ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থীসহ দুজনকে গুলি করে হত্যা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বাদল সরকার (২৫)। আর গতকাল শনিবার হাসপাতালে মারা যান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের ছেলে ও আসন্ন ষষ্ঠধাপের ইউপি ভোটে প্রার্থী হতে চাওয়া এরশাদুল হক (৩৬)।

এদিকে গতকাল পাবনায় নৌকার সমর্থকদের হামলায় একজন নিহত হয়েছে। নিয়ে এ বছর ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ৬৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেল।

এদিকে গতকাল পাবনা ও ঝিনাইদহে সহিংসতায় অন্ত ১০ জন আহত হয়েছেন। ওই দুই ঘটনায় বাড়িঘরসহ ভাঙচুর করা হয়েছে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল।

পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন হত্যা মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে ইউনিয়নের কোলাদী গ্রামের চারা বটতলা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানে খবরে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুইজনকে গুলি করে হত্যা : নাটঘর ইউনিয়নের আসন্ন নির্বাচনে চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের ছেলে এরশাদুল হক, স্থানীয় আবু নাসেরসহ কয়েকজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলেন। আবু নাসের গোষ্ঠীর লোকজনের সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের গোষ্ঠীর বিরোধ দীর্ঘদিনের।

গত শুক্রবার রাতে সহযোগী বাদল সরকারকে নিয়ে নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর বাজারের পাশে ওয়াজ মাহফিলে যান এরশাদুল হক। এ সময় তার সঙ্গে ভাই আকতারুজ্জামান, চাচাতো ভাই ওবায়দুলসহ বেশ কয়েকজন সমর্থকও ছিলেন। সেখানে তিনি সবার কাছে দোয়াও চান। পরে তারা মোটরসাইকেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় তাদের গতিরোধ করে দুর্বৃত্তরা এরশাদুল হক ও বাদলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই বাদল মারা যান। গুরুতর আহত এরশাদুলকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। ঢাকা নেওয়ার পর গতকাল এরশাদুল মারা যান।

নাটঘর ইউপির চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বলেন, ‘কুড়িঘর বাজারের পাশে পরিমন্দের বাড়ির রবিউল মেম্বারের বাড়িতে ওয়াজ মাহফিল ছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে দুটি মোটরসাইকেলে করে সাত থেকে আটজন দুর্বৃত্ত এরশাদ ও বাদলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।’

এরশাদের চাচাতো ভাই ইসমাঈল বলেন, ‘এরশাদের পেছনের মোটরসাইকেলে ওবায়দুল ছিল। কুড়িঘর গ্রামের কবির হোসেনের বাড়ির পশ্চিম পাশে মহেশ রোডে একজন ওবায়দুলকে দাঁড় করিয়ে সিগারেট চায়। এসময় সামনের মোটরসাইকেলে থাকা এরশাদ ও বাদলকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা।’

এরশাদের ছোটভাই কাতার প্রবাসী আকতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ৪ ভাই ৪ বোনের মধ্যে এরশাদ ভাই সবার বড়। বাবা অসুস্থ থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে চেয়ারম্যানের অনেক দায়িত্বই তিনি পালন করতেন। যে কারণে তিনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয়তা পান। এলাকাবাসীও আগামী নির্বাচনে তাকেই চাচ্ছেন। তাই প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে হত্যা করেছে।’

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিন কুড়িঘর বাজারে উপজেলা নির্বাচনের পরদিন একটি মিছিল ও বাজারের পাহারাদারের বেতন নিয়ে এরশাদ ও তার প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে এরশাদের চাচাতো ভাই সাঈদুল মারা যান। এ ঘটনায় ২ এপ্রিল দায়েরকৃত মামলায় বাদী হন এরশাদ। আসামি করা হয় আম্বর বাড়ির আবু নাসের, মালেকসহ ২০ জনকে। এরশাদের পরিবারের লোকজন এ ঘটনার জের ধরেই এরশাদকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পরে বলে ধারণা করছেন। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ কারণটিকে মাথায় রাখছেন।

এদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী এরশাদ ও তার সহযোগীদের হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরই রাতে কুড়িঘর ও নান্দুরার বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার কয়েকজন জানান, হত্যা ঘটনার পরই এরশাদের সমর্থকরা কুড়িঘর গ্রাম থেকে চেয়ারম্যান প্রার্থী সফর বাড়ি বংশের শামীম আবদুল্লাহ ও নান্দুরা আম্বর বাড়ির আবু নাসেরের বাড়িসহ বেশ কিছু বাড়িঘরে তান্ডব চালায়।

