চাকরির শুরুতেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে আলোচিত ছিলেন প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন। একটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে অনিয়মের অভিযোগের মুখে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। এরপরও তিনি পদোন্নতি পেয়ে ঢাকার (সার্কেল-৩) মতো জায়গায় দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। এরপর শুরু করেন ছোট ভাই নাজিম উদ্দিন মিঠু ও শ্যালক সাইফুল ইসলামের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা। টানা চার বছর এক জায়গায় কর্মরত থেকে এখতিয়ারাধীন এলাকায় প্রায় চারশ কোটি টাকার ঠিকাদারি করেছেন। এ ছাড়াও রোকন উদ্দিন বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের সঙ্গী হয়ে দুদকের জালে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে জিকে শামীমের গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় সংশ্লিষ্ট সংস্থা। এবার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালামও (ইএম সার্কেল-৩) নিজের শ্যালকের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছেন। এ প্রকৌশলী প্রথমে নির্বাহী প্রকৌশলী (ডিভিশন-১) প্রায় তিন বছর এবং পরে পদোন্নতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল শেরেবাংলা নগরে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি নিজের এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে কাজের জন্য চাপ দিলে তিনি রাজি না হওয়ায় প্রভাবশালী আবুল কালাম তাকে বদলি করান। ভুক্তভোগী প্রকৌশলী এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করলে বিষয়টি জানাজানি হয়।
জানতে চাইলে পূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কিছু অভিযোগ পাচ্ছি। কোনো প্রকৌশলী নিজে বা তার নিকট আত্মীয় দিয়ে একই সংস্থায় ব্যবসা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না। যারা দীর্ঘ সময় একই স্টেশনে থেকে এমন কাজ করছে তাদের সরিয়ে আনা হবে। এমন কাজ কারা কারা করেছে তাও খুঁজে বের করা হচ্ছে। শেরেবাংলা নগরে কিছু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চলমান থাকায় এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে এসব বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেব।’
প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন : তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপরও তিনি তার শ্যালক মমতা ট্রেডার্সের মালিক সাইফুল আলম ও ছোটভাই নাজিম উদ্দিন মিঠুর মুন্সি ট্রেডার্সের নামে ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিতে শুরু করেন। প্রকৌশলীর দায়িত্বপালনকালে শুধু মহাখালী ডিভিশন থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৩৭ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। আর শেরেবাংলা নগরে ২টি প্যাকেজে ১৮ কোটি টাকা, তিনটি প্যাকেজে ৫ কোটি টাকা ও আরও একটি প্যাকেজে ৮ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করেছেন। এ প্রকৌশলীর প্রাক্কলন তৈরির কাজে নিয়োজিত একজন নারী সহকর্মী তার শ্যালককে ঠিকাদারি কাজ পেতে সহযোগিতা না করায় তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। বিষয়টি রোকনের অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী স্ত্রী পর্যন্ত গড়ায়। এরপরই এ নারী প্রকৌশলী নিজে ও তার পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল সমিতি নেতারা বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার শুরু করেন। পূর্ত ভবনে শুরু হয় নানা গুঞ্জন।
কয়েক প্রকৌশলী জানান, রোকন বেপরোয়া প্রকৃতির কর্মকর্তা। যেখানে চাকরি করেছেন সেখানেই নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। এ সার্কেলে দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কিত ব্যবসায়ী জিকে শামীমের অন্যতম সহযোগী হিসেবে নাম আসে তার। জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর যে ৯ জন প্রকৌশলীর বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে; সেখানে প্রথম সারিতে নাম আসে রোকনের। তার বিরুদ্ধে জিকে শামীমের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। তাকে ঘুষ দিয়ে শামীম গণপূর্তের বড় কাজগুলো বাগিয়ে নিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে স্বীকারোক্তি দেন।
