সার্চ কমিটির মাধ্যমেই আগামী নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের পথে হাঁটছে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজন শুরু হচ্ছে। আগামী সোমবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ দিন বিকেল ৪টায় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়েই এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। বঙ্গভবন ও জাপার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি স্বাধীন-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য-শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ২০ ডিসেম্বর সোমবার থেকে আলোচনায় বসছেন রাষ্ট্রপতি। প্রথম দিন জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিনের সংলাপে সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হয়ে আসছে বিগত সময়ে। গতবার বিএনপি ছিল সংসদের বিরোধী দল। তাই সেই সময় বিএনপিকে আগে ডাকা হয়েছিল। এবার জাতীয় পার্টি (জাপা) সংসদের বিরোধী দল হওয়ায় তাদের প্রথম আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। সব দলকেই ডাকা হবে।’
এদিকে ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের চিঠি পায়নি বিএনপি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপের আমন্ত্রণ আমরা পাইনি। আমন্ত্রণ পেলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব আমরা।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সংলাপের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর তা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে। পাশাপাশি সমমনা রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে বেশিরভাগ নেতাই রাষ্ট্রপতির সংলাপে যাওয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক। তারা মনে করেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ লোক দেখানো ও সংবিধানবিরোধী। এভাবে প্রতিবার সংবিধানবিরোধী সংলাপে অংশ নেওয়ার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া সবার মতামত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই হবে নতুন ইসি। তবে শেষ পর্যন্ত সংলাপে অংশ না নিলেও দলীয় অবস্থান তুলে ধরে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠাতে পারে বিএনপি। চিঠিতে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানানোর অনুরোধ করা হতে পারে।’
গত ২৩ নভেম্বর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘আমরা এমন সংলাপে যাব না। এই সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনেও যাব না।’
জাপা চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাইনি। আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে দলের মধ্যে আলোচনা করব।’
জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি পাইনি। তবে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে ২০ ডিসেম্বর বৈঠক হওয়ার বিষয়ে মেসেজ দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে দলীয়ভাবে আমরা বৈঠক করব, আলোচনার বিষয় এবং প্রস্তাবনাগুলো ঠিক করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতির এই আমন্ত্রণকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।’
বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, নতুন ইসি গঠনে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গেই রাষ্ট্রপতি আলোচনা করবেন। আলোচনা শেষে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। এতে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নিয়ন্ত্রকসহ (সিএজি) ২-৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক থাকবেন। প্রসঙ্গত, দেশে বর্তমানে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করা হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষে নতুন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠন হবে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে। সার্চ কমিটির বাছাই করা তালিকা থেকেই নতুন ইসি গঠন হবে। নতুন ইসির অধীনেই হবে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন। তবে গতবারের মতো এবারও আইন করে নতুন ইসি গঠনের দাবিতে সোচ্চার ছিল বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বিএনপি ইসি গঠনে বরাবরই বলে আসছে, তারা এভাবে গঠিত কমিশনের অধীনে নির্বাচন করবে না। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বঙ্গভবন থেকে বিএনপিকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং এ বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধান সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেবেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে ২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। তাদের মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেন নির্বাচন কমিশন। এরপর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে ২০১২ সালে চার সদস্যের পরিবর্তে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
২০১২ সালে নতুন ইসি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেন। ২২ জানুয়ারি গঠন করা হয় সার্চ কমিটি। সে সময় সার্চ কমিটির আহ্বানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা দিলেও বিএনপি দেয়নি। ২২ জানুয়ারি গঠনের পর ৭ ফেব্রুয়ারি ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছিল সার্চ কমিটি। তাদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ জমা দেয়, তাতে সিইসি ও চার কমিশনার নিয়ে পাঁচটি পদের জন্য ১০টি নাম আসে। তার মধ্য থেকেই পাঁচজনকে বেছে নেন রাষ্ট্রপতি।
কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি গঠনের আগে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সঙ্গে কমিশন গঠন নিয়ে সংলাপ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এক মাস ধরে ৩১টি দলের সঙ্গে চলা ওই সংলাপ ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি শেষ হয়। সার্চ কমিটি গঠন করার পর সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই কমিটির কাজের সাচিবিক দায়িত্বও থাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হাতে। সিইসি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন এ কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।
সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির হাতে। গেল এক দশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ২০১২ সালে এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৭ সালে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে সর্বশেষ দুই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছিলেন।
এদিকে ইসি সদস্যদের নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও তা হয়নি। ইসি গঠনের আগে আগেই আইনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এবারও রাজনৈতিক দলগুলো ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা ইসি গঠনে আইনের দাবি তোলেন। সরকারপক্ষও আইনের পক্ষে মত দেয়। তবে এবার সময় স্বল্পতার কারণে আগের পথেই হাঁটার পক্ষে অবস্থান নেয় সরকারপক্ষ। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এই আইন উত্থাপনের কথা আমি বলেছি গত অধিবেশনে। পরবর্তী ইসি গঠনের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এবার সার্চ কমিটির মাধ্যমেই ইসি হবে।’