ট্রাম্প পার্ট টু কি আসিতেছে

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগটা প্রায় প্রাণঘাতী ক্যানসারের ফিরে আসার আশঙ্কার মতো মাথার ওপরে ঘুরছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ৩৫ মাসেরও কম সময় বাকি। এ অবস্থায় এই অস্বস্তির অনুভূতিটা বিশ্বের কাছে ক্রমেই বেশি করে জোরালো হবে।

এই একগুঁয়ে উদ্বেগের একটি কারণ হচ্ছে ট্রাম্প অনুমানযোগ্যভাবেই এখনো রিপাবলিকান পার্টির ওপর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেছেন। দলটি আজও তার অসুস্থ ব্যক্তিত্বের প্রতিটি অশুভ দিক আর কর্মকৌশলের প্রতিমূর্তি। আরেকটি কারণ? লাখ লাখ অদূরদর্শী (আমি একটু নরমভাবেই বলছি) আমেরিকান ইভাঞ্জেলিক্যাল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে একটি চোয়াড়ে আর মতলববাজ চালিয়াতকে সমর্থন করে চলেছে, যিনি এক বছরেরও বেশি আগে সুনিশ্চিত পরাজয়ের পরও আরও বেশি করে উন্মাদনা এবং উদ্ভট ষড়যন্ত্রের তত্ত্বের বুলির ওপর চলছেন। ট্রাম্পের থাকা উচিত হাসপাতালে। আরও ভালো হয় কাঠগড়ায় থাকলে। কিন্তু আমি যেমনটা আগেও বলেছি, সংবিধানের বেপরোয়া লঙ্ঘনের গাদা গাদা অভিযোগের পরও ঐতিহাসিক নজির এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ম্যারিক গারল্যান্ডের ক্ষমার অযোগ্য অবহেলার জন্য তিনি সম্ভবত অভিযুক্ত তথা দোষী সাব্যস্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন। অথচ প্রেসিডেন্ট হয়ে ওই সংবিধান সংরক্ষণ ও রক্ষা করার শপথ করেছিলেন তিনি। অনেক কনফেডারেট সমর্থকদের মতো হতভাগা নন ট্রাম্প। কঠিনভাবে বিচার বা কৈফিয়তের মুখোমুখি হওয়া থেকে আজীবন পিছলে বেরিয়ে যাওয়ায় নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি।

এসবের মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, তার ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মনোনীত হওয়া খুবই সম্ভব। সময়ের অনিবার্যতা আর অস্পষ্টতা বাগড়া না দিয়ে বসলে তার আবার হোয়াইট হাউজ দখল করার সম্ভাবনা যথেষ্টর চেয়েও বেশি। ট্রাম্পই যদি ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর বিজয়ীর হাসি হাসেন তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আর এ গ্রহের ভাগ্যে কী হবে তা যে কারও কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত। যদি তাদের চোখ ট্রাম্প এবং তার পরিচিত (এবং কিছুটা আশ্চর্যজনক) উদারপন্থি-বিদ্বেষী সহযোগী আর চামচাদের মতো অজ্ঞ আর অসহিষ্ণুতায় অন্ধ না হয়ে থাকে।

