৫০ বাস নিয়ে ২৬ ডিসেম্বর চালু হবে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বিজয়ের মাস সামনে রেখে ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার পথে ৫০টি সবুজ রঙের বাস দিয়ে চালু হচ্ছে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাজধানীতে প্রথম এই সেবা চালু হতে যাচ্ছে।

গতকাল রবিবার বিকেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নগর ভবনের বুড়িগঙ্গা হলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং যানজট নিরসনে গঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির ২০তম সভা শেষে এ তথ্য জানানো হয়।

কমিটির সভাপতি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘বিজয়ের মাসে উপহার হিসেবে ঢাকাবাসীর জন্য ২৬ ডিসেম্বর সূচনা করতে যাচ্ছি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঢাকা নগর পরিবহন সেবা। ঘাটারচর থেকে মতিঝিল হয়ে সাইনবোর্ড-কাঁচপুর পর্যন্ত চলবে এই বাস। ট্রান্সসিলভা কোম্পানির ২০টি বাস এবং বিআরটিসির ৩০টি ডাবল ডেকার বাস এটা দিয়ে সূচনা করব।’ এরপর ৬০ দিবসের মধ্যে ১০০ বাস দিয়ে পূর্ণভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মেয়র তাপস বলেন, ‘এই যাত্রাপথ আমরা নমুনা হিসেবে শুরু করব। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় তিনি সরাসরি না পারলেও ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে বাস রুট রেশনালাইজেশনের শুভ উদ্বোধন করবেন। ২৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় উদ্বোধন করা হবে।’

এদিকে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, পরিকল্পিত, যানজটমুক্ত করতে এবং আশপাশের ছয় জেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্র্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) গঠিত হয় ২০১২ সালে। রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে গত ১ এপ্রিল রুটভিত্তিক কোম্পানির অধীনে পরীক্ষামূলক বাস চলাচল শুরুর কথা ছিল। পরে সেটি পিছিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়। পরে তা আবার পিছিয়ে ১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিনবার তারিখ পরিবর্তনের পর এবার চতুর্থবার নতুন তারিখ ঘোষণা করেছে ডিটিসিএ।

এর আগে ডিটিসিএর ১৬তম সভায় মেয়র তাপস এই রুটে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ২০ পয়সা হবে বলে ঘোষণা দিলেও গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভাড়া হবে (কিলোমিটার প্রতি) ২ টাকা ১৫ পয়সা।’

পরীক্ষামূলকভাবে এ রুটে আট ব্যক্তি ও কোম্পানি ১৫৭টি বাস দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে এর আগে জানিয়েছিলেন মেয়র শেখ তাপস। তবে প্রাথমিকভাবে ৫০টি বাস দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

‘ঢাকা নগর পরিবহনে’ যুক্ত হতে ৮টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল জানিয়ে গতকাল মেয়র তাপস বলেন, ‘গত সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলাম। সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন করেছিল ৮টি প্রতিষ্ঠান। সেই ৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছি ৪টি প্রতিষ্ঠানকে। বিআরটিসিসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে।’

১০০টি বাস দিয়ে কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রান্সসিলভার ২০টি বাসের সম্মতি দিয়েছি। আরেকটি প্রতিষ্ঠান মোস্তফা হেলাল কবির তারা ছয়টির জন্য আবেদন করেছিল। তাদের পাঁচটি বাসের সম্মতি দেওয়া হয়েছে। জাহান এন্টারপ্রাইজ ১০০ বাসের জন্য আবেদন করেছিল, তাদের ৬০টি বাসের সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এইচআর এন্টারপ্রাইজ পাঁচটি বাসের জন্য আবেদন করেছিল। তাদের পাঁচটি বাসের সম্মতি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯০টি বাস। এ ছাড়া বিআরটিসির জন্য ১০টি বাস নির্ধারিত থাকবে। এভাবে ১০০টি বাস নিয়ে যৌথ মূলধনের অংশীদারিত্ব চুক্তি হবে।’

মেয়র তাপস বলেন, ‘এখানে অন্য যেসব বাস রয়েছে, সেগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এক একটি নতুন বিনিয়োগকারী নেব এবং নতুন বাস দিয়ে সেগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করব।’

১ হাজার ৬৪৬টি অনুমোদনহীন বাস চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে ডিএসসিসি মেয়র আরও বলেন, ‘এই বাসগুলো আর কোনো দিন ঢাকায় চলবে না। ইতিমধ্যে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ২৯টি বাস জব্দ করা হয়েছে। বাকিগুলো যেখানেই পাওয়া যাবে, এগুলোকে ধ্বংস করা হবে। এই যাত্রাপথে যাদের রুট পারমিট ছিল তাদের গ্রিন ক্লাস্টারের বাইরে অন্য যাত্রাপথে সমন্বয় করে দেব। আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এ কাজ সমন্বয় করে দেওয়া হবে।’

‘ঢাকা নগর পরিবহনের’ সেবা ই-টিকিটিং হবে জানিয়ে ডিএনসিসি মেয়র আতিক বলেন, ‘এ রুটে যারা থাকবে প্রতিটি বাসের রেজিস্ট্রেশন থাকবে, রুট পারমিট থাকবে এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স থাকবে। ড্রাইভারদের সবুজ রঙের পোশাক থাকবে এবং তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। অনুমোদনহীন বাস ও যে বাসের রুট পারমিট নেই, সেগুলোকে জব্দ করা হবে। মাতুয়াইলে একটি ডাম্পিং স্টেশন করা হচ্ছে। এই বাসগুলোকে সেখানে নিয়ে ফেলা হবে।’ পরিবহন মালিকদের অসহযোগিতার কারণে এ কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

নতুন বাস নামবে কি না, সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে মেয়র তাপস বলেন, ‘ট্রান্সসিলভার ২০টি নতুন বাস আনা হবে। বিআরটিসির ৩০টি বাস নতুন নয়, এগুলো মেরামত করে আনা হবে।’

এই যাত্রাপথে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাত্রীছাউনি, বাস বে নির্মাণ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে। এই বাসগুলো নির্ধারিত যাত্রীছাউনি ও বাসস্ট্যান্ড ছাড়া থামবে না।’

এই রুটে অন্য কোনো বাস চলবে কি না? এ প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসি মেয়র বলেন, ‘ঢাকা শহরে অনুমোদনহীন বাস চলবে না। এই রুটে যাদের আগে রুট পারমিট নেওয়া ছিল, তাদের ২০১৯ সালের পরে কোনো বাস নেই। তারা কোনো আবেদন করেনি। সুতরাং তারা এই যাত্রাপথে বাস পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের এই ক্লাস্টারের অধীনে অন্য যাত্রাপথে সমন্বয়ের জন্য কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি।’

৫০টি বাস পর্যাপ্ত কি না, জানতে চাইলে মেয়র তাপস বলেন, ‘যাত্রীদের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। তবে দু-একদিন সময় লাগতে পারে।’

সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তাসহ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী এবং ডিটিসিএর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।