পিৎজা বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। হরেক রকম নাম, রং ও স্বাদের পিৎজা এখন হাতের নাগালে হলেও পিৎজার জন্ম ইতালিতে। শুরুতে কারা খেত এই পিৎজা? কার হাত ধরে এত জনপ্রিয় হলো? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
পিৎজা কথন
বিশ্বায়নের এই যুগে অনেক কিছুই এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। ঘরে বসে আমরা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের পণ্য কিনতে পারি। জামা-কাপড়, বইপত্র, প্রযুক্তি সামগ্রী থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা ধরনের জিনিসপত্রের নিয়মিত ক্রেতা আমরা। দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ফাস্ট ফুড আমাদের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় আমরা শুধু দেশীয় খাবারই অর্ডার করি না, ভারতীয়, আফগানি, চাইনিজ, থাই, ইতালিয়ান, জাপানি, ম্যাক্সিকান খাবারও খেতে ভালোবাসি। ভিনদেশি নানার খাবারের মধ্যে জনপ্রিয় ইতালিয়ান খাবার পিৎজা আমাদের অনেক পছন্দের। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্করা ঘরে-বাইরে বাহারি নাম-রং ও মুখরোচক স্বাদের পিৎজা খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। ইতালির সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোলাকৃতির এই খাবার। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর ৩০০ কোটি পিৎজা বিক্রি হয়, যার অর্থ বছরে একজন মার্কিন নাগরিক গড়ে পিৎজার ৪৬টি সøাইস খান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই ফাস্ট ফুড ইউরোপ ছাড়িয়ে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করেছে। কারা, কীভাবে পিৎজাকে ভোজনরসিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিল?
আদি ইতিহাস
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ইতালিয়ান ও গ্রিক সাহিত্য থেকে পিৎজা শব্দের উৎপত্তি। রুটির ওপর বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে টপিং সাজানোর ধারণা নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকালে রোমান, গ্রিক ও মিসরীয়রা এভাবেই রুটি খেতেন। পাথর বা কাদার চুলায় তারা রুটি সেঁকতেন আর তার ওপর মাশরুম বা লতাপাতা ছড়িয়ে দিতেন। এ ছাড়া রুটির ওপর নোনতা বা মসলাযুক্ত কিছু দিয়েও শুরুতে পিৎজা বানানো হতো। যাদের তাড়াহুড়ো থাকত, তারাই মূলত খেতেন। রোমান কবি ভার্জিলের ঈনিড মহাকাব্যে (খ্রিস্টপূর্ব ২৯-১৯) প্রথম এ ধরনের পিৎজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ঈনিডে গ্রিক হিরো অ্যানিয়াস ও তার সাথীরা ইতালির পশ্চিমে ল্যাটিয়াম অঞ্চলে পৌঁছার পর গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ওই সময় তারা সঙ্গে থাকা খাবার পাতলা গমের কেকের ওপর রাখেন। কেকগুলো আসলে খাবারের পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। অ্যানিয়াসরা খাবারের ওপর বন থেকে সংগ্রহ করা মাশরুম ও লতাপাতা ছড়িয়ে দেন। পাত্র বা থালা হিসেবে ব্যবহৃত গমের কেকসহ পুরো খাবারটাই তখন তারা খেয়ে ফেলেন। অ্যানিয়াসের ছেলে অ্যাসকানিয়াস নতুন ওই খাবার খেয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘দেখো! আমরা আমাদের প্লেটও খেয়ে ফেলেছি!’