এর আগে বাগেরহাটে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। টাকা না দিলে টেন্ডার নোটিস গোপন করে জেলার বাইরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল বাগেরহাট প্রেস ক্লাবের মীর জুলফিকার আলী লুলু অডিটরিয়ামে সংবাদ সম্মেলন করে বাগেরহাটের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেখানে ঠিকাদারদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মেসার্স জাহিদ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শেখ জাহিদুর বারী। এ সময় রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের নানা অভিযোগ তুলে ধরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গণপূর্ত সার্কেল, খুলনা বরাবর জেলার ১০ ঠিকাদার স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্রের অনুলিপি দেওয়া হয়। অভিযোগে তারা বলেন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) তালিকায় বাগেরহাট পিডব্লিউর তালিকায় ৯২টি কাজ ছিল। নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা উৎকোচ নিয়ে সেগুলো তাদের পাইয়ে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. রোকন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। নারী সহকর্মীকে আমার কোনো ঘটনায় বদলি করা হয়নি। বদলি কেন হয়েছে তা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। এর বেশি আমার কোনো মন্তব্য নেই।’ এটা বলেই তাড়াহুড়া করে ফোন কেটে দেন।
প্রকৌশলী আবুল কালাম : প্রকৌশলী আবুল কালাম একসময় গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (ইএম) ডিভিশন-১ এ তিন বছরেরও বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন। তখন থেকেই নিজ শ্যালক সাইফুল করিম খানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইন্টিগ্রেটেড কনস্ট্রাকশন সার্ভিসেসের নামে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন। পরস্পর যোগসাজশে শ্যালকের প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার কাজ দেন। এরপর তিনি পদোন্নতি পেয়ে আরও বড় দায়িত্বে অর্থাৎ সার্কেল (ইএম-৩) বসার পর আরও বেপরোয়া হয়ে যান। একের পর এক তিনি শ্যালকের প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করাতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারই অধীনস্থ নির্বাহী প্রকৌশলী শ্যালকের প্রতিষ্ঠানে কাজ না দিলেই বাধে বিবাদ। প্রভাবশালী আবুল কালামের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইস্কান্দর আলী কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত দেন। এরপর তদন্ত শুরু হয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালামের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম ও তার শ্যালক সাইফুল করিম মিলে অবৈধভাবে শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি প্রকৌশলীরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করতে পারেন না। এ কারণেই আবুল কালাম শ্যালক সাইফুলের নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি করার পর থেকে এই ইন্টিগ্রেটেড কনস্ট্রাকশন সার্ভিসেসের নামে বিপুল পরিমাণ টাকার কাজ করা হয়েছে। মূলত ইএম ডিভিশনের এয়ার কন্ডিশন, লাইট, সিসিটিভি, নেটওয়ার্কিং, সাউন্ড সিস্টেম ও পিএবিএক্স ও ইন্টিরিয়র ও ফার্নিচার সরবরাহের কাজ হলেই সেখানে প্রকৌশলী কালাম তার শ্যালককে দিয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়ান। এরপর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে কাজ দিতে চাপ দেন। কেউ রাজি না হলে প্রকৌশলী কালাম ও তার সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য মিলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে বদলি করাসহ নানা হয়রানিতে ফেলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় শেরেবাংলা ডিভিশনে থেকে নিজের আয়ত্তে সব নিয়েছেন বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, আবুল কালাম সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালার (পিপিআর) শর্ত ভঙ্গ করে শ্যালকের ঠিকাদারি ফার্ম ইন্টিগ্রেটেড কনস্ট্রাকশন সার্ভিসেসের নামে কাজ দিয়ে দরপত্র অনুমোদন করেছেন। তিনি তার অধীন কাঠের কারখানা বিভাগে ৮ কোটি, মেকানিক্যাল কারখানা বিভাগে ৪ কোটি, ইএম বিভাগ ৭-এ ১২ কোটি, ইএম বিভাগ ৮-এ ৬ কোটিসহ মোট ৩০ কোটি টাকার অধিক কাজ দেন।
জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের (ইএম সার্কেল-৩) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার শ্যালক সাইফুল কাজ করে এটি সত্য। তার ঠিকাদারির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাহী প্রকৌশলী যে অভিযোগ করেছেন তা সঠিক নয়।’