এক রকম সক্ষম হলেও অপ্রীতিকর এই গণবক্তা এরই মধ্যে প্রথাগত আলোকিত যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বাকি সংবেদনশীল মানুষের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তা থেকেই অনুমান করা যায় তিনি আবার ক্ষমতায় এলে আরও কী মাত্রায় ক্ষতি হতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার অপছন্দের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুধু মুখের কথায় নয়, বরং বাস্তব হিংসাত্মক আক্রমণ চালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি একে উৎসাহিত করেছেন। জানিয়েছেন সাধুবাদ। ট্রাম্প তার নির্বোধ পরিকল্পনা ও কার্যকলাপে বাধা দেওয়া বা তা ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য ওই বিরোধীদের বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার এ মনোভাবেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ক্যাপিটল হিলে ৬ জানুয়ারির বিদ্রোহে। হ্যাঁ, আমি একে বিদ্রোহ-ই বলব, ‘দাঙ্গা’ বা বিপথে যাওয়া ‘বিক্ষোভ’ না। অনেক বেশি মানুষ অনেক দীর্ঘ সময় ধরে একথা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে দ্বিধায় ভুগেছে (প্রেসিডেন্ট পদের প্রতি সম্মান বা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা যে কারণেই হোক) যে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার কুৎসিত কথা আর কাজের দ্বারা প্রমাণ করেছেন তিনি বেপরোয়া ফ্যাসিবাদীই রয়ে গেছেন। ক্ষোভ এবং অসন্তোষের ধিকি ধিকি আগুনে জ্বলা ‘হের’ ট্রাম্প বারবার খোলাখুলিই নিশ্চিত করেছেন, তিনি আর তার সমানভাবে অসাধু ষড়যন্ত্রী বন্ধুরা ২০১৬ সালে শুরু করা ধ্বংসাত্মক কাজটি সম্পন্ন করতে চান। (প্রসঙ্গক্রমে, যদি আমার ‘হের’ কথাটির ব্যবহার করার অপরাধের জন্য দুঃখ পান তাহলে বলতে হবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রথমবারের প্রার্থিতা ঘোষণা করার সময়কার তার অগ্রহণযোগ্য, লৌহমানবসুলভ আচরণ খেয়াল করেননি)।

যুক্তিবাদী, মানবহিতৈষী লোকরা যাকে ‘শাসনের’ লক্ষ্য বলে মনে করেন ট্রাম্পের কাছে তা চরম অপছন্দের। তাই ‘গডফাদার পার্ট টু’ হিসেবে ট্রাম্পের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে তার বিরুদ্ধে ‘শত্রুদের’ করা কাল্পনিক অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার আত্মপ্রেমী ক্ষুধা মেটানো। শিষ্টতা এবং আইনের শাসনকে তিনি দেখবেন একজন মাফিয়া বসের মতোই অবজ্ঞার সঙ্গে। ট্রাম্প বা অন্য কোনো স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টের প্রতিশোধের তৃষ্ণাকে নিবৃত্ত করার জন্য (সংবিধানপ্রণেতাদের) তৈরি করা তথাকথিত ‘সতর্কতার বেড়া’ও এখন পরিণত হয়েছে সেকেলে আর বিনোদন জাগানো অসার বস্তুতে। আদালতের অনুমোদনে পছন্দমতো আসনের সীমা বদলানো আর ডেমোক্র্যাট দলের স্বভাবগত অদক্ষতা আর ঢিলেমির বদৌলতে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকানরা সম্ভবত আবার প্রতিনিধি পরিষদের দখল নিয়ে নেবে। রিপাবলিকান দল প্রমাণ করেছে যে তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিটগ্রস্ত লোক অনেক। তার ওপরে আছে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স টমাস এবং স্যামুয়েল আলিটোর মতো প্রেসিডেন্টের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সমর্থকদের নিয়ে ট্রাম্পের মনমতো গড়া সুপ্রিম কোর্ট। দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের যে তাদের প্রিয় নেতার ওপর (তিনি যদি ওভাল অফিসে ফিরে আসেন) ‘ব্রেক’ হিসেবে কাজ করা উচিত রিপাবলিকানদের মাথা থেকে সে ধারণাই উড়িয়ে দেবে এসব।