আধুনিক পিৎজা
আজকে আমরা যে ধরনের পিৎজা খাই, তার উৎপত্তি মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইতালির নেপলস শহরে। বুরবন সাম্রাজ্যের সময় ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম শহরে পরিণত হয় নেপলস। বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তার ও গ্রামাঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষক ওই সময় নেপলসে ভিড় করায় শহরের জনসংখ্যা ৫০ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৭০০ সালে নেপলসে দুই লাখের মতো মানুষ বাস করত। ১৭৪৮ সালের দিকে এটি বেড়ে প্রায় চার লাখে গিয়ে ঠেকে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর রুটি-রুজির সংস্থান করা ও শহুরে অর্থনীতি সচল রাখতে হিমশিম খায় প্রশাসন। সে সময় নেপলসের অর্ধ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। অসচ্ছল এসব মানুষের তখন লাজ্জারোনি ডাকা হতো। বাইবেলে যিশুখ্রিস্ট লাজারাস নামের যে ভিখারির কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে নেপলসের দারিদ্র্যপীড়িত ওই মানুষের বেশভূষার মিল পাওয়া যায়। সামান্য মজুরির বিনিময়ে কুলিগিরি, বার্তা পাঠানো বা অন্যান্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা। কাজের সন্ধানে সারা দিন ব্যস্ত সময় পার করা এসব শ্রমিককে তাই সস্তা ও কম সময়ে খাওয়া যায় এমন খাদ্যের দরকার হতো। তাদের চাহিদায় সাড়া দেয় পিৎজা। দোকানে নয়, বিশাল বাক্সে পিৎজা ভরে বগলে করে রাস্তায় রাস্তায় শ্রমিকদের কাছে পিৎজা ফেরি করতেন বিক্রেতারা। অত্যন্ত সস্তা এই খাবার খেয়ে ক্ষুধা মেটানো হতো। ফরাসি লেখক আলেক্সান্ডার ডুমা তার লু করিকোলো (১৮৪৩) বইয়ে জানান, দুই লিয়ার্দ (ফরাসি মুদ্রা) মূল্যের পিৎজার সøাইস দিয়ে সকালের নাশতা ও দুই সো-তে (ফরাসি মুদ্রা) একটি বড় পিৎজা কিনে পুরো পরিবার খেতে পারত। নেপলসের শ্রমিকদের প্রতিদিনের খাবারের এই পিৎজার সঙ্গে ঈনিডে উল্লিখিত পিৎজার মধ্যে মৌলিক কোনো ফারাক নেই। শ্রমিকরা যে পিৎজা খেতে অভ্যস্ত ছিল, তাতে সাধারণত রুটির ওপরে রসুন, চর্বি ও লবণ দেওয়া হতো। এ ছাড়া একটু ভারী পিৎজাও তারা খেতেন যাতে ঘোড়ার দুধ থেকে তৈরি চিজ কাচোকাভাল্লো, চেচেনেল্লি (এক প্রকার মাছ) ও তুলসী পাতা থাকত। কখনো কখনো টপিংয়ে টমেটোও দেওয়া হতো।
ইতালির শ্রমিকদের খাবার পিৎজাকে খাদ্যবিশেষজ্ঞরা বরাবরই অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। তারা এটিকে খাবার হিসেবে গণ্যই করতেন না। বিশেষ করে দেশটিতে ভ্রমণ করা বিদেশিরা প্রায়ই পিৎজাকে ‘জঘন্য’ তকমা দিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। তাদের কড়া সমালোচনার কারণে লাজ্জারোনিদের প্রধান খাবার পিৎজা সে সময় জাতে উঠতে পারেনি। ১৮৩১ সালে টেলিগ্রাফের উদ্ভাবক স্যামুয়েল মোর্স পিৎজা সম্পর্কে বলেন, ‘বমি উদ্রেককারী সবচেয়ে বাজে ধরনের কেক এই পিৎজা। টমেটো সস বা টমেটোর টুকরো, ছোট মাছ, গোলমরিচ জানি না আর কী কী উপকরণ পিৎজার ওপরে দেওয়া হয়। পুরো জিনিসটা দেখতে রুটির মতো, যা প্রচণ্ড দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমা থেকে তুলে আনা হয়েছে।’ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে রান্নার বই প্রথমবারের মতো বাজারে আসে। সেই বইয়ে সচেতনভাবে পিৎজার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়। এমনকি নেপলসের স্থানীয় খাদ্যতালিকায়ও সে সময় পিৎজার ঠাঁই হয়নি। এদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে লাজ্জারোনিদের সুদিন ফিরলেও একসময়ের জীবনরক্ষাকারী পিৎজা খাওয়া বাদ দিতে পারেননি তারা। তাদের বদৌলতে পিৎজার রেস্তোরাঁ খোলার সম্ভাবনাও সে সময় উঁকি দেয়।
রানী মারগেরিতা
ইতালিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়, যা রিসরজিমেনতো বা ইতালিয়ান ইউনিফিকেশন নামে পরিচিত। আন্দোলনের ফলে ইতালির অঙ্গরাজ্যগুলো এক হয়ে একক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ওই ঘটনা পিৎজার কপাল খুলে দেয়। ১৮৮৯ সালে ইতালির রাজা প্রথম উমবেরতো ও তার স্ত্রী রানী মারগেরিতা নেপলস সফরে যান। সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারে গতানুগতিক জটিল ফরাসি খাবার খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন রাজা-রানী। নেপলসের বিখ্যাত শেফ রাফায়েল এসপোসিতোর কাছে আদেশ এলো রানী মারগেরিতাকে স্থানীয় মজাদার খাবার রান্না করে খাওয়ানোর। রানীকে খুশি করতে এসপোসিতো তিন ধরনের পিৎজা তৈরি করেন। একটি পিৎজার টপিংয়ে ছিল চর্বি, কাচোকাভাল্লো ও তুলসী পাতা। আরেকটিতে চেচেনেল্লি ও শেষেরটিতে টমেটো, মোজারেলা চিজ ও তুলসী পাতার টপিং দেন ওই রাঁধুনি। তিনটি পিৎজা খেয়ে ব্যাপক উল্লসিত হন রানী মারগেরিতা। বিশেষ করে তৃতীয় পিৎজাটি তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। রানীর সম্মানে সেই পিৎজার নাম রাখা হয় পিৎজা মারগেরিতা। এই পিৎজা এখন বিশ্বে অনেক জনপ্রিয়। পিৎজা রন্ধনশিল্পী সেই এসপোসিতোকে অনেকে আধুনিক পিৎজার জনক হিসেবে বিবেচনা করে। রানী মারগেরিতার গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর পিৎজার জীবন নতুন দিকে মোড় নেয়। এটি কেবল আর লাজ্জারোনিদের খাবার থাকেনি। রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরেও ঢুঁ মারে পিৎজা। রাজ পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের পিৎজা চরম তৃপ্তির সঙ্গে উপভোগ করতেন।
নেপলসের বাইরে জনপ্রিয় হতে পিৎজাকে আরও বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে কাজের খোঁজে নেপলসবাসীর একটি অংশ ইতালির উত্তরাঞ্চলে পাড়ি জমায়। সেখানে তারা পিৎজাকে পরিচিত করেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪৩-৪৪ সালে) মিত্রবাহিনী ইতালি আক্রমণ করে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত মিত্রবাহিনীর সদস্যরা ইতালির দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যামপেনিয়া অঞ্চলে প্রথম পিৎজা খেয়ে এত মুগ্ধ হয় যে পরে তারা ইতালির যে অঞ্চলেই যেত, পিৎজা খেতে চাইত। তবে মূলত যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েই পিৎজার চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। সে সময় ভ্রমণ খরচ কমে যাওয়ায় ইউরোপে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে । ইতালিয়ান খাবার অর্ডার করা হলে তাদের পাস্তার পাশাপাশি রেস্তোরাঁয় পিৎজাও দেওয়া হতো। এর মধ্য দিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরের দেশের ভোজনরসিকদের পছন্দের খাবার হয় পিৎজা। শুরুতে সব রেস্তোরাঁয় পিৎজা তৈরির ওভেন ছিল না। এ কারণে পিৎজার স্বাদেরও রকমফের হতো। তা সত্ত্বেও খুব দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় স্বাদের কথা মাথায় রেখে পিৎজায় নতুন নতুন উপকরণ যুক্ত হতে শুরু করে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পিৎজার দামও বেড়ে যায়, যা দিতে তখন আর আপত্তি করতেন না ক্রেতারা। এভাবেই হতদরিদ্র লাজ্জারোনিদের সস্তা খাবার পিৎজা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নেপলসের গণ্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে এটি জাতীয় পর্যায়ে সম্মানের সঙ্গে জায়গা করে নেয়। ইতালীয় খাবার পাস্তা, পোলেনতার পাশে শেষমেশ যুক্ত হয় পিৎজার নাম।
যুক্তরাষ্ট্র জয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের হৃদয় জয় করলেও পিৎজার সেকেন্ড হোম কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইতালিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট কোস্ট অঞ্চলে থাকতে শুরু করেন। ১৯০৫ সালে নেপলসের জিন্নারো লমবারদি নিউ ইয়র্কে প্রথম পিৎজার রেস্তোরাঁ খোলেন। লমবারদি’স নামের ওই রেস্তোরাঁ দ্রুতই মার্কিনিদের মধ্যে তুমুল সাড়া ফেলে। ইতালীয় বংশোদ্ভূত নন, এমন ব্যবসায়ীরাও পিৎজার ব্যাপক চাহিদা দেখে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জিভের সঙ্গে সংগতি রেখে রাতারাতি রেস্তোরাঁ খুলে পিৎজার রেসিপিতে পরিবর্তন আনেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই আইক সুওয়াল নামের টেক্সাসের এক নাগরিক কাস্টমারদের আকৃষ্ট করতে তার নতুন রেস্তোরাঁ শিকাগোতে একটু ভিন্ন ধরনের পিৎজার আবির্ভাব ঘটান। এই পিৎজার ক্রাস্ট আগের চেয়ে গভীর ও পুরু। এ ছাড়া টপিংয়ের নিচের অংশে চিজ ও তার ওপর একগাদা ঘন টমেটো সস দিয়েও পরিবর্তন আনা হয়। ওই সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে পিৎজার রেস্তোরাঁ রকি মাউন্টেন পাই বেশ জনপ্রিয় হয়। শিকাগোর মতো গভীর বা পুরু না হলেও রকি মাউন্টেন পাইয়ের পিৎজার ক্রাস্ট আরও প্রশস্ত, যা মধু দিয়ে ডেজার্ট হিসেবে খাওয়া হতো। একই সময় শূকরের মাংস ও আনারসের টপিং দেওয়া হাওয়াইয়ান পিৎজা ভোজনরসিকদের নজর কাড়ে। পরে এই হাওয়াইয়ান পিৎজা দেখে নেপলসবাসী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কারণ লাজ্জারোনিদের সেই পিৎজার টপিংয়েও মাংস থাকত।
পরিবর্তনের ঢেউ
পঞ্চাশের দশকের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন পিৎজাকে আরও বদলে দেয়। এ ক্ষেত্রে দুটি পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি পিৎজার ডোমেস্টিকেশন অর্থাৎ ঘরেই পিৎজা তৈরি করা। ওই সময় আয় বাড়ায় রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার কেনার মতো সামর্থ্য মানুষের হয়। একই সঙ্গে কর্মজীবী ব্যস্ত নাগরিকরা ঘরে কম পরিশ্রমে খাবার তৈরি করতে চাইতেন। তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ফ্রোজেন পিৎজার প্রচলন শুরু হয়। দোকান থেকে এই পিৎজা কিনে ফ্রিজারে রেখে যখন খুশি তখন খাওয়া যায়। তবে এর জন্য পিৎজার রেসিপি কিছুটা পাল্টানো হয়। রেস্তোরাঁয় বিক্রি হওয়া পিৎজায় টমেটোর অনেক টুকরো দেওয়া হয়। ফ্রোজেন পিৎজার ক্ষেত্রে নিচের অংশে টমেটোর পেস্ট দেওয়া হয় যাতে ওভেনে গরম করার সময় ক্রাস্টের ময়দা শুকিয়ে না যায়। পাশাপাশি ফ্রিজারের কম তাপমাত্রার সঙ্গে সহনশীল করতে পিৎজায় নতুন ধরনের চিজ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পরিবর্তনটি হচ্ছে পিৎজার বাণিজ্যিকীকরণ। গাড়ি বা মোটরসাইকেল সহজলভ্য হওয়ায় ক্রেতাদের ঘরের দরজায় পিৎজা সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। টম মোনাঘান ও জেমস মোনাঘান নামের দুই ভাই ১৯৬০ সালে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে পিৎজার একটি রেস্তোরাঁ খোলেন। অচিরেই ডমিনিক’স নামের ওই রেস্তোরাঁ দ্রুত খাবার ডেলিভারির সুনাম কুড়ায়। একপর্যায়ে তারা রেস্তোরাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ডমিনো’স পিৎজা । ধীরে ধীরে ডমিনো’স পিৎজা ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী পিৎজা রেস্তোরাঁগুলো দেশের বাইরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারিত করে। এখন বিশ্বে খুব কম শহরই রয়েছে যেখানে এসব রেস্তোরাঁর দেখা পাওয়া যায় না। আজকের পিৎজা নেপলসের লাজ্জারোনিদের পিৎজার চেয়ে অনেক ভিন্ন। পিৎজার টপিংয়ে পরিবর্তন এসেছে, পাল্টেছে ক্রাস্টও। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকালের সেই পিৎজা এখনো মানুষের মন জুগিয়ে চলেছে। এর প্রতিটি স্লাইসে কয়েক শতাব্দীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সেঁকা হয়।