প্রতিকূল আবহাওয়ায় সাময়িক স্থগিত থাকলেও নিরাপদ সড়ক চেয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামেনি। হাফ ভাড়ার ইস্যু সেই আন্দোলনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ঢাকায় সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলন ইতিমধ্যে ছড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীরাও যখন আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করেছে তখন সড়কে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে আরও শিক্ষার্থীদের নাম। গতকালও সড়কে মৃত্যু হয়েছে নোয়াখালীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নোবিপ্রবির এক শিক্ষার্থীর। এ নিয়ে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই চার শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেল।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে চলতি বছরের ১১ মাসে সড়কে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত নভেম্বরেই মারা গেছে ৫৪ জন। এই অবস্থায় সড়ক নিরাপদের দাবি জোরদার হলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। উল্টো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গতকাল দেশ রূপান্তরের নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুপুরে সদর উপজেলার সোনাপুরে ট্রাকচাপায় অজয় মজুমদার (২৩) নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। তিনি তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অজয় মজুমদারের মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোনাপুর জিরোন্ট থেকে মান্নান নগর যাওয়ার পথে সিএনজি অটো থেকে নামার সময় একটি ট্রাক চাপা দেয় ওই শিক্ষার্থীকে। পরে স্থানীয়রা তাকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. দিদার-উল-আলম বলেন, মেধাবী এ শিক্ষার্থীর অকাল প্রয়াণ কষ্ট ও বেদনার। তার পরিবারের সদস্যদের জন্য এ শোক সহ্য করা কঠিন। তার প্রয়াণে একটি সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটল।
নোয়াখালীর এই ঘটনা ছাড়াও গতকাল পঞ্চগড় ও নীলফামারীতে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও এক যুবক নিহত হন। দেশ রূপান্তরের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, জেলার তেঁতুলিয়ায় ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এরশাদ হোসেন (৩২) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। তিনি বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের হুলাশুজোত গ্রামের ওয়াহেদ আলীর ছেলে। অন্যদিকে নীলফামারী সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জেলার পল্লীতে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী বিশ্বনাথ রায় (৩৭) নামে এক যুবক মারা গেছেন। তিনি ডিমলা ইউনিয়নের উত্তর তিতপাড়া গ্রামের মিমানাথ রায়ের ছেলে।
নভেম্বরেই নিহত ৫৪ শিক্ষার্থী : এদিকে চলতি সপ্তাহে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, চলতি বছরের ১১ মাসে মোট ৪ হাজার ২৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫ হাজার ১৪৪ জন। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ১৪ শতাংশ। ট্রাক ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার ঊর্ধ্বমুখী হলেও এটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থার উন্নয়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে দেশে ৩৭৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪১৩ জন। গড়ে প্রতিদিন মারা গেছে ১৪ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ৬৭। শিশু ৫৮। নভেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৪ জন শিক্ষার্থী। এর আগে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ১১৮ শিক্ষার্থী। নভেম্বর মাসে রাজধানী ঢাকায় ১৪টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছে। সবচেয়ে কম প্রাণহানি হয়েছে বরিশাল বিভাগে। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।
তথ্য বলছে, নভেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৪ শতাংশই মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী। ২৩ শতাংশ পথচারী। আর যানবাহনের চালক ও সহকারী ছিল ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষ ও নিয়ন্ত্রণ হারানোয়। এসব দুর্ঘটনায় যানবাহন হিসেবে মোটরসাইকেল, ট্রাক ও বাস বেশি সম্পৃক্ত ছিল।
গত ১৮ নভেম্বর থেকে বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ২৪ নভেম্বর গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর পর তা রূপ নেয় নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবির আন্দোলনে। এর মধ্যে ২৯ নভেম্বর রাতে রামপুরায় বাসচাপায় মারা যায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মাইনুদ্দিন ইসলাম। এরপর আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা দুদফা বাড়িয়ে আন্দোলন ১১ দফায় রূপ দেয়। এরই মধ্যে সড়কে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে লালকার্ড দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া গত সোমবারও তারা মুখে কালো কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ করে। কালো কাপড় বাঁধার কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীরা জানায়, সরকারের নীরবতার প্রতিবাদে তারা এই কালো কাপড় বেঁধেছিল। যদিও সরকার শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। একটি রাজনৈতিক দল শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে বলে সরকারের মন্ত্রীরা বক্তব্য দিচ্ছেন। সমুদ্রে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের কারণে সোমবার ঢাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া ছিল। এর ফলে গতকাল মঙ্গলবার কোনো কর্মসূচি পালন করেনি শিক্ষার্থীরা। অচীরেই তারা সড়কে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। সড়ক নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি সোহাগী সামিয়া।