দৈনন্দিন চরম বিশৃঙ্খলা আর হট্টগোল ছাপিয়ে গিয়ে ‘ট্রাম্প পার্ট টু’ অনিবার্যভাবে লাইফ সাপোর্টে থাকা মার্কিন ‘গণতন্ত্র’ হিসেবে পরিচিত বস্তুটির ওপর একটি সুবিস্তৃত, পদ্ধতিগত আক্রমণ চালাবে। সব খাঁটি ফ্যাসিস্টের মতোই ট্রাম্প ও তার সমর্থক গোষ্ঠী জয়ী হলে গণতন্ত্রের অনুরাগী। হেরে গেলে তারা আর গণতন্ত্রের ভক্ত থাকে না। তাই তারা ডেমোক্র্যাট সমর্থক ভোটারদের ভোট দেওয়া আরও কঠিন করে তুলতে বিশেষ করে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোতে (আসনসীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে) কারসাজি করেছে। সমস্ত খাঁটি ফ্যাসিস্টের মতোই ট্রাম্প ও তার সমর্থক গোষ্ঠী আইনগতভাবেই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছলে-বলে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তা হতে পারে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ টুপিধারী, পতাকা-উড়ানো আর বুকে হাত রেখে মার্কিন সংবিধানের প্রতি আনুগত্য দেখানো দুর্বৃত্ত বাহিনীর সাহায্যে বা তা ছাড়াই।

এদিকে একদল কথিত ‘প্রগতিশীল’ সাংবাদিক ‘উদারপন্থি’ মিডিয়ার গুষ্টি উদ্ধার করে তাদের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রাম্পকে মস্কোতে তৈরি বেইমান হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে। আহারে, বেচারা ক্ষুব্ধ ফ্যাসিস্টরা! তারা যদি মনে করে যে এই লেখার লেখক আমিও ‘উদারপন্থিদের সবকিছু গেলা আহাম্মক’ তাহলে আমি আগেই দোষ স্বীকার করি। তবে আমার আরও অনেক কলামের পাশাপাশি জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ডোনাল্ড রামসফেল্ড সম্পর্কে লেখাগুলো এই উর্বর ‘অলস ভাবনা’কে খণ্ডনই করবে। তার পরও এই অসহনীয়, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ প্রগতিশীল সাংবাদিকদের ভেজাল গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী ট্রাম্পের একের পর এক সীমালঙ্ঘন এবং অবিবেচনাপ্রসূত কার্যকলাপ নাকি পূর্বসূরিদের অপরাধের তুলনায় কিছুই না। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়রা, তাকে আরেকটু সময় দিন। আরেকটুখানি সময়। কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে তোষামোদকারী পরিবেষ্টিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও চারটি বছর যাকে ঠেকানোর কোনো রাজনৈতিক বা মানবিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিকতার জন্যই নয়, মানব অস্তিত্বের জন্যও হবে হুমকি।

এটি কোনো অতিশয়োক্তি নয়। ট্রাম্প এবং তার কংগ্রেসের মিত্ররা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকিকে মিথ্যাচার মনে করেন। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে মাঝারি ও কষ্টকর হলেও যে অর্জনগুলো হয়েছে, আমার আশঙ্কা ট্রাম্প ক্ষমতায় এলেই তা অবিলম্বে বাতিল করে দেবেন। এ ব্যাপারে তার পেছনে থাকবে জীবাশ্ম-জ্বালানি-আসক্ত শিষ্যদের সমর্থন, যারা মনে করে শীতের তুষারই প্রমাণ যে পৃথিবী আসলে এত দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে না! ট্রাম্পের অস্বীকৃতি অনেক মানুষকে অনেকভাবে আহত করেছে। তিনি তথ্য অস্বীকার করেন। অস্বীকার করেন পরাজয়ের কথা। তিনি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল ভাইরাসের প্রাণঘাতী ক্ষমতা অস্বীকার করেন। মাস্ক পরার কার্যকারিতাও অস্বীকার করেন ট্রাম্প। নারীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করা, সঙ্গিনীদের মুখ বন্ধ করতে টাকা দেওয়া বা নিজের এক গর্বিত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী হওয়ার কথাও অস্বীকার করেন।

শেষে বলতে হয়, ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকেও অস্বীকার করেন। এটাই হতে পারে তার সব থেকে বিপর্যয়কর অস্বীকৃতি।

লেখক : কানাডার টরন্টোভিত্তিক আল-জাজিরার কলামনিস্ট। আল-জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