এদিকে গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মো. শাহীনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, সিআইডি, পিবিআই ও র‌্যাব সদস্যরা। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৭.৬৫ বোর পিস্তলের ৪টি খোসা উদ্ধার করেছে। এছাড়া সোহাগ মিয়া (৩৩) নামে এক যুবককে আটক করেছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মো. শাহীন বলেন, হত্যাকাণ্ডে ৪-৫ জনের একটি দল সরাসরি অংশ নেয় বলেই আমরা জানতে পেরেছি। আক্রমণের ধরন দেখে ধারণা করা যাচ্ছে যে তারা প্রশিক্ষিত।

এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরের বাদলের লাশের স্বজনদের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বিকাল ৪টায় ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে তাকে তার গ্রামে সমাহিত করা হয়। এরশাদুল হক ঢাকায় মারা যাওয়ায় তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে সন্ধ্যার পর লাশ এলাকায় নিয়ে পুলিশ প্রহরায় দাফন করা হয়।

পাবনায় নৌকার সমর্থকদের হামলায় ১ জন নিহত : পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণা ও গণসংযোগে প্রতিপক্ষের হামলায় সেলিম হোসেন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়। হামলা ও মৃত্যুর জন্য নৌকার সমর্থকদের দায়ী করেছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী কে এম শাহীন (আনারস প্রতীক)।

এদিকে ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় নিহত সেলিমের লাশ নিয়ে উপজেলার দেবোত্তর বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।

মৃত সেলিম হোসেন উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের জমসেদ আলীর ছেলে। স্থানীয়রা জানান, শনিবার দুপুরে উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী কে এম শাহীন (আনারস প্রতীক) কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে রায়পুর গ্রামে গণসংযোগে গেলে নৌকার কর্মী-সমর্থকরা হামলা চালায়। এতে কয়েকজন আহত হয়। তাদের মধ্যে সেলিম হোসেনকে পাবনা জেনারেল  হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কে এম শাহীন অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় আমার কর্মী-সমর্থকদের ওপর নৌকার প্রার্থী মোহাইমিন হোসেন চঞ্চলের কর্মী সমর্থকরা হামলা চালালে সেলিম হোসেন আহত হয়। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়।

তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে নৌকার প্রার্থী মোহাইমিন হোসেন চঞ্চল বলেন, হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেলিমের মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকে হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। তার মৃত্যুকে পুঁজি করে মিথ্যা অভিযোগ করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

আটঘরিয়া থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, এই ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাবনায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হত্যায় ৩ জন গ্রেপ্তার : পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন হত্যা মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে ইউনিয়নের কোলাদী গ্রামের চারা বটতলা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলো কোলাদী বিজয় রামপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৩০), মহাদেবপুর পূর্বপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলাম রবি (৪০) ও সিরাজ শেখ (৩৬)।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাসুদ আলম জানান, অভিযান চালিয়ে ইয়াসিন আলম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঝিনাইদহে আ. লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ১০ : ঝিনাইদহের শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নে স্বতন্ত্র ও নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৭টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। গত শুক্রবার রাতে ওই উপজেলার সারুটিয়া ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানায়, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে সারুটিয়া ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জুলফিকার কায়সার টিপুর সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচার শেষে কাতলাগাড়ী বাজারের দিকে ফিরছিলেন। সে সময় পথে কৃত্তিনগর গ্রামে পৌঁছালে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহমুদুল ইসলাম মামুনের সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা ৭টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আহত হন অন্তত ৫ জন।

ঘটনার প্রতিবাদে পাল্টা টিপুর সমর্থকরা ওই ইউনিয়নের ভুলুনদিয়া, কৃষ্ণনগর, পুরাতন বাখরবা, ছোট মৌকুড়ি গ্রামে নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে কম পক্ষে ৫ জন আহত হন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

শৈলকুপা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, রাতে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পরবর্তী সংঘর্ষ এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পাবনা প্রতিনিধি আরও জানিয়েছেন, জেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মঞ্জুরুল ইসলামের তিনটি নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে নির্বাচনী অফিসগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌকার মঞ্জুরুল ইসলাম। হামলার জন্য তিনি দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী আলাউদ্দিন মালিথা ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে (আলম হাজি) দায়ী করেছেন। তবে তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

হেমায়েতপুর ফাঁড়ি ইনচার্জ নাজমুল হক বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।