স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন হচ্ছে যখন দেশজুড়ে, ঠিক তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এক বীর মুক্তিযোদ্ধা মিথ্যা মামলায় কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নাম মো. ছাত্তার মিয়া (৭৮)। বকেয়া ভাড়ার মামলায় ১৫ দিন ধরে কারাবন্দি তিনি। অন্যদিকে বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ স্বামীর মুক্তির প্রহর গুনছেন ছাত্তার মিয়ার স্ত্রী হনুফা বেগম। বাবা জেলে আটকা থাকায় সন্তানদের নাওয়া-খাওয়াও প্রায় বন্ধ। পরিবারের দাবি, একটি ভূমিদস্যু চক্র মিথ্যা মামলা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ওই মুক্তিযোদ্ধার কারামুক্তি এবং বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে তার পরিবারের সদস্য এবং আখাউড়ার ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সই করা একটি আবেদন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে দেওয়া হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর ওই আবেদন জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়ার মুক্তির জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা মো. ছাত্তার মিয়া আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজের নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন। তার বসবাসের কোনো জায়গা ছিল না। প্রায় ৩৫ বছর আগে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা এ এম মো. ইছহাক (বীরপ্রতীক) মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়াকে কলেজের পূর্বপাশে কলেজের মালিকানাধীন ৫ শতক জায়গা দেন। তিনি সেই জায়গায় ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। ১০-১২ বছর আগে হঠাৎ করে রাধানগরের প্রয়াত দুবরাজ ভূঁইয়ার ছেলে মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক ভে-ার ওই জায়গা নিজের বলে দাবি করেন। রফিকের ভাষ্য, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার তার ওই জায়গায় ভাড়া থাকে। পরে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়ার কাছে কথিত ২ লাখ ২৩ হাজার টাকা বকেয়া বাড়িভাড়ার দাবিতে গত ১৭ অক্টোবর তাকে ও তার দুই ছেলেকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন রফিক ভেন্ডার। ওই মামলায় গত ২ ডিসেম্বর আদালতে হাজিরা দিতে গেলে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়াকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। এরপর গত ৯ ডিসেম্বর তার জামিনের জন্য আইনজীবীরা আবেদন করলেও তা না-মঞ্জুর হয়।
মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়ার স্ত্রী হনুফা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রফিকুল মিথ্যা মামলা সাজাইয়া আমার স্বামীকে জেলহাজতে পাঠাইছে। আমার স্বামী অসুস্থ। আমরা সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
এ প্রসঙ্গে আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ জামসেদ শাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি ভূমিদস্যু চক্র জাল কাগজপত্র করে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধা কারাগারে আছেন, এতে আমি খুবই মর্মাহত। সুষ্ঠু তদন্ত করে আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’
মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়ার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে তার প্রমাণ মেলে আখাউড়া শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আবু জামালের বক্তব্যেও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ছাত্তার মিয়া কলেজের জায়গায় বসবাস করছেন। তাকে ভাড়াটিয়া বলে রফিকুল ইসলাশ যে দাবি করছেন তা সঠিক নয়।’
মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ক্রয়সূত্রে (কেনা) তিনি ওই তিন শতক জমির মালিক। তিনি বলেন, ‘লিখিত চুক্তিপত্রে ছাত্তার মিয়া আমার ভাড়াটিয়া। বছরখানেক ঠিকমতো ভাড়া দিয়েছে। কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে দেব-দিচ্ছি করে টালবাহানা করে ভাড়া দেয় না। তাই আমি আদালতে মামলা করেছি।’
মিথ্যা মামলায় মুক্তিযোদ্ধার কারাগারে থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রশাসক রুমানা আক্তার বলেন, ‘বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধা জেলে আছেন, এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি তার মুক্তির ব্যাপারে আইনগতভাবে সহযোগিতা করব।’