয়ে আমরা খুবই ভালো অবস্থানে আছি।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের দিকে নজর দিতে পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তা ছাড়া পণ্য রপ্তানি বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এসএমই ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে সারা দেশে এসএমই প্রতিষ্ঠানের ১৭৭টি ক্লাস্টার চিহ্নিত করেছে। এই ক্লাস্টারসহ সারা দেশে ৭৮ লাখ এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১ জন করে মানুষের কর্মসংস্থান হলে কমপক্ষে ৭৮ লাখ বেকারের কাজের সুযোগ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসএমই প্রতিষ্ঠানের ক্লাস্টার উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধিতে আমরা যথাসম্ভব সহায়তা দিয়ে যাব।’
নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেওয়ার জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এখানে পুরুষ সমাজকে আমি কিছুটা পরামর্শ দিতে পারি। আপনারা ব্যবসা করেন, তো আপনাদের স্ত্রীদের যদি এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেন তাহলে তারা সংসারের পাশাপাশি শিল্পায়নেও অবদান রাখতে পারবে। এতে নারী উদ্যোক্তা তৈরি হবে। সেই সুযোগটা অন্তত তাদের দেবেন। বাধা দেবেন না।’
এ বছর চারজন উদ্যোক্তাকে পুরস্কার দেয় এসএমই ফাউন্ডেশন। বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা (নারী) ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন সোহানী’জ ইন্টেরিয়রের স্বত্বাধিকারী হুমায়রা মোস্তফা। বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (পুরুষ) ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন ঝিনাইদহের তাজী অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম ও চট্টগ্রামের পাথরঘাটার হিফ্স অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মো. শোয়াইব হাসান এবং বর্ষসেরা মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন ঢাকার নেক্সডিকেড টেকনোলজির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আজিজুল হক।
অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট ও চেক তুলেন দেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা ও এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমান।