ভারতে কৃষকদের বিজয়ের ডিসেম্বর

মানুন না মানুন কখনো কখনো জ্ঞানী মানুষের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। এই যেমন এখন মাও সে তুং-এর সেই অতি বিখ্যাত কাগুজে বাঘের তত্ত্ব আমাদের কৃষক আন্দোলনের বেলায় কেমন ঠিকঠাক খেটে গেল। অতি শক্তিধর আপাত পরাক্রমশালী বাঘ কেমন কাগুজে ব্যাঘ্র হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ল্যাজ গুটিয়ে পালাতে পারে তা কিন্তু সত্যিই ভারতের কৃষকরা নতুনভাবে প্রমাণ করে দিল। এর আগে বেশ কয়েকবার ভারতের কৃষক আন্দোলনের কথা লিখেছি। আর একবার লিখছি। এবার বিজয়ের কথা। জানি ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের বিজয়ের মাস। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মহান সাফল্যের উদযাপন ইতিমধ্যেই ঢাকা ও অন্যত্র শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো অত ব্যাপক লড়াইয়ের কাছে নিশ্চিত কোনোদিক দিয়েই আমাদের দেয়ালে পিঠ দিয়ে চোয়াল শক্ত করা দীর্ঘ আন্দোলনের কোনো তুলনা হবে না। রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন এক স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। আর আমাদের লড়াই সংবিধান বাঁচানোর। করপোরেট পুঁজির কাছে দেশকে বিক্রি করে দেওয়ার চক্রান্ত রোখার। এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি মদদে এদেশে নতুন যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আস্ফালন তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।

আজ যখন এ লেখা লিখছি তখনো বন্ধুরা অজস্র ভিডিও পাঠাচ্ছে। সিঙ্ঘু থেকে দলে দলে কিষাণ এক বছরের কিছু সময় ধরে মাটি কামড়ে থেকে মহামহিম নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বাধ্য করেছে সম্পূর্ণ দেশবিরোধী কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নিতে। আজ তারা যে যার ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ অমৃতসর, কেউ আবার তরনতারন, লুধিয়ানা, মেওয়াদ বা উত্তর প্রদেশের অখ্যাত কোনো গাঁয়ে। সার সার ট্রাক্টর একের পর এক টোল ট্যাক্সের গেট পার হচ্ছে আর আশপাশের গ্রামের লোকজন ছুটতে ছুটতে এসে ফুল ছড়িয়ে বরণ করছেন বিজয়ী বীরদের। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে পানিপথ, সোনপথ, কার্নাল। এ জল আনন্দের নিশ্চয়ই। কিছু ব্যথা, যন্ত্রণা, হাহাকার, বিলাপ তাও মিশে আছে ওই চোখের জলে। কখনো কেউ ভুলতে পারবে না যে দেশের সরকারের গোঁয়ার্তুমি আন্দোলনরত অন্তত সাতশো কৃষকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই সাতশো’র বেশি শহীদকেই মোদি সরকারের হার মানতে বাধ্য হয়ে পিছু হটার সাফল্যকে উৎসর্গ করেছেন আন্দোলনের নেতারা।

কত কত মুহূর্তের কথা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। রাতের অন্ধকারে কেন্দ্রীয় সরকার যখন কৃষকবিরোধী তিনটি আইন এনেছেন তখনো আমরা শহরের বাবু ভদ্দরলোকেরা সেভাবে জানিই না কী হতে চলেছে। ভাসা ভাসা চর্চা চলছে যে অত্যাবশ্যক জিনিসের মজুদ করার ওপর যে বিধিনিষেধ ছিল তা তুলে নেওয়া হয়েছে। চুক্তি চাষের ব্যবস্থা পাকাপাকিভাবে চালু করা হচ্ছে। মান্ডি ব্যবস্থা তুলে সরাসরি কৃষক যাতে করপোরেটকে বেচতে পারে তাও থাকছে নতুন আইনে। পাশাপাশি ফসলের ন্যায্য সহায়ক দাম পাওয়ার যে নিশ্চয়তা ছিল তাও নতুন আইনে বাতিল হতে চলেছে। আমরা এলিটরা বুঝিনি। কিন্তু

