ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ডিটেইল এরিয়াপ্ল্যান-ড্যাপ) খসড়া নিয়ে আবাসন খাতকে কোনো ধরনের শঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে না এমন অভয় দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী ‘রিহ্যাব আবাসন মেলা ২০২১’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘নতুন ড্যাপ যেটা আসছে তাতে আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন। আর আবাসন খাতের সমস্যা মানেই হলো সাধারণ মানুষের স্বপ্নপূরণ বাধাপ্রাপ্ত হবে। এই খাতের সঙ্গে জড়িত ২৬৯টি সংযোগ শিল্প। ৪০ লাখ লোকের এই খাতে কাজের সুযোগ হয়েছে। আবাসন খাত যদি ধাক্কা খায়, তাহলে এই সংযোগ শিল্প ধাক্কা খাবে।’ আবাসন খাত যাতে ধাক্কা না খায় সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ড্যাপ প্রণয়নের তাগিদ দেন তিনি।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ২০০১ সাল থেকে ঢাকায় রিহ্যাব হাউজিং ফেয়ার শুরু করে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৪টি মেলা সফলভাবে শেষ করেছে তারা। এ ছাড়া ২০০৪ সাল থেকে বিদেশে হাউজিং ফেয়ার আয়োজন করে আসছে সংগঠনটি।
গত বছর করোনা মহামারীর কারণে মেলা করতে পারেনি রিহ্যাব। এক বছর বিরতির পর মেলা শুরু হলেও রড-সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন ড্যাপের খসড়ায় কিছু ভীতিকর নির্দেশনা নিয়ে শঙ্কিত আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন (কাজল) বলেন, ‘আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা নতুন ড্যাপ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। এখানে যে ধরনের নির্দেশনার কথা খসড়া আকারে তুলে ধরা হয়েছে তাতে আমরা অশনিসংকেত শুনতে পাচ্ছি। এই ড্যাপ প্রণয়ন করা হলে আবাসন খাতের অবস্থা এতটাই সংকটময় হয়ে উঠবে যে আমরা হয়তো আর কখনো এ ধরনের মেলা আয়োজন করতে পারব না।’ ড্যাপ প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই যাতে লাভবান হয় সেভাবেই করার দাবি জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রিহ্যাবকে মানুষের স্বপ্নপূরণের সংগঠন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘ধনী-গরিব সব মানুষেরই স্বপ্ন থাকে তার একটি বাড়ি হবে। অনেক সময় একার পক্ষে এই বাড়ি বানানো হয় না। এ ক্ষেত্রে আবাসন খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করে থাকে।’
ঢাকা মহানগর এলাকার আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে ড্যাপ ২০১৬-৩৫-এর খসড়া নিয়ে কাজ করছে রাজউক। তবে এরই মধ্যেই এ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছু আপত্তি উঠেছে। এ নিয়ে রিহ্যাবও তাদের মতামত জানিয়েছে। মেলার উদ্বোধনকালে সেই মতামতগুলোই নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে আনতে চেষ্টা করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
এবারের আবাসন মেলায় দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ২২০টি স্টল থাকছে। রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানকেও মেলায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে রিহ্যাব।
অনুষ্ঠানে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্তেখাবুল হামিদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রথম) কামাল মাহমুদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (২) মো. নজরুল ইসলাম (দুলাল), ভাইস প্রেসিডেন্ট (৩) লায়ন শরীফ আলী খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) এবং ফেয়ার স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সোহেল রানা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল কাইয়ূম চৌধুরীসহ রিহ্যাব পরিচালক এবং অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ড্যাপের বিষয়ে এফবিসিসিআইকে অবগত না করার কারণে আক্ষেপ প্রকাশ করে সংগঠনটির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এটি এমন একটি সংগঠন যার সঙ্গে দেশের সব ধরনের ব্যবসায়ীরা জড়িত। অথচ তাদের ড্যাপ নিয়ে মতামত দেওয়ার বিষয়টি অবগত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে আবাসনের সব সুবিধা থাকা উচিত। যাতে ঢাকার বাইরে যাওয়ার বিষয়ে কর্মীরা আগ্রহী হন।’
অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার এবং রাজউকের চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বক্তব্য দেন। তারা উভয়ই বলেন, ড্যাপ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গ্রহণযোগ্য ড্যাপ করা হবে। আবাসন ব্যবসায়ী বিশেষ করে রিহ্যাবের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্তেখাবুল হামিদ আবাসন খাতের বিভিন্ন অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, পরিকল্পিত ও আধুনিক বাসস্থান তৈরিতে গৃহঋণের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন নাগরিকের পক্ষে হাউজিং লোন ছাড়া ফ্ল্যাট বা প্লট ক্রয় করা প্রায় অসম্ভব। ক্রেতারা যাতে খুব সহজে এই ঋণ পেতে পারে সেই ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
কামাল মাহমুদ বলেন, ‘এ মুহূর্তে যা আমাদের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে একটি নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। অন্যটি প্রস্তাবিত ড্যাপ (২০১৬-৩৫)। জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখা আবাসন শিল্প হুমকির মুখে পড়বে যদি এই ড্যাপ বাস্তবায়িত হয়, আর রডের দাম এভাবে বাড়তে থাকে।’ গত এক বছরে রড-সিমেন্টের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান তিনি।
এবার মেলাটির আয়োজনে ডায়মন্ড স্পনসর হিসেবে রয়েছে রূপায়ণ সিটি উত্তরা এবং গোল্ড স্পনসর হিসেবে রয়েছে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন লিমিটেড, শেলটেক ও নাভানা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন। মেলায় দুই ধরনের টিকিট থাকছে। একটি সিঙ্গেল এন্ট্রি, অপরটি মাল্টিপল এন্ট্রি। সিঙ্গেল টিকিটের প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। আর মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিটের প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। মাল্টিপল এন্ট্রি টিকিট দিয়ে একজন দর্শনার্থী মেলার সময় পাঁচবার প্রবেশ করতে পারবেন। এন্ট্রি টিকিটের প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ দুস্থদের সাহায্যার্থে ব্যয় করা হবে। এ বছর প্রতিদিন র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হবে।