হঠাৎ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে তোড়জোড়

১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী আসে রায়পুরায়। নদী পার হয়েছিল হেলিকপ্টার ও স্থানীয় জনগণের সাহায্য নিয়ে। এই কাজে তাদের উভচর ট্যাঙ্কগুলো বিশেষ কাজে লেগেছিল। মিত্রবাহিনী এখানে ১৪টি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। মিত্রবাহিনীর এই বিজয়ী দলটি এগিয়ে যেতে থাকে নরসিংদী এবং ডেমরার দিকে।

দেশের অন্যান্য দিকে রংপুর ও সৈয়দপুরে অবস্থিত দখলদার পাকিস্তানিবাহিনী ফুলছড়ি ফেরিঘাট হয়ে ঢাকার দিকে পালাতে চেষ্টা করে। মিত্রবহিনী তাড়া করে তাদের সেই পথেই গাইবান্ধা দখল করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দখল করে ফুলছড়ি ঘাট। একই সময়ে ঘাটের অপর পাড় দখল করে মিত্রবাহিনীর অপর দল। এখান থেকে তারা এগিয়ে যায় বগুড়ার দিকে। পথে গোবিন্দগঞ্জ তাদের দখলে আসে। গোবিন্দগঞ্জে নিহত হয়েছিল একশ’র বেশি পাকিস্তানি। মিত্রবাহিনী এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ আটক করে।

এই সময়ে গভর্নর মালিক এবং জেনারেল রাও ফরমান আলী ঢাকা থেকে পালানোর জন্য পথ খুঁজতে শুরু করে। জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মার্ক হেনরিকে ফরমান আলী অনুরোধ করেন, জাতিসংঘের মাধ্যমে অবিলম্বে একটা যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করতে। পল মার্ক হেনরি ঢাকাস্থ আমেরিকান, রাশিয়ান, ব্রিটিশ ও ফরাসি কনসালকে অবহিত করার পর এই প্রস্তাব জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রেরণ করেন। নিরাপত্তা পরিষদে ফরমান আলীর এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ চলছিল, সে সময়ে হঠাৎ ইয়াহিয়া এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। বস্তুত, রাও ফরমান আলীর এই প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকার এই প্রস্তাব রদ করার পরামর্শসহ ইয়াহিয়াকে জানান যে, পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য সপ্তম নৌবহর ইতিমধ্যেই বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দিয়েছে। এতেই ইয়াহিয়ার মত বদলে যায়। পূর্বপাকিস্তানের রণাঙ্গনের চাপে ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তান নিজেই যখন ‘সম্মানজনক’ভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠে, তখন সেই প্রস্তাবকে সমর্থন না করে মার্কিন সরকার বরং তা রদ করার উদ্যোগ নেয়। ৯ এবং ১০ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভকে দুই দফা প্রস্তাব পাঠান ভারতকে যুদ্ধবিরতির জন্য।

১০ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী মেঘনা অতিক্রম  করলে, যেকোনো মূল্যে এই অগ্রাভিযান রোধ করে সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী করতে সময়ক্ষেপণ, ভারতীয় সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শর্ত ছাড়াই, যে যেখানে আছে সেই ভিত্তিতে ‘নিশ্চল যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর করার ব্যাপারে ভারতকে সম্মত করানোর জন্য ব্রেজনেভের ওপর চাপ বাড়ানো হয়। পাশাপাশি ব্রেজনেভকে জানানো হয়, ভারত যদি যুদ্ধ বিরতি না করে তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। কিসিঞ্জার ১০ ডিসেম্বর তৃতীয়বারের মতো হুঁশিয়ারিসহ সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়ে দেন যে, ভারতকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করানোর ব্যাপারে শিগগিরই কোনো সন্তোষজনক উত্তর যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন না দিতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর প্রেরণসহ শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এমন পরিস্থিতিতে ১০ ডিসেম্বর রাতে দিল্লিতে সর্বোচ্চ সামরিক সভা বসে। এই সময়ে ইন্দিরা গান্ধী সামনে এগিয়ে আসেন। সেখানে তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সপ্তম নৌবহরকে ব্যর্থ করতে ভারতের নৌশক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার, ঢাকা অভিমুখে সামরিক অভিযানের গতি বৃদ্ধি এবং মৈত্রীচুক্তি অনুযায়ী বহিরাক্রমণের বিরুদ্ধে সর্বাধিক সোভিয়েত সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ডি. পি ধরকে মস্কো প্রেরণ।

পূর্বপাকিস্তানে রণাঙ্গনে যখন লড়াই চলছে, তখন বিশে্বর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাঙালিরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতির দাবি জানায়। এমনই একটি খবর জানা যায় ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর সংবাদে। তাতে বলা হয়, ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির উদ্যোগে হাইড পার্ক এলাকার স্পিকার্স কর্নারের কাছে এক জনসভা হয়। দলে দলে নারীরা এই সভায় যোগ দেন। সভার শেষে নারীরা মিছিল সহকারে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে গিয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের দাবি সংবলিত স্মারকলিপি পেশ করে।

(সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন; মূলধারা ’৭১, মঈদুল হাসান)