বেসামরিক প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর

৮ ডিসেম্বর রণক্ষেত্রের অবস্থা আরও শোচনীয় হয় পাকিস্তানের জন্য। পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের মূল ভরসারস্থল ছম্বে উপর্যুপরি চেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। অন্যত্রও অবস্থা বেশ খারাপ। রাজস্থান-সিন্ধু সীমান্তে বরং ভারতের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়। করাচির ওপর ভারতের নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে। যশোরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও পাক সৈন্যরা পালিয়ে আসে। কুমিল্লার এক অংশের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং অন্য অংশের পাশ কাটিয়ে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনী এগুতে থাকে। পাক বাহিনী এই পশ্চাদ্পসরণের পর ঢাকার চারপাশে নিজেদের অবস্থানকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হবে কি না, তা তখনো অজ্ঞাত। এমন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তার শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘদিনের ওয়াদা বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন। ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে নুরুল আমিন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।

৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের সরকারি মুখপাত্র ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে অন্য সব অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে; বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই কোনো ভূখ- দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই। ৮ ডিসেম্বর থেকে ভারতের প্রধান সেনাপতি মানেক শ এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি পাকিস্তানিদের বারবার আহ্বান জানান আত্মসমর্পণ করার জন্য। এটা ছিল পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার একটা কারণ। রণকৌশল হিসেবে পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরা নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, নিয়াজির দুর্গগুলো পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে মিত্রবাহিনী যেন রাস্তাগুলো আটকে দেয়, যাতে পাকিস্তানিরা রাজধানীর দিকে সরে যেতে না পারে। এটা বুঝতে পাকিস্তানিদের সময় লাগে। অপরদিকে, নিয়াজি তার সব সৈন্যই পাঠিয়েছিলেন সীমান্তের তথাকথিত দুর্গগুলোর দিকে। সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য ঢাকায় বলতে গেলে কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। পরে ১৬ ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী যখন ঢাকায় প্রবেশ করে তখন নীরব দর্শক হওয়া ছাড়া পাকিস্তানিদের কোনো উপায় ছিল না। এই সময়ে পাকিস্তানি শাসকরা স্বভাবসুলভ শাসনের নজির হিসেবে ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ এবং ব্ল্যাকআউট জারি করে। ওই দিনের বিবরণে জানা যায় জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি বইতে- ‘আজ আবার রেডিওতে বলল, সন্ধ্যা ৫টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ এবং ব্ল্যাকআউট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত। ছিলই তো বাপু সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কারফিউ, আবার নতুন করে এত ঘোষণা দেবার কী আছে? সন্ধ্যাও আজকাল ৫টাতেই হয়। এদের দেখছি মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলের মতো হয়েছে।’ ওই দিনের আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায় নিউ ইয়র্ক টাইমসের যুদ্ধ সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গের লেখায়। একদিন আগে ৭ ডিসেম্বর মুক্ত হওয়া যশোর থেকে ৮ ডিসেম্বর তারিখে তিনি লিখেছিলেন, মুক্ত যশোরে বাঙালিদের নৃত্য। বাসের ছাদে বাঙালিরা নৃত্যপর। রাস্তায় তারা জোর গলায় স্বাধীনতার সেøাগান দিচ্ছে। তারা পরস্পর আলিঙ্গন করছে, উল্লাস ধ্বনি দিচ্ছে। বিগত আট মাস যাবৎ পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ যে শহর ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে। পাকবাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে যারা পালিয়ে গিয়েছিল এবং এখন ধীরে ধীরে ফিরে আসছে, সেসব বন্ধু ও আত্মীয়ের পুনর্মিলনে মুখর হয়ে উঠছে। কেউ কেউ ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল, অন্যরা লুকিয়েছিল দেশের আরও ভেতরে।

(সূত্র: ডেটলাইন বাংলাদেশ: নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান, সিডনি শনবার্গ। মূলধারা ’৭১, মঈদুল হাসান)