সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর মালদ্বীপ সফরে হতে পারে ৪ এমওইউ সই

তিন দিনের সফরে আগামী বুধবার মালদ্বীপ যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দু’দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দ্বৈত করারোপ, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ে কয়েকটি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহর আমন্ত্রণে মালদ্বীপ যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর মালদ্বীপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। মালদ্বীপ সম্প্রতি আরও কিছু দ্বীপে পর্যটন রিসোর্ট তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলে আশা করা যায়। সম্প্রতি মালদ্বীপ বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাদের শিক্ষার্থীদের পাঠানোর প্রস্তাব করায় দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বাংলাদেশের শ্রমবাজার সুসংহতকরণ ও সম্প্রসারণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে, যাতে বাংলাদেশের সার্ভিস সেক্টর প্রসার লাভ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।’

ড. মোমেন বলেন, ২২ ডিসেম্বর বিশেষ ফ্লাইটযোগে প্রধানমন্ত্রী মালেতে অবতরণ করবেন। বিমানবন্দরে মালদ্বীপ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। পর দিন সকালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। তখন তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে দুই নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মালদ্বীপের পার্লামেন্টেও বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। মালদ্বীপে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গেও ভার্চুয়ালি কুশল বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী।

মালদ্বীপের অনুরোধে ১৩টি সামরিক যান সে দেশকে উপহার দিচ্ছে বাংলাদেশ। দ্বীপ দেশটির সঙ্গে মিলিটারি ডিপ্লোম্যাসির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন মালদ্বীপ সফরের সময়ে এই যানগুলো হস্তান্তর করা হবে।

এ বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক এটিএম রকিবুল হক বলেন, ‘মালদ্বীপের তরফ থেকে একটি অনুরোধ ছিল এবং এরপর আমাদের এখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, তাদের ১৩টি যান আমরা উপহার হিসেবে দেব। এই উপহার প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ে তার উপস্থিতিতে হস্তান্তর করা হবে।’

যানগুলো ২ ও ১২ ডিসেম্বর মালদ্বীপে পৌঁছেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন বিষয়টি দেখছে এবং মালদ্বীপের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গাড়িগুলো তারা নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের পরে আমরা মালদ্বীপ সরকারকে বিষয়টি জানাই এবং তখন তারা এটি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উন্নত দেশ মালদ্বীপে অনেক বাংলাদেশি কাজ করছেন এবং আগামীতে সেখানে কাজের সম্ভাবনা বাড়বে। কভিড পরিস্থিতির সময়ে ওই দেশের বাজারে কিছুটা শ্লথগতি ছিল, কিন্তু তাদের অর্থনীতি আবারও চাঙ্গা হচ্ছে।

মালদ্বীপের ৬০টি দ্বীপে নতুন করে পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে এবং সেখানে কাজের সম্ভাবনা তৈরি হবে উল্লেখ করে ড. মোমেন বলেন, ‘এবারের সফরে বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা আছে।’ এর আগে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হয়েছিল বলেন জানান তিনি।

মালদ্বীপ বাংলাদেশের কাছে বিশেষজ্ঞ এবং দক্ষ শ্রমিক চাইছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার ধারণা, সেখানে বেশি বিশেষজ্ঞরা যাবে না, তবে অন্যরা যেমনÑডাক্তার ও নার্স যাবে। এবারের সফরে একটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে ডাক্তার এবং নার্স পাঠানোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টে উভয়ের ঢাকা সফরের সময় কানেক্টিভিটির ওপরে জোর দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ওই সময় দুটো বিষয় ছিল। একটি ছিল বিমান যোগাযোগ এবং আরেকটি সমুদ্র যোগাযোগ। এর মধ্যে ইউএস-বাংলা তাদের ফ্লাইট চালু করেছে এবং বিমান খুব শিগগিরই চালু করতে যাচ্ছে। শিপিং চুক্তিটি বাংলাদেশের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এখনো শেষ করতে পারেনি। কিন্তু ভবিষ্যতে এটি করা হবে বলে তিনি জানান।

কভিড পরিস্থিতির কারণে অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলাদেশে মালদ্বীপের কোনো বন্দি নেই, কিন্তু ওই দেশে ৫৩ জন বাংলাদেশি বন্দি আছে।

প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কিন্তু বন্দিবিনিময় নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়টি মালদ্বীপ এখনো পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি।

বন্দিবিনিময় চুক্তি করতে কেবিনেট সম্মত হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মালদ্বীপ এ বিষয়ে অগ্রসর হয়নি, কিন্তু আমরা তৈরি।’