শিবলী রুবাইয়াত উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ব্যবসাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও ‘সিস্টেমেটিক’ এবং আরও মুনাফা বাড়াতে পুঁজিবাজারে আসেন। দীর্ঘমেয়াদি অর্থের প্রয়োজন পুঁজিবাজার থেকে মেটান আর স্বল্পমেয়াদি অর্থের প্রয়োজনে ব্যাংকের দ্বারস্থ হন। এভাবে অর্থনীতিও সুস্থ হবে। গত মঙ্গলবার রাতে ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজার : করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্ভাবনা ও সুযোগ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
তালিকাভুক্তির জন্য যেসব নথি লাগে, তা সবটা যদি সঠিকভাবে দেওয়া হয়, হিসাবপত্র এবং ব্যাংক হিসাব ঠিক থাকলে, দুই সপ্তাহের মধ্যে আইপিও অনুমোদন দেওয়ার নিশ্চয়তা দেন এসইসির চেয়ারম্যান।
রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে অনুষ্ঠিত গত মঙ্গলবার রাতের এ আলোচনা সভার আয়োজক ছিল ডিএসই। এতে আবদুল মোনেম, একে খান, আকিজ, বেঙ্গল, ডিবিএল, এনভয়, ল্যাবএইড, অপসোনিন, রহিম আফরোজ, র্যাংগস, শেলটেক, ট্রান্সকম, উত্তরা, শান্তা, টিকে, ইয়ুথ, বেস্ট ইলেকট্রনিক্স, ওয়ালটন, ভারটেক্স, ল্যাবএইড, বিআরবি, বারাকাসহ ৪৬ ব্যবসায়িক গ্র“পের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা যোগ দিয়েছিলেন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসইসির চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের শুধু যে অবারিত দরজা খুলে যায়, তা নয়; ব্যবসায় ‘করপোরেট কালচার’ প্রতিষ্ঠিত হয়, কোম্পানির মূল্য ও সুনাম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ে। পারিবারিক কোম্পানির থেকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্থায়িত্ব বহুগুণ, প্রতিষ্ঠাতার অবর্তমানে ধসে পড়ে না। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, তালিকাভুক্ত হলে, মুনাফার ভাগ দিলে নিজের মুনাফা কমে যাবে। আসলে তালিকাভুক্ত হলে যে কর ছাড় পাওয়া যায়, তা দিয়েই পাবলিক শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব।
শিবলী রুবাইয়াত বলেন, বাংলাদেশে অনেক বড় ব্যবসায়িক গ্র“প ও উদ্যোক্তা আছেন। কিন্তু তার কোম্পানি পুঁজিবাজারে নেই। কেন নেই? কারণ তারা মনে করেন, এখানে আইনকানুন বেশি, জবাবদিহি বেশি। আসলে কি তাই? তাহলে স্কয়ার, এসিআই, সামিট, গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানি কেন এলো? তাতে কি তাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে? না, উল্টো তাদের কোম্পানি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হয়েছে। আপনার কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে কোনোদিনই জানতে পারবেন না, কত দামি কোম্পানি আপনি গড়লেন। আপনার পরিশ্রমে গড়া কোম্পানি আপনার অবর্তমানে আদৌ টিকে থাকবে কি-না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না। কিন্তু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সে রাস্তা খুলে যায়।
দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়িক গ্র“প এসিআইয়ের চেয়ারম্যান আনিসুদ্দৌলাকে উদ্ধৃত করে শিবলী রুবাইয়াত বলেন, তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন আপনার কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করালেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ঝামেলা কমাতে। এসিআইয়ের আর্থিক হিসাব পরিষ্কার, কারও ভয়ে থাকতে হয় না। ব্যবসা নিয়ে চিন্তা নেই। সবার মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা আছে। টেনশন ফ্রি ব্যবসা করার সুযোগ পারিবারিক ব্যবসায় নেই।
স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো ৫-১০ বছর মেয়াদে উচ্চসুদে ঋণ দিয়ে নিজেই খেলাপি তৈরি করছে এমন মন্তব্য করে এসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ঋণ নেওয়ার পরের দশ বছরে নিজের কারণে না হোক, অন্যের কারণে কোনো সমস্যায় পড়বেন না, পৃথিবীতে কোনো ব্যবসায়ী নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। আজ যদি বলা হয়, কোনো ঋণই একবারের বেশি পুনঃতফসিল হবে না, তাহলে ব্যাংক খাত ধসে পড়বে। তিনি বলেন, ব্যাংক শুধু চলতি মূলধন, ক্রেডিট কার্ড, স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন করলে নিরাপদ থাকবে, খেলাপি ঋণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং সুদের হার কমবে।
যেসব কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাজারমুখী হন না, সে বিষয়ে র্যাংগস গ্র“পের পরিচালক রোমানা রউফ চৌধুরী বলেন, পরিবারের ৩-৪ জন মিলে কোম্পানি চালানো সহজ, বিপরীতে তালিকাভুক্ত হলে শত শত লোক নিয়ে কোম্পানি চালানোকে অনেকে ঝামেলার মনে করেন। তাছাড়া অনেক নিয়ম-কানুন মানতে হয়। পুঁজিবাজারে আসার কারণ যদি অর্থের প্রয়োজনে হয়, তা খুব সহজে ব্যাংকেই পাওয়া যায়। এসব কারণে কেউ আগ্রহী হয় না। তবে বন্ড বাজার হলে অনেকে আগ্রহী হবেন।
শিগগিরই নিজের ব্যবসায়িক গ্র“পের ২/৩টি কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে আবদুল মোনেম গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাঈনউদ্দিন মোনেম বলেন, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিগুলোর আর্থিক হিসাব ঠিক থাকে বলে এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ার ভয়ে পুঁজিবাজারে আসতে চায় না।
এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম মুর্শিদী বলেন, পুঁজিবাজারের প্রবৃদ্ধি যাতে সঠিকভাবে হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলে পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এর জন্য আমাদের হতাশ না হয়ে ইতিবাচক চিন্তাধারা বজায় রেখে কাজ করতে হবে।
এসইসির কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ জানান, আমরা যখন স্বাধীন হয়েছিলাম তখন ৯টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছিল, যেগুলোর সম্মিলিত মূলধন ছিল ১৩ কোটি টাকা। আজ ডিএসইর বাজার মূলধন প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। তাই আমাদের হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সম্মানিত গোষ্ঠী। আমরা সরকারি কর্মচারী হিসেবে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আপনাদের সেবা প্রদানের চেষ্টা করব। আমরা উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহায়তা দিতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত।
ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, তালিকাভুক্তির কী সুবিধা, তা সিংহভাগ কোম্পানি জানে না। জানলে, তাদের জায়গা দিয়ে কুলানো যেত না।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আমিন ভূইয়া বলেন, কোনো কোম্পানি যদি পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হয়, তারা কোনো কিছু বুঝতে চাইলে প্রয়োজনে তাদের অফিসে গিয়ে বুঝিয়ে আসব।
অনুষ্ঠানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলো কী কী ধরনের সুবিধা পায় এবং কোম্পানি কতভাবে লাভবান হতে পারে এ সংক্রান্ত উপস্থাপনা দেন ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান মজুমদার।