সম্প্রতি পেইচিং এবং মস্কো উভয়ই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের চাপ মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা জোরদার করেছে। এমনকি চীন ও রাশিয়া জাপান সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত মহড়া এবং যৌথ টহল দিয়ে তাদের সামরিক সহযোগিতা প্রসারিত করবে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বেশ কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, চুক্তিটি দুই দেশের সম্পর্ককে কার্যত জোটে পরিণত করবে। চীনের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ, যেহেতু পেইচিং সর্বদা জোটনিরপেক্ষ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে এসেছে।
চীন ও রাশিয়ার এবারের যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমে মিত্রতার সম্পর্ক জোরদার এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুই দেশের প্রত্যয়ের পাশাপাশি সক্ষমতা প্রদর্শন। দুই দেশের কর্মকর্তাদের বরাতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। সিনহুয়া আরও বলছে, কৌশলগত পারস্পরিক বিশ্বাস, ব্যবহারিক বিনিময় ও সমন্বয়ের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে চীন ও রাশিয়া। এ ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে এবারের যৌথ সামরিক মহড়া দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংকট্যাংক লওয়ে ইনস্টিটিউটের চীন বিষয়ক বিশ্লেষক রিচার্ড ম্যাকগ্রেগর আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগ-বিরোধিতার পরও পেইচিং ও মস্কো গভীর সম্পর্কে জড়িয়েছে, যার প্রকাশ ঘটেছে যৌথ সামরিক মহড়ায়। চীনের উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় নিয়াংজিয়া প্রদেশটি জিনজিয়াংয়ের সীমান্ত লাগোয়া। জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের ওপর পেইচিং দমন-পীড়ন চালিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বেশ পুরনো অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে চীনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পশ্চিমাদের অভিযোগ উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীন পদ্ধতিগত নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিশেষ শিবিরে রাখা হচ্ছে। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে। যদিও চীন বরাবর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এবার জিনজিয়াংয়ের পাশেই রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে চীন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যখন চীন ও রাশিয়ার বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে ঠিক তখন পেইচিং এবং মস্কো নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের এই গভীরতাকে বিশ্বব্যবস্থায় একটি নতুন কৌশলগত অংশীদারত্বমূলক জোটের উদ্ভবের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কোনো-কোনো পর্যবেক্ষক অনুরূপ জোটের উদ্ভবকে চীনের ভূ-রাজনৈতিক উত্থানকে ধারণ করার একটি নতুন হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন এবং এটি পেইচিং ও মস্কোর মধ্যে সহযোগিতার প্রসার সাধন করবে বলে মনে করছেন। পেইচিং এবং মস্কোর মধ্যে একটি গভীর দীর্ঘস্থায়ী জোটের ধারণা তাদের উভয়ের জন্য বাস্তবতার চেয়েও বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়। নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং তাদের রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের চেষ্টার মুখে উভয় রাষ্ট্রের জোটবদ্ধভাবে ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্যোগী হওয়ার কারণে সেটি বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত শতকের ষাটের দশক থেকে নব্বই দশকের প্রারম্ভকাল পর্যন্ত পেইচিং ও মস্কোর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হয় এবং ২০০১ সালে তারা একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের জন্য বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ওই সম্পর্ক ২০১৪ সাল থেকে ক্রমবর্ধমান ও শক্তিশালী বাস্তবসম্মত কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। দেশ দুটি সামরিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করছে।
২৯ ডিসেম্বর ২০২০ সালে চীন-রাশিয়ার প্রেসিডেন্টদ্বয় যথাক্রমে শি চিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ভার্চুয়াল বৈঠক ও আলোচনাকালে বেশি জোর দিয়েছিলেন যে উভয় দেশ একটি ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব বিকাশের জন্য কাজ করবে। চীন-রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত এই সহযোগিতা কার্যকরভাবে দুই দেশকে পশ্চিমাদের যে কোনো দমন ও বিভক্ত করার চেষ্টাকে প্রতিরোধ করতে পারে। উল্লেখ্য, চীন এবং রাশিয়া দুই দেশই ওয়াশিংটন ও তার অংশীদারদের কাছ থেকে এক বা একাধিক নিষেধাজ্ঞা বা অন্য আকারে বৈরিতার মুখোমুখি হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যখন চীন-রাশিয়ার বিভিন্ন ইস্যুতে মতদ্বৈধ,বৈরিতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে ঠিক তখন উভয়দেশ নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা আরও বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চাপ মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা জোরদার করেছে।
দেশ দুটি ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। শুধু প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কও গভীরতর হয়েছে। বৈদেশিক নীতিতে পেইচিং ও মস্কো ইরান, সিরিয়া এবং ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন ইস্যুতে সহমত পোষণ ও সমর্থন দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিও দেশ দুটি একমত পোষণ করে এবং দেশটির ওপর থেকে জাতিসংঘের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্যও তারা চাপ সৃষ্টি করেছে। দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সাগর এবং এর সীমান্ত এলাকায় যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে, যেখানে যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমান অংশ নিয়েছিল। চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করেছে। সম্পর্কের এই গভীরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা।
গতমাসে লন্ডন-ভিত্তিক ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ বলেছেন, তিনি চীন ও রাশিয়াকে পৃথক হিসেবে দেখেন না। উভয় দেশ ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করে। চীন এবং রাশিয়া এশিয়া প্যাসিফিক বা ইউরোপের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশ দুটি একটি আধা জোট হিসেবে সন্নিবেশিত, যাকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করে ন্যাটো। ন্যাটো দাবি করে চীন ও রাশিয়া একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।
চীন ও রাশিয়ার অংশীদারত্ব শক্তিশালী হলে আসছে দশকগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত ল্যান্ডস্কেপ গঠনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার পার্থের কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলেক্সি মুরাভিভ। তার মতে চীন ও রাশিয়ার অবস্থা প্রায় ‘জোট গঠনের মতো’। ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত সামরিক স্বার্থে দুই দেশের ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকেই চীন ও রাশিয়ার এই জোটবদ্ধ অবস্থা উদ্ভূত হয়েছে। দুই দেশের সরকারই আসলে ওয়াশিংটনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় আগ্রহী। মস্কো ও পেইচিং যদি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অকুস’ চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে দক্ষিণ চীন সাগর ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক মুরাভিভ। যদি পেইচিং মনে করে যে দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নৌ-উত্তেজনা বাড়ছে, তবে জাপান সাগরে রাশিয়ার নৌবহরের সঙ্গে বৃহত্তর সমন্বয় সর্বদা একটি বিকল্প হিসেবে উন্মুক্ত থাকবে। এই ধরনের ব্যবস্থাগুলো পশ্চিমা নেতাদের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে পেইচিং এবং মস্কো উভয়ই মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র একটি কপট আগ্রাসী শক্তি যে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য চীন ও রাশিয়াকে দাবিয়ে রাখতে চায়।
চীন ও রাশিয়া দুই দেশকেই নিজের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ওয়াশিংটন ওই দেশগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলে এবং সময়ে-সময়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়া চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উভয় দেশকে মোকাবিলা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানকে নিয়ে ‘কোয়াড’ জোট গঠন করেছে। চীন ওই জোটকে ‘দক্ষিণ এশিয়ান ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তের বছর পরে যুক্তরাষ্ট্র চীনের আশপাশের অঞ্চলে অর্থাৎ ফিলিপাইনস সাগর ও বঙ্গোপসাগরে দুই ধাপে পুনরায় নৌ মহড়ার আয়োজন করেছিল। চীন ও রাশিয়ার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তার দুই মিত্র যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে ‘অকুস’ নামক নিরাপত্তা জোট গঠন করেছে।
জোটের চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াকে শক্তিশালী পারমাণবিক সাবমেরিন রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত জলের পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালীতে টহল দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চীন ওই জোটকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাশিয়া এটিকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে অভিহিত করেছে। মস্কো-ভিত্তিক রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের একজন বিশ্লেষক ড্যানিল বোচকভ বলেছেন এ ধরনের কাজগুলো অনিবার্যভাবে চীনকে প্রতিকূল কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। ওই প্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটনের মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার আশপাশের সাগরে সাম্প্রতিক চীন-রাশিয়া যৌথ নৌ মহড়া।
বোচকভ আরও বলেন, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালের মতো কঠোর ব্লকের পুনরুত্থানও ঘটতে পারে। যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্লক এবং অন্যদিকে চীন-রাশিয়া ও তার মিত্রদের জোট। ‘এটি ভূ-রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করবে যা কিছুতেই অতিক্রম করা অসম্ভব বলে মনে হয়’ বলেন বোচকভ। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে অংশীদারত্ব ও কৌশলগত জোট গোটা একুশ শতক ধরে আরও শক্তিশালী হতে থাকবে এবং এমনকি একটি ‘সামরিক জোটে’ রূপান্তরিত হতে পারে।