হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নানাবিধ অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাপক ভোগান্তির মুখে পড়ছেন যাত্রীরা। প্রতিরাতে আট ঘণ্টা ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার পর থেকে এ ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। একই কারণে বিলম্বে ফ্লাইট ছাড়ার ঘটনাও ঘটছে। এ জন্য বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে দায়ী করছেন অংশীজনেরা। উদ্ভূত সংকট দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১৩ ডিসেম্বর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনায় লোকবল ও সরঞ্জাম সংকট চলছে। কার্যক্রম তদারকিতে ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবও দেখা গেছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ না করায় বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা স্থবির হয়ে পড়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠির সপ্তাহ পেরুলেও বিমানবন্দরের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। সেখানে যাত্রীদের ভোগান্তি আর বিশৃঙ্খলা এখন চরমে।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘বিশৃঙ্খল শাহজালাল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশের মূল এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটিতে যে সরেজমিন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা ভয়াবহ। একসঙ্গে শত শত যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা। বহির্গমনে যাত্রীদের বোডিং কার্ড ইস্যু, ইমিগ্রেশন, লাগেজ হ্যান্ডলিং, পিসিআর-এ করোনা পরীক্ষাসহ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই অবস্থায় পড়তে হচ্ছে আগমনী ফ্লাইটের যাত্রীদেরও। এ ক্ষেত্রেও করোনা সার্টিফিকেট যাচাই, ইমিগ্রেশন, লাগেজ পাওয়া নিয়েও ভোগান্তির শেষ নেই। করোনা সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাই কাউন্টারে জনবল কম হওয়ায় সেখানে বিশাল লাইন দেখা গেছে। সেখান থেকে বের হয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টারেও দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। বেল্টে এসেও এক থেকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগছে লাগেজ পেতে। বিমানবন্দরের উত্তর পাশে কার পার্কিংয়ে তৈরি করা পিসিআর পরীক্ষাগারেও ভিড় হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেখানে একসঙ্গে ১৫০-২০০ জন যাত্রীর করোনা পরীক্ষা করা ও রিপোর্ট বিতরণেও রয়েছে বিশৃঙ্খলা।
উন্নয়ন কাজের জন্য ছয় মাস প্রতিরাতে ৮ ঘণ্টা করে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রাখার ফলেই শাহজালালে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নতুন হাইস্পিড কানেকটিং ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক উন্নয়ন কাজের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ২৪ ঘণ্টার নিয়মিত ফ্লাইট শিডিউল বাকি ১৬ ঘণ্টার মধ্যে করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় বেশিরভাগ ফ্লাইটই পড়েছে বিকেলের দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিতে স্বল্পসময়ে এমন অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ কী কী প্রস্তুতি নিয়েছে কিংবা আদৌ কোনো প্রস্তুতি নিয়েছে কি না? শাহজালাল বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় প্রতিটি এয়ারলাইনসের যাত্রীদের চেক-ইন কাউন্টার সামলানো, বোর্ডিং, উড়োজাহাজে মালামাল ওঠা-নামা, যাত্রীসেবা, প্রকৌশল সেবা এবং জিএসই (গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট) সেবা দেওয়ার দায়িত্ব বিমানের। এয়ারলাইনসগুলো এজন্য নির্দিষ্ট হারে ফি দিয়ে থাকে। আর এটা তদারকির দায়িত্বে থাকেন বিমানের একজন মহাব্যবস্থাপক (এয়ারপোর্ট সার্ভিস)। কিন্তু বিমানের পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম এবং যথাযথ তদারকির অভাবে এসব কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। ফলে এই যাত্রী দুর্ভোগ এবং ফ্লাইট বিলম্বের ঘটনা বাড়ছে। এদিকে, বাংলাদেশে চলাচলকারী ২৭টি বিমান সংস্থার সংগঠন এয়ারলাইনস অপারেটরস কমিটিও (এওসি) এই পরিস্থিতির জন্য বিমানের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছে। সংবাদমাধ্যমের কাছে তারা দাবি করেছে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনার জন্য এয়ারলাইনসগুলোকে ফ্লাইটপ্রতি সেবাভেদে ২ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিমানকে দিতে হয়। কিন্তু এখন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দেরির কারণে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরি হচ্ছে। কোনো কোনোটি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিদেশগামী যাত্রীদের। বেশিরভাগ যাত্রী এজেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিট কিনে থাকেন। তাদের কাছেই যাত্রীদের মোবাইল নম্বর থাকে। তাই সরাসরি এয়ারলাইনসের সঙ্গে যাত্রীদের যোগাযোগ হয় না। কিন্তু আগে বা নতুন কেনা টিকিটের বেলায়ও ফ্লাইটের নতুন শিডিউল যাত্রীরা না জানার কারণে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং ভিড় বাড়ছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দূর করতে বেবিচকের উচিত বিমানবন্দরে আরও জনবল বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি এয়ারলাইনসগুলোর উচিত ফ্লাইটের শিডিউল যাত্রীদের আগাম জানিয়ে দেওয়া। একটি পূর্বনির্ধারিত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিমানবন্দরে এ ধরনের ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার দায় অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই সংকট দূর করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।