কৃষক সংগঠনের নেতারা আগেই আঁচ করেছিলেন এই আইন চালু হলে আগামী দিনে অন্ধকার নেমে আসবে। শুধু কৃষিক্ষেত্র নয়, বিপর্যস্ত হবে এদেশের খাদ্য সুরক্ষাও। সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সমাজ কাঠামোতেই এক বড়সড় বিপর্যয় আসতে চলেছে। এমনিতেই ভারতে একটা কথা ইদানীং খুব চলছে যে গণতন্ত্র নামেই, দেশ চালাচ্ছে দুষ্ট চতুষ্টয় বা গ্যাং অফ ফোর। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, আদানি ও আম্বানি এই চারজনের অঙ্গুলি হেলনে ভারত এক অন্ধকার পথের যাত্রী। এমন অর্থনৈতিক সংকট, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আগে কখনো ভারত দেখেনি। মোদি শাসনে কিছু সংখ্যক ধনী বিপুল ধনী হয়েছেন। নিঃস্ব পথের ভিখারি হয়েছে বিরাট সংখ্যক মানুষ। ঝাঁ চকচকে উন্নয়নের গালভরা বিজ্ঞাপনের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে দরিদ্র এক অন্য ভারত। সবচেয়ে সন্দেহজনক ছিল রাতের অন্ধকারে কৃষি আইন চালু করা ও প্রবল করোনাকালে আদানিকে হরিয়ানায় বিশাল পরিমাণে অত্যাধুনিক শস্য ভা-ার করার অনুমতি দেওয়ায়। মান্ডি রদের কথা বলে চাষের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে দেওয়া হচ্ছিল ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে। ফসল উৎপাদনে যা যা লাগে সেই সার, বীজ ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্যও চাষিকে করপোরেটের কাছে হাত পাততে বাধ্য করা হচ্ছিল এই নয়া আইনে। পুরো কৃষিব্যবস্থা তুলে দেওয়া হচ্ছিল শিল্পপতিদের হাতে। চুক্তি চাষ ও সরকারি চাষিদের কাছ থেকে শস্য কেনার ‘সুফল’ কতটা তা নিয়ে মোদিভক্ত ইন্টেলেকচুয়ালরা কয়েক হাজার শব্দে বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকশ প্রবন্ধ লিখেছেন। তাদের যুক্তি ছিল যে এর ফলে চাষিরা ফড়ে-দালাল-মহাজনের হাত থেকে রেহাই পাবে। যারা এটি বলছিলেন তারা একজন কেউই না জানেন ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি। জানেন না চুক্তির মধ্যে যে অজস্র ফাঁকফোকর আছে, রয়েছে একাধিক গোপন শর্ত সেসব কিচ্ছু না জেনেই তারা আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছিলেন। আমরা মধ্যবিত্ত লোকজন চিরকালের দোদুল্যমান সুবিধেবাদের কারণে অনেকেই একটু-আধটু ফাঁদে পড়ে বিশ্বাস করছিলাম প্রায়! কিন্তু কৃষকদের বোধ বেশি থাকায় এ যাত্রা ভারতের জনগণ বোধহয় বেঁচে গেলেন।

এসব প্রতিরোধে একাধিক কৃষক সংগঠন মিলে এক যুক্ত মোর্চা গড়ে তোলা হয়। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা। তারা গত বছর নভেম্বর মাসে দিল্লি অভিযানের ডাক দেয়। দিল্লিমুখী ওই মহামিছিল হরিয়ানা, রাজস্থান সংলগ্ন সীমান্ত লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় আটকে দেয় সরকার। নির্মম লাঠিচার্জ ও জলকামান দিয়ে ওই ঠান্ডায় সরকার দমন করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে কৃষক-জনতাকে। প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখেও শান্ত সংহত কৃষকরা সম্পূর্ণ অহিংস পথে ধরনায় বসেন সিঙ্ঘু, টিকরি, গাজীপুরে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বা স্টেট টেররিজম যে কোনো মাত্রায় যেতে পারে যারা খুব কাছ থেকে সিঙ্ঘু, টিকরি দেখেননি, হলফ করে বলতে পারি তা কল্পনা করাও মুশকিল। সিঙ্ঘু হয়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের গড়। ঘটনাচক্রে দিনের পর দিন ওই গড়ে থেকেছিলাম বলে দেখেছি তথাকথিত গণতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্য কঙ্কালটার চেহারা। জলকামান, লাঠিচার্জ তো ছিলই। টিয়ার গ্যাস থাকবেই। কিন্তু যেভাবে বহুদূর থেকে পুলিশি ব্যারিকেড গড়ে কৃষকদের সন্ত্রস্ত করে তোলা হয়েছিল তা অকল্পনীয়। এছাড়া মাঝেমধ্যে সংঘ সমর্থক হিংস্র বাহিনী চেষ্টা চালাচ্ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো নিরস্ত্র কৃষকদের ওপর হামলা করতে।

জানুয়ারি মাসে সিঙ্ঘু যাই। জন্ম থেকে তেভাগা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ি শুনে বড় হয়েছি। কোনোটাই দেখিনি। নকশালবাড়ি কিছুটা দেখলেও তা নিতান্তই ওপর ওপর। তখন বয়সেও ছোট। ফলে মনে হলো এবারের কৃষক সংগ্রাম দেখতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন কেউ নেই যারা ডকুমেন্টারি নিয়ে উৎসাহী হয়ে টাকা দেবে। আমি কাজটা করতে চাই শুনে আমার পাঞ্জাবের বন্ধুরা এগিয়ে এলেন। এখনো মনে আছে কনকনে ঠা-ার দুপুরে তরুণ সাংবাদিক মনপ্রীত হাত বাড়িয়ে বলে উঠেছিল, ওয়েলকাম টু ল্যান্ড অফ রেভলিউশন। সেদিন থেকে কত কত মুহূর্তের আমি সাক্ষী। রাস্তার ধারে যে ছোট হোটেলে ছিলাম, তার নাম আবার হোয়াইট হাউজ। ঘটনাচক্রে ওই হোটেল ছিল আন্দোলনের হেডকোয়ার্টার। কৃষক স্বেচ্ছাসেবকরা নিরাপত্তা দিতেন চব্বিশ ঘণ্টা। সবসময় হাসিমুখে। কমিটির শীর্ষ নেতারা জরুরি মিটিং করলে কখনো কখনো ডেকে নিতেন। সরকার প্রায়ই নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিত। তখন না ইন্টারনেট, না মোবাইল। কখনো শুনতাম পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী ঢুকছে সব তছনছ করে দিতে। বিশাল জায়গাজুড়ে শিবিরে শিবিরে নিমেষে পৌঁছে যেত সতর্কবার্তা।

এ আখ্যানের শেষ নেই। যেমন শেষ নেই সংগ্রামের। বলা ভালো এ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাও আপাতত। সমাপ্ত না বলে বিরতি বলাই বোধহয় ঠিক। যুদ্ধ কখনো শেষ হয়না। যুদ্ধের কথা দিয়ে এ লেখা শেষ করব না। এখন শয়নে স্বপনে মাঝেমধ্যে শুধুই সিঙ্ঘু। কত দৃশ্য মনে পড়ছে। একদিন, মনে আছে ছোট্ট এক মেয়ে দুই বিনুনি দোলাতে দোলাতে আমাকে খানিকটা জোর করে হোটেলের ছাদে নিয়ে গেল। তারপর আঙুল উঁচিয়ে আকাশ দেখাল। সন্ধ্যা তখনো নামেনি। ঝলমলে আকাশে বড় করে রামধনু উঠেছে। কত দিন বাদে রামধনু দেখলাম। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। হঠাৎ খেয়াল হলো বাচ্চাটা কোথায় চলে গেছে। যেন সাতরঙা আকাশ দেখাবে বলেই ও এসে পড়েছিল আচমকাই। সিঙ্ঘু আবার নিশ্চয়ই যাব। কিন্তু আমি জানি ওই রামধনু আর কখনো দেখতে পাব না।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

dastidarsoumitra786@gmail.com