চট্টগ্রাম নগরীতে নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রায় এক দশক ধরে হালনাগাদ করেনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নজরদারির জন্য কর্মকর্তা থাকলেও নজরদারি না থাকায় এবং সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভবন মালিকরা যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিএর উদাসীনতা।
অভিযোগ রয়েছে, সিডিএর এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসারকে ‘ম্যানেজ’ করে যেনতেনভাবে ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নেন অনেক ভবন মালিক। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশায় এক রকম অনুমোদন নিয়ে ভবন মালিকরা নিজেদের মতো করে নির্মাণ করে নেন। এতে এসব ভবন বছর দু-এক গেলেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গত সোমবার রাতে নগরীর মাঝিরঘাট স্ট্যান্ড সড়কে পার্বতী ফকিরপাড়া এলাকায় গুলজার খালসংলগ্ন একটি মন্দিরসহ একাধিক ভবন হেলে পড়ে এবং ফাটল দেখা দেয়। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ভবনগুলোর বাসিন্দারা। সিডিএ ও ভবন মালিকরা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন।
এ ঘটনার পরপরই সিডিএসহ সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসেন। তবে গত মঙ্গলবার হেলে পড়া তিনতলা ভবনটিতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি ব্যানার টাঙিয়ে দিয়েই দায় সেরেছে সিডিএ।
শুধু এই মাঝিরঘাট এলাকা নয়, খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর হালিশহর, চকবাজার, বায়েজিদ, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, বাকলিয়া, অক্সিজেনসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। অনেক ভবন মালিক তিনতলার অনুমোদন নিয়ে পাঁচতলা, আবার অনেকে পাঁচতলার অনুমোদন নিয়ে দশতলা ভবনও নির্মাণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিকরা যেখানে যেই পরিমাণ পাইলিং করা প্রয়োজন, টাকা বাঁচানোর জন্য সেই পরিমাণ পাইলিং করেননি। এমনকি অনেক ভবন মালিক প্রকৌশলীদের পরামর্শ ছাড়াই ভবন নির্মাণ করেছেন।
গত মাসে সিডিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে এমন কয়েকটি ভবন মালিককে জরিমানা করেছে। গত বছর নভেম্বরে আগ্রাবাদ এলাকায় নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন সম্প্রসারণের দায়ে দুই ভবনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত জুনে আগ্রাবাদের মোগলটুলী এলাকায় দশতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে তেরোতলা ভবন করায় নকশাবহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলা হয়।
জাহাঙ্গীর আলম নামের পশ্চিম বাকলিয়া এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণের অনুমোদনের দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান সিডিএ কাজ করছে না, তা নয়। কাজ করলেও যথাযথভাবে তদারকি করে না। আমার পাশের জায়গার মালিক সিডিএর কাছ থেকে এক ধরনের নকশা অনুমোদন নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ভবন নির্মাণের সময় সেটা না মেনেই নির্মাণকাজ করেছেন।’ সিডিএর অথরাইজড অফিসাররা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এসব অবৈধ ভবন নির্মাণ করতে পারতেন না বলে তিনি মনে করেন।
নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরকে আরবান বলা যাবে না। এখানে শহরের সুযোগ-সুবিধা নেই। উল্টো নগরবাসী অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে আছে। এখানে একটা বা দুটো নয়; শত শত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সিডিএর দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব ঠেকানো যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে ভবন মালিকরাও দায়ী।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিডিএর অথরাইজড অফিসারসহ অন্যদের ম্যানেজ করে ভবন মালিকরা অনেক সময় ইচ্ছামতো নকশা পাস করিয়ে নেন। নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না হওয়ার ক্ষেত্রে সিডিএর উদাসীনতা আছে। সিডিএ-চসিকের কাজ কী?’
স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, ‘আধুনিক শহর গড়ে তুলতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। নকশা অনুযায়ী নতুন ভবন নির্মাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ঠেকাতে আমি মনে করি সিটি করপোরেশনের স্থানীয় কাউন্সিলরকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে।’
সিডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা হয়েছিল। সেই তালিকায় নগর জুড়ে ৯০টির মতো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নাম ছিল। এরপর আর কোনো তালিকা করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করার ক্ষেত্রে ভবন মালিকদের নিয়ম না মানার প্রবণতা ঠেকাতে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে সিডিএর ইমারত পরিদর্শকদের। ১৪ পরিদর্শকের সবাইকে নিজ নিজ আওতাধীন এলাকায় নকশাবহির্ভূত ভবন কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনগুলোর তালিকা তৈরি ও মনিটরিং বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ।
ভূমিকম্পের ঘটনায় সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করতে নির্দেশনা দেয় সিডিএকে। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা হচ্ছে কি না জানতে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা হচ্ছে। নগরীতে তিনতলার নিচে অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া পাঁচতলার বেশি যেসব ভবন পাহাড় ও খালপাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোর ১০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব নিয়ে সিডিএ কাজ করছে। সিডিএর আগের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে ৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে।
অথরাইজড অফিসারকে ‘ম্যানেজ’ করে ইচ্ছামতো নকশা প্রণয়নের বিষয়ে সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের কাছে অনেকে জানিয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট করেন কেউ বলে না। যদি কেউ কোনো অথরাইজড অফিসারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে পারেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’