নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি করার জন্য নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আসন্ন সংলাপে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেয়নি রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সংলাপে অংশ না নেওয়ার পক্ষেই তাদের অবস্থান। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে ওই নেতারা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সংলাপে অংশ নেওয়ার কোনো মানেই হয় না। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসির মেয়াদ শেষ হবে। তার আগে নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবেন আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে বসার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত ৩৯টি দলের অন্যদেরও ডাকা হবে। জানুয়ারি মাসের মধ্যেই এই সংলাপ শেষ করতে চান রাষ্ট্রপতি। সংলাপে অংশ নিতে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
সংলাপে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল দলটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা প্রবাদ আছে। সেটা হলোÑন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। বারবার যায় না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চিঠি দিলেও বিএনপির সংলাপে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার দেশের জনগণের সঙ্গে অনেক প্রতারণা করেছে। নতুন করে আর প্রতারণা করার প্রয়োজন কী? দেশের মানুষকে এত বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। জনগণ আর সরকারের প্রতারণার ফাঁদে পা দেবে না।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একাধিক নির্বাচনে আমরা অংশ নিয়েছি। কিন্তু আওয়ামী লীগের স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকার প্রথমে জনগণের রায় পরিবর্তন করেছে। এখন তাদের ভোট দিতে দিচ্ছে না। তাই জনগণ ভোট দিতে আগ্রহী নয়। জনগণকে ভোটের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হলে নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার নিরপেক্ষ ইসি গঠন করবে। তারপর ভোট দিতে হবে।’
সংলাপে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংলাপের আমন্ত্রণপত্র পাইনি আমরা। আমন্ত্রণ পেলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব আমরা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সব কমিশনার বিএনপির পরামর্শে নিয়োগ দিলেও কিছু যায় আসে না। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন মিলেমিশে দিনের ভোট আগের রাতে করেছে। আগামীতেও তাই হবে। ইসিতে কে থাকল, না থাকল তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে তার সরকারের অধীনে আগামীতে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। নির্বাচনকালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার হলেই কেবল তারা নির্বাচনে যাবে। কারণ নির্বাচনের সময় ইসির কোনো ভূমিকা থাকবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন মিলেমিশে নির্বাচন করে দেবে।
বর্তমান ইসি দায়িত্ব পালন করছে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। এই কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আহ্বানে অনুষ্ঠিত সংলাপে যোগ দিয়েছিল বিএনপি। এর আগে ২০১২ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় রকিবুদ্দিন কমিশন। এই কমিশন গঠনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের আহ্বানে অনুষ্ঠিত সংলাপে যোগ দিলেও এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে যাওয়া এবং নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বিষয়ে গত ২৩ নভেম্বর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আমরা এমন সংলাপে যাব না। এই সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনেও যাব না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু আমাদের কোনো দাবি মানেনি সরকার। তাই এবার সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেব না। এমনকি নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনায়ও অংশ নেব না।’