আন্তঃসম্প্রদায় ও সম্প্রীতির সমন্বয়ই সুফিতত্ত্ব

আজ ১৭ ডিসেম্বর সুফি সম্রাট মওলানা জালালুদ্দিন রুমির ৭৪৮তম প্রয়াণ দিবস। জালালুদ্দিন রুমি ৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের উত্তর সীমানায় অবস্থিত বল্খ নগরে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও ধর্মতত্ত্ববিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বাহাউদ্দিন ওলদ ও মাতার নাম মোমিনা খাতুন। মওলানা পিতার দিক থেকে হজরত আবু বকরের (রা.) ও মাতার দিক থেকে হজরত আলির (রা.) বংশধর ছিলেন। বাহাউদ্দিন ওলদ অত্যন্ত জ্ঞানী লোক ছিলেন। তাকে সুলতানুল ওলামা বলা হতো। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ, সুফি এবং অতীন্দ্রিয়বাদী, যার ছিল অদম্য সাহস, সাধুতা, অন্তরের মহত্ত্ব এবং খোদার প্রতি দার্শনিক বা মৌল অভিগমনের পরিবর্তে সরাসরি আধ্যাত্মিকভাবে সমীপবর্তী হওয়ার বাসনা। পিতার এই বৈশিষ্ট্যতায় রুমি ভীষণভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

রুমি যে যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন অটোমান সাম্রাজ্য ভেতরে খ্রিস্টান আক্রমণকারীদের এবং বাইরে থেকে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত ছিল। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোড়ন রুমিকে তরুণ বয়স থেকে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার দ্বারা দহন করছিল। ধর্মীয় বিরুদ্ধবাদীদের বিরোধিতা ও সম্ভাব্য মোঙ্গল আক্রমণের আশঙ্কায় বাহাউদ্দিন ওলদ ১২১৯ খ্রিস্টাব্দে বল্খ ত্যাগ করেন। পথে নিশাপুরে বালক জালালুদ্দিনের সঙ্গে মহাতাপস শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তারের (১১৪৫-১২২০) দেখা হয় এবং তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ভবিষ্যতে বালক জালালুদ্দিন একজন মহাজ্ঞানীতে পরিণত হবেন। আত্তার রুমি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ‘এই বালকটি খোদাপ্রেমের অন্তরে একটি দ্বার উদঘাটন করবে’। রুমিও কখনো আত্তারকে ভুলতে পারেননি, রুমি আত্তার সম্পর্কে বলেছেন ‘আত্তার ভালোবাসার সাতটা নগরই ভ্রমণ করেছেন আর আমি এখনো একটি গলির প্রান্তে পড়ে আছি।’ দামেস্কে সে যুগের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবির  (১১৬৫-১২৪০) সঙ্গে রুমির দেখা হয়। শোনা যায় ইবনুল আরাবি যখন রুমিকে তার পিতার পেছনে হাঁটতে দেখেন তখন বলেছিলেন ‘খোদার কী মহিমা, একটি হ্রদের পেছনে এক সমুদ্র যাচ্ছে।’ ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে তার সঙ্গে মওলানা শামস তাবরেজির সাক্ষাৎ হয়। বলা হয়ে থাকে মৌলবি (জালালুদ্দিন) কখনো তুরস্কের মৌলা হতে পারেননি যতদিন তিনি শামস তাবরেজির গোলাম না হয়েছিলেন। ১২৭৩ খ্রিস্টব্দের ১৭ ডিসেম্বর রুমি কুনিয়াতে পরলোকগমন করেন। তার জানাজার সময় মুসলমানদের সঙ্গে বহু খ্রিস্টান, ইহুদি ও অগ্নি উপাসক উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই তাকে বন্ধু মনে করতেন। সর্বজনীন প্রেমই ছিল মওলানার মূলনীতি। তিনি বলতেন তিয়াত্তর ফেরকার প্রত্যেকটিকেই আমি আমার সুহৃদ মনে করি।

বিশ্ব সংস্কৃতিতে রুমির অবদান অসামান্য। তার ঐশী প্রেমের শিক্ষায় মানুষ যদি শিক্ষিত হয়ে ওঠে, তাহলে আজকের এই সমস্যাতাড়িত, সন্ত্রাসকবলিত, শতধা বিচ্ছিন্ন মানবজাতি অখন্ড ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে, পৃথিবী যুদ্ধের আশঙ্কামুক্ত একটি শান্তির নীড়ে পরিণত হতে পারে। সম্ভবত এসব কিছু বিবেচনা করেই আজকের বিশ্ব, বিশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত পাশ্চাত্য দুনিয়া, রুমির লেখার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য পাগলপারা হয়ে উঠছে। এরই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ইউনেস্কো কর্তৃক ২০০৭ সালকে ‘রুমি বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় । ঘোষণায় বলা হয়, আল্লাহ ও রাসুল (সা.) যেমন কেবল মুসলমানদের বা আরবের নয়, ঠিক তেমনি রুমিও কেবল মুসলমানদের, পারস্যের বা তুরস্কের নন, তিনি সবার, সমস্ত পৃথিবীর মানুষের।

তিনি সম্ভবত ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে তার মসনবি লেখা ধরেন। ১২৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মসনবির দ্বিতীয় খন্ড লেখা আরম্ভ করেন। তিনি লিখেন : মসনবির [দ্বিতীয়] খন্ড লিখতে দেরি হয়ে গেল। কেননা রক্ত দুধে পরিণত হতে সাময়িক বিরামের প্রয়োজন আছে। মসনবির ছয়টি খন্ড রয়েছে। এ ছয়টি খন্ডেই তিনি প্রেমের জয়গান গেয়েছেন। এগুলোতে বয়েতের সংখ্যা প্রায় ছাব্বিশ হাজার এবং ছোট বড় কাহিনীর সংখ্যা ৪২১-এর ওপর। মসনবি লিখতে মওলানা সাহেবের প্রায় ১৫ বছর সময় লাগে। সারা বিশ্বে মুসলমানরা তিনটি গ্রন্থের পেছনে শরিফ শব্দটি যোগ করেন। শরিফ শব্দের অর্থ মহান। এ তিনটি গ্রন্থ হলো (১) কোরআন শরিফ (২) হাদিস শরীফ ও (৩) মসনবি শরিফ।

মওলানা রুমির রচনাবলির মধ্যে মসনবি শরিফই তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। প্রফেসর ডক্টর আর. এ. নিকলসনের মতে ‘মওলানা জালালুদ্দিন রুমি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুফি কবি’। সুফিবাদ বিশেষজ্ঞ এ. জে আরবেরিও একই মত পোষণ করেন। মওলানার মসনবি শরিফকে একটি মহাসমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়, চার শতাধিক ছোট-বড় নীতি কাহিনী মারফত তিনি তার ভাব প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীতে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভাষা নেই যেটাতে পুরো মসনবি শরিফ বা তার অংশবিশেষ অনূদিত হয়নি। এই মহাগ্রন্থ ইংরেজি সাহিত্য, ফরাসি সাহিত্য, জার্মান সাহিত্য, উর্দু সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যকে যুগ যুগ ধরে নানাভাবে প্রভাবান্বিত করে আসছে। উর্দু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ডক্টর ইকবাল স্বীকার করেছেন যে তিনি মওলানা জালালুদ্দিন রুমির ভাবশিষ্য ছিলেন। বাংলার বৈষ্ণব কবিরা, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং আধুনিক কবিদের অনেকেই তার ভাবধারা অবলম্বন করে কবিতা লিখেছেন। বৈষ্ণব কবি চন্ডী দাসের প্রসিদ্ধ চরণ ‘শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’, ‘বিদ্যাপতি (১৩৫২-১৪৪৮)’র ‘কত চতুরানন মরি মরি যাওত, নতুয়া আদি অবসানা, তোহে জনমি পুনঃ তোহে সমাওত সাগর লহরী সমানা।’ মওলানা রুমির ওপর হার্ভার্ড (Harvard) বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রফেসর জার্মান মহিলা অ্যানি শিমেল সাক্ষ্য দিচ্ছেন : ‘Shortly before 1500, even Hindu Brahmins in Bengal recited the Mathnavi (I am Wind, you are Fire, by Anne Maries Schimmel) অর্থ : পঞ্চদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এমনকি বাংলাদেশের হিন্দু ব্রাহ্মণরাও উচ্চকণ্ঠে মসনবি আবৃত্তি করতেন।

রুমি একাধারে বিশ্ববিখ্যাত কবি, দার্শনিক ও সুফি। পবিত্র কুরআন ও হাদিস ছাড়া তার চিন্তাদর্শন ও কাব্যের ওপর ইমাম গাযযালি (১০৫৮-১১১১), ইবনুল আরাবি ও সানাঈ-এর বিপুল প্রভাব ছিল। ফরিদউদ্দিন আত্তার, বিশেষ করে শামসে তাবরিজির প্রভাব তার সুফি সাধনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে দর্শনে যেমন ইবনুল আরাবির প্রভাব সুফি পথপরিক্রমায়, তেমনি তার ওপর শামসের প্রভাব ছিল যুগান্তকারী ও অনেকটা সিদ্ধান্তকর। তবে মনে রাখতে হবে রুমি একজন বদ্ধ অনুকরণকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সৃষ্টিশীল অনুসারী। ফলে তার লেখায় তিনি ইবনুল আরাবির চিন্তা-দর্শন ও শামসের অধ্যাত্মবাদী মরমি চেতনা ও পথপরিক্রমায় বিস্তার ঘটান, বিকাশ সাধন করেন এবং নবরূপে তাদের নিজস্ব ভাবনারাজি ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সমন্বিত করেন। যে জন্য পরবর্তী সময়ে কেবল ইসলামি জগতে নয় বরং সমস্ত মানবজাতির বিশ্বঐতিহ্য নির্মাণে রুমিকে একজন দক্ষ কারিগর হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

সুফি সাধনা হলো নিজের আত্মাকে কলুষতামুক্ত করে এর স্বচ্ছ শার্সিতে স্বর্গজাত রুহের প্রতিফলন নিশ্চিত করে পরমাত্মার সঙ্গে সম্মিলন ও সাক্ষাৎ লাভের আকাক্সক্ষায় বিভোর হওয়া। বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বলেছেন, ‘মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কলব বা হৃদয়।’ কলবকে কলুষমুক্ত করে, স্বর্গজাত রুহের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগসূত্র বজায় রেখে পরমাত্মার মহব্বত বা এশক বা প্রেমলাভ করা সম্ভব। আল্লাহর জিকিরে, সুতীক্ষ্ম স্মরণে, গভীর ধ্যানে বা চিন্তা-চেতনায় কলব কলুষমুক্ত হয়, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকির বা স্মরণের মাধ্যমে কলবকে কলুষমুক্ত করে প্রেমময়ের প্রেমার্জন সুফির নিত্যসাধনা। একজন সুফির নিত্য প্রার্থনা প্রেমময়ের কাছে ‘ইয়া মুকাললিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দিনিক’। বস্তুত আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো সুফি দর্শনের মর্মকথা যেমনটি হযরত ইমাম গাযযালি (রহ.) বলেছেন, ‘মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফিবাদ।’

চলমান বিশ্ব জীবনধারায় নানান জটিলতা ও জাগতিক সমস্যা সঙ্কুলতায় দ্বিধাদ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে সুফি সাধনার প্রাগ্রসরমান চর্চার প্রয়োজনীয়তা আজ অনস্বীকার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিক, নৈসর্গিক ও আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ একটি উদার মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আবহমান কাল থেকেই এদেশের মানুষ ধর্মভীরু। সুদূর অতীত থেকে এতদঞ্চলে খ্যাতিমান অলি-আউলিয়া, সুফি-সাধক আর গাউস-কুতুবদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটেছে। নির্মোহ, নির্লোভ, নিঃস্বার্থ, নিরহংকারী আর অন্যের জন্য নিবেদিত ও সৃষ্টির সেবায় জীবন উৎসর্গকারী এসব সুফি, পীর ও দরবেশদের পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও সহজ-সরল জীবনযাপন এতদঞ্চলের জনমানুষকে শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রতি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করেছিল। সুফি-সাধকদের কোমল ব্যবহার, তাদের অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য, ব্যক্তিত্বের জাদুময়তা আর অনন্য সাধারণ অলৌকিকত্বই এদেশে ইসলামের ভিতকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। আর তাদের প্রভাবেই ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা যুগ-যুগ ধরে বাস্তব জীবনে অলি-সুফিদের প্রভাবে প্রেমময় ইসলামের সুফিবাদী ভাবধারাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয়ে ধারণ ও লালন করে আসছে।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান