আজ আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অর্থাৎ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় এই দেশ অর্থনৈতিকভাবে ছিল বিপর্যস্ত। তবে যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের সব কিছু যখন বিপর্যস্ত থাকে তখন এর একটা ভালো দিকও থাকে যেটি অর্থসম্পদ ও ভৌত কাঠামো থেকে বেশি বড় সম্পদ হতে পারে। সেটি মানুষের মধ্যে একতা, নতুন করে দেশগড়ার প্রচন্ড স্পৃহা, ইচ্ছা আর বাসনা। সেজন্যই বিশ্ব ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় বিশ্বের অনেক দেশই এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উন্নত হয়েছে। আমাদেরও তাক লাগানো একতা ছিল, অবিস্মরণীয় মেধাবী নেতা ছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষদের জন্য শিক্ষার কথা ভাবা একটু বিলাসিতা মনে হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই একজন যোগ্য মানুষকে দিয়ে সেই কমিশন গঠন করেছিলেন। তাই আমরা স্বাধীনতার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে একটি যুগান্তকারী শিক্ষানীতি পেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য হলো সেই শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ হয়নি। কারণ ১৯৭৪ সালে যখন এই শিক্ষানীতি সংসদে পাস হয় তার পরের বছরই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয় সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি আর কখনোই সেই শিক্ষানীতিকে ধারণ করেনি।
বঙ্গবন্ধু সরকারের পরও একের পর এক সরকার এসেছে এবং প্রায় প্রতিটি সরকার নিয়ম করে কোনো না কোনো শিক্ষাবিদের নেতৃত্বে একটি করে শিক্ষা কমিশন করেছে। ১৯৮৩ সালে মজিদ খান কমিশন হয়। ১৯৮৮ সালের মফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে কমিশন গঠিত হয়। তারপর আবার ১৯৯৭ সালে অধ্যাপক এম শামসুল হককে প্রধান করে যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি করা হয়, তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি ২০০০ সালে সংসদে গৃহীতও হয়। আবার ২০০২ সালে ড. এম এ বারীকে প্রধান করে নতুন কমিশন গঠন করা হয়। সেটিকে বাদ দিয়ে একই সরকার আবার ২০০৩ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞাকে প্রধান করে নতুন আরেকটি কমিশন গঠন করে। তারপর সর্বশেষ ২০০৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে প্রধান করে জাতীয় শিক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিশন ১৯৭৪ সালের শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন ও ২০০০ সালের শিক্ষানীতিকে ভিত্তি ধরে নতুন একটি শিক্ষানীতি তৈরি করে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে শিক্ষানীতি হিসেবে গৃহীত হয় এবং এটিই হলো বর্তমান সরকারের ঘোষিত শিক্ষানীতি। কিন্তু দুঃখের কথা হলো ঘোষিত শিক্ষানীতির ভিত্তিতে আমাদের শিক্ষা চলছে না।
এটি এক আশ্চর্য ব্যাপার যে, আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই তাদের প্রণীত শিক্ষানীতি মেনে চলেনি। ক্ষমতায় এসে নিজের একটা শিক্ষানীতি তৈরি করা যেন একটা ফ্যাশন। কিন্তু নীতি থাকে ডিপ ফ্রিজে যা কখনো ডিফ্রস্ট করে আলোর মুখ দেখেনি। আসল বিষয়টা কী? সরকার শিক্ষা কমিশন করে যার নেতৃত্বে থাকে শিক্ষক আর সেটি বাস্তবায়নে যারা থাকে তারা হলো আমলা। আমলারা কখনোই বিশেষজ্ঞদের কথামতো চলেনি। এইখানে যেন ইগো এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এইটা একটা সুপেরিয়রিটি-ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্সের দোলাচল। সঠিক এবং প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকলে সেই বাধা থাকার কথা না।
শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন আমাদের সরকারগুলোর অগ্রাধিকার তালিকায় না থাকায়, এ বিষয়ে যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকার কারণেই এমনটা হয়েছে। তাই স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও উন্নয়নের ভুল সংজ্ঞা ধারণ করে ভুল উন্নয়নের পথে হাঁটছি। আমরা উন্নয়ন বলতে অবকাঠামো উন্নয়নের মেগা প্রজেক্ট বুঝি। ফলে চারদিকে কেবল খোলা জায়গায় বা বনজঙ্গল কিংবা ফসলি জমির ওপর ভবন ও নানা কাঠামো নির্মাণ করে চলছি। অথচ উন্নয়নের মূল হলো, উন্নয়ন যারা করবে সেই মানুষের মননের উন্নয়ন, জ্ঞানের উন্নয়ন। সেদিকে আমরা কখনোই নজর দিইনি। মানসম্মত শিক্ষাই হলো একটি জাতি গঠনের ভিত্তি। মানুষ তৈরি করতে পারলে তখন সেই মানুষরাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত দেশ বানাবে। কীভাবে বুঝবেন যে দেশ আসলে উন্নত হয়নি? মানসম্মত শিক্ষার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে, উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একবারে তলানিতে, নলেজ ইনডেক্সের র্যাকিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও তলানিতে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২.৮ শতাংশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার শিক্ষার মান যথাক্রমে ২০.৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের শিক্ষার মান ১১.৩ শতাংশ! আমরা পারিনি, কারণ সমাজের উন্নয়নের ইউনিট হলো সেই সমাজের মানুষ। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই মানুষদের সুশিক্ষিত করা যাবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশ সুশৃঙ্খল ও উন্নত হবে না।
তাহলে শিক্ষাকে কীভাবে উন্নত করা যায়? প্রথমত একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি লাগবে। দ্বিতীয়ত শিক্ষায় জিডিপির ন্যূনতম ৫.৫ শতাংশ বরাদ্দ লাগবে। অথচ আমরা গত ৫০ বছর যাবৎ শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ১.৮ থেকে ২.১ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে আসছি। শিক্ষা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝেছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। বুঝেছিল বলেই স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর অন্তত ১০৬৯ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল, যার মধ্যে ৯৯১ জনই ছিলেন শিক্ষক। অর্থাৎ তারা বুঝেছিল কীভাবে একটি দেশের কোমর ভেঙে দেওয়া যায়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা শিক্ষকের মূল্য বুঝিনি। বুঝিনি বলেই আজও আমাদের ছোট ছোট সোনামণিদের স্কুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা দিই। বুঝিনি বলেই বাংলাদেশের শিক্ষকরা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম বেতন পায়। অথচ আমরা বলি, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। এখন শিক্ষকদের মেরুদন্ড ভেঙে জাতির মেরুদন্ড কীভাবে বানাবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরুন। গত পঞ্চাশ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ক্রমাগতভাবে কেবলই নেমেছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী এই রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা কীভাবে থাকে, কোথায় থাকে, শ্রেণিকক্ষ কেমন, অফিস কক্ষ কেমন একবার দেখুন।
একটি দেশে শিক্ষার কয়টা ধারা থাকতে পারে? আমাদের দেশে আছে মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা, বাংলা মাধ্যম শিক্ষা। আবার বাংলাকে ইংরেজি বানিয়ে ইংরেজি ভার্সন শিক্ষা। বর্তমানে উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা সবাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হলো ছেলেমেয়েদের এক্সপোর্ট কোয়ালিটি হিসেবে গড়ে তোলা যেন একসময় তারা বিদেশে পড়তে গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারে। পৃথিবীতে এমন একটি দেশের উদাহরণ দিতে পারবেন যেই দেশ ভিনদেশি ভাষায় পড়াশুনা করে উন্নত হয়েছে? একটিও পাবেন না। আমরা শুধু শিক্ষার বিভিন্ন মাধ্যমই তৈরি করিনি। একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনও তৈরি করেছি। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েদের জন্য কোনো মিলনস্থল রাখিনি যেখানে তারা আবার একত্রিত হয়ে একে অপরকে জানার সুযোগ পাবে। এইরকম বিভাজিত সমাজ কীভাবে উন্নত হবে?
সরকার এখন আবার নতুন আরেক সমস্যা যোগ করছে। ২০২৩ সালের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শিক্ষাক্রম তৈরি করেছে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে যে বিষয় কারিগরি বোর্ডে পড়ানোর কথা তা এখন থেকে মূলধারার শিক্ষা মানে বাংলা মাধ্যমে পড়িয়ে বাংলা মাধ্যমকে একটু কারিগরি মাধ্যমের দিকে নামিয়ে আনা হয়েছে। বিজ্ঞান একটি বিশেষায়িত বিষয়। এটা পড়তে হলে স্কুল থেকেই তাদের তৈরি করতে হয়। সেই তৈরির অংশ হিসেবেই বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গণিত পড়তে হতো। সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীবনবিজ্ঞানকে আলাদা বিষয় হিসেবে পড়ানো হতো। কিন্তু নতুন এই শিক্ষাক্রমে আগে যারা আর্টস এবং কমার্স পড়ত তাদের সুবিধার জন্য উচ্চতর গণিত একদম বাদ দেওয়া হলো। আর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীবনবিজ্ঞানকে একত্রিত করে বিজ্ঞান নামক একটি বিষয় পড়ানো হবে। এতে আগের নিয়মে যারা আর্টস নিয়ে যা শিখত নতুন কারিকুলামে তারা একটু বিজ্ঞান এবং একটু গণিত পড়বে। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আগের নিয়মে বিজ্ঞানের ছাত্ররা যা শিখত প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে তারা বিজ্ঞান অনেক কম শিখবে। বিনিময়ে তারা নতুন শিখবে জীবন ও জীবিকা। অন্যদিকে প্রযুক্তি নামক বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল যে এইটা এখন ক্লাস সিক্স থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতে পড়ানো হবে। আগে বিজ্ঞান না শিখে কেউ কি প্রযুক্তিবিদ হতে পারবে? পৃথিবীতে এমন আরেকটি দেশ দেখান তো যেখানে প্রযুক্তিকে এই রকমভাবে স্কুলের কারিকুলামের অংশ বানিয়েছে?
এই কারিকুলাম চালু হলে আজ থেকে ১০ বছর পরে সবাই বুঝতে পারবেন কী বোকামিটাই না আমরা করে ফেলেছি! ঠিক যেমন পিইসি জেএসসি ইত্যাদি চালু করে কুফল বুঝতে পেরে এখন বাদ দেওয়ার চিন্তা করছি। সৃজনশীল শিক্ষাক্রম চালু করতে গিয়ে আমরা যা করেছি তার কুফলও এখন বুঝতে পারছি। এর ক্ষতিটা কতটা সুদূরপ্রসারী হবে তা আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি। প্রযুক্তি আগে না বিজ্ঞান আগে এটা বোঝার ক্ষমতা যে জাতির নেই সেই জাতির আরও অধঃপতন কেবল সময়ের ব্যাপার।
শুধুই কি কারিকুলাম পরিবর্তন করা হচ্ছে? পরীক্ষার ব্যবস্থাও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এখন থেকে নাকি স্কুল কলেজেই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। ঠিক যেমন সৃজনশীল শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে সৃজনশীল প্রশ্নের অবতারণা করে ডিসাস্টার এনেছি তেমনি মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন না করে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার ফলে শিক্ষকরা এলাকার রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তাদের আরও বেশি করে চাপের মুখে পড়বেন। শিক্ষকদের ব্যবহার করে সমাজকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করার একটা পাঁয়তারা। এমনিতেই এসএসসি ও এইচএসসি ল্যাব পরীক্ষার মূল্যায়ন স্কুল কলেজের হাতে দিয়ে কী লাভ হয়েছে? ওগুলোর কি সঠিক মূল্যায়ন হয়? আমরা কি এইসব জানি না? জেনেশুনে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পথে কেন গেলাম? কারণ এতে সবাই মোটামুটি শতভাগ নম্বর পাবে। কেউ নেতা-নেত্রীদের প্রভাব খাটিয়ে ভালো নম্বর পাবে আর কেউ শিক্ষক কর্মচারীদের টাকা-পয়সা দিয়ে ভালো নম্বর পাবে। সত্যিকারের মূল্যায়ন হবে না। শুধু শুধু মানুষকে আরও বেশি করে খারাপ কাজ করাতে বাধ্য করে সমাজকে আরও কলুষিত করা হবে। সবাই যদি ভালো করে এর নাম কি পরীক্ষা বলা যায়?
সবার শেষে শুধু বলতে চাই আমাদের উচিত শিক্ষা নিয়ে আরও ভেবে, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষকদের যথোপযুক্ত মূল্যায়ন দিয়ে শিক্ষার মানের উন্নতি ঘটিয়ে দেশকে সত্যিকারের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্রত নেওয়া। উন্নত করুন। দেখবেন দেশ তখন আপনা-আপনি সুন্দর হয়ে যাবে। প্রতিটি মানুষ হলো উন্নত রাষ্ট্রের ইউনিট। সবাই মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বসবৎমবহঃ নবযধারড়ৎ হিসেবে উন্নত সংস্কৃতির দেশ তৈরি হবে।
লেখক : অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়