দেশের সাধারণ অন্তঃসত্ত্বা নারীর তুলনায় করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মাতৃত্বকালীন জটিলতা আট গুণেরও বেশি। করোনায় আক্রান্ত ৮৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হয়। অথচ করোনা আক্রান্ত নন এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মাত্র ৬৮ শতাংশের সিজার করতে হয়। এমনকি করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বাদের ৪৬ শতাংশেরই মাতৃত্বজনিত বিরূপ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এই জরিপ প্রকাশ করা হয়।
জরিপ অনুযায়ী, করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রিটার্ম ডেলিভারি, অর্থাৎ ৩৭ সপ্তাহের আগে সন্তান প্রসব হয়েছে ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশের, মায়ের গর্ভে সন্তানের মৃত্যু হয়েছে ১৫ দশমিক ১৫ শতাংশের এবং অন্যত্র (জরায়ুর বাইরে) গর্ভধারণ হয়েছে ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বার।
জরিপে আরও দেখা যায়, করোনা আক্রান্ত নারীর আগে থেকে স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকলে সন্তান প্রসবকালীন করোনা আক্রান্ত নন এমন অন্তঃসত্ত্বার তুলনায় মাতৃত্ব বিকাশে ঝুঁকি অনেক বেশি। করোনা হয়নি এমন অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্ল্যানিং, মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ অপারেশনাল প্ল্যানের সহযোগিতায় রাজধানীর ৫টি হাসপাতালের ৮৯০ জন অন্তঃসত্ত্বার ওপর এ জরিপ করা হয়। গত এক বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই জরিপে করোনা নেগেটিভ ৬৭৫ জন এবং পজিটিভ ২১৫ জন অংশ নেন। জরিপে অংশ নেওয়াদের গড় বয়স ২৬ দশমিক ৩ বছর। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশের বয়স ২৪-৩৫ বছরের মধ্যে।
জরিপের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, করোনায় আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ৮৩ শতাংশের সিজার করতে হয়েছে। এ সময় সাধারণ নারীদের তুলনায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ঝুঁকি ছিল। তাদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নারীর মৃত্যু হয়। করোনায় আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ৯১ দশমিক ২ শতাংশের লক্ষণ ছিল। বাকি ৮ দশমিক ৪ শতাংশের কোনো লক্ষণ ছিল না। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশের জ¦রের লক্ষণ ছিল। ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশের কাশি, ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশের শ^াসকষ্ট, ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ কোনো স্বাদ পেতেন না। এ ছাড়া ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ গন্ধ পেতেন না ও ২৬ দশমিক ৫ শতাংশের মাথাব্যথার লক্ষণ ছিল।
এই পরিচালক বলেন, করোনা পজিটিভ মায়েদের ১ দশমিক ২ ভাগ শিশুকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) রাখতে হয়েছে। মৃত শিশু প্রসব, নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম, জন্মের সময় শ্বাসরোধ, ওজন কম বা নবজাতকের আইসিইউতে ভর্তির মতো অবস্থা ছিল ২৮ গুণ বেশি। আর করোনা আক্রান্ত গর্ভবতীদের মধ্যে প্রসবের পর ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ নারীর জটিলতা দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানে অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, ‘গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায় যে করোনাভাইরাসের সঙ্গে মাতৃত্বজনিত সমস্যার বিকাশের একটি যোগসূত্র আছে। সুতরাং অন্তঃসত্ত্বারা করোনা আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসার বিষয়ে আমাদের